ঢাকা বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬

কমিশন বৃদ্ধির দাবিতে

সিএনজি স্টেশনে ধর্মঘটের আলটিমেটাম মালিকদের

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুলাই ২২, ২০২৬, ০২:১৮ এএম

ধারাবাহিক গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে দীর্ঘ এক দশক ধরে সিএনজি বিক্রির ওপর মার্জিন বা কমিশন না বাড়ানোয় ‘চরম সংকটে পড়েছেন’ দেশের সিএনজি ফিলিং স্টেশন মালিকরা। বারবার দাবি জানিয়েও কোনো সাড়া না পাওয়ায় এবার ধর্মঘটের হুঁশিয়ারি দিয়েছে তাদের সংগঠন বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্শন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। দাবি আদায় না হলে আগামী ৩০ জুলাই এক দিনের প্রতীকী ধর্মঘট পালন করবেন সিএনজি স্টেশন মালিকরা। এরপরও কোনো সাড়া না পাওয়া গেলে আগামী ২৩ আগস্ট থেকে দেশব্যাপী অনির্দিষ্টকালের জন্য সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে সিএনজি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর বিজয়নগরে আকরাম টাওয়ারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের পক্ষ থেকে এই কঠোর আন্দোলনের আলটিমেটাম ও কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গঠিত স্টিয়ারিং কমিটির আহ্বায়ক আমিরুজ্জামান চৌধুরী সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। এ সময় অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মনোরঞ্জন ভক্ত, মহাসচিব ফারহান নূরসহ সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বিগত প্রায় ১১ বছর ধরে (১ সেপ্টেম্বর ২০১৫ থেকে) সিএনজি প্রতি ঘনমিটারে নির্ধারিত ৮ টাকা কমিশন অপরিবর্তিত রয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে দেশে মূল্যস্ফীতি, সরকারি ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংকের গ্যারান্টি কমিশন ও সুদ বৃদ্ধিসহ সামগ্রিক পরিচালন ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে। ফলে লোকসান গুনে সিএনজি স্টেশন পরিচালনা করা মালিকদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে সিএনজি ব্যবসায়ীদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে সংবাদ সম্মেলনে সরকারের কাছে অনতিবিলম্বে বাস্তবায়নের জন্য চারটি দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলোÑ সিএনজি কমিশন বর্তমানের ৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ন্যূনতম ১৩.৯৬ টাকা নির্ধারণ করা; ভবিষ্যতে সিএনজি উৎপাদনে ব্যবহৃত যেকোনো জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি করা হলে তা আনুপাতিক ও স্বয়ংক্রিয় পন্থায় কমিশন বা মার্জিনের সঙ্গে সমন্বয় করা; গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির কারণে পুরোনো গ্রাহকদের কাছ থেকে নতুন করে বর্ধিত জামানত জমা নেওয়ার প্রথা পুরোপুরি বাতিল করা, সড়ক ও জনপথের ভূমি বা সংযোগ সড়কের ইজারা মাশুলসহ সব সরকারি দপ্তরের লাইসেন্স ফি এবং নবায়ন ফি যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা।

আন্দোলন কর্মসূচি : আগামী ৩০ জুলাই সকাল ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত দেশব্যাপী সব সিএনজি ফিলিং স্টেশন প্রতীকীভাবে বন্ধ রাখা হবে। তবে এই সময়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। প্রতীকী ধর্মঘট ও আলোচনার মাধ্যমে যদি কোনো ফলপ্রসূ সমাধান না আসে, তবে আগামী ২৩ আগস্ট থেকে সারা দেশের সব সিএনজি ফিলিং স্টেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। সাধারণ মানুষের চরম ভোগান্তি এড়াতে অনতিবিলম্বে ব্যবসায়ীদের এই অস্তিত্ব রক্ষার দাবিগুলো মেনে নেওয়ার জন্য সংবাদ সম্মেলন থেকে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলন সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারা জানান, তাদের ‘যৌক্তিক’ দাবিগুলো সরাসরি তুলে ধরার জন্য তারা একাধিকবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার চেষ্টা করেও সফল হননি।

কমিশন বাড়ানোর দাবি : সংবাদ সম্মেলনে সিএনজি অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে কমিশন প্রতি ঘনমিটারে ৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে মোট ১৩ টাকা ৯৬ পয়সা করার জোর দাবি জানিয়ে এর কারণ হিসেবে সুনির্দিষ্ট দুটি যুক্তি তুলো ধরা হয়।

১. বিদ্যুৎ মূল্যবৃদ্ধির সমন্বয় : ২০১৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত সরকার ৭ বার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। সর্বশেষ গত ৩ জুন ২০২৬ তারিখের বৃদ্ধির ফলে প্রতিটি সিএনজি স্টেশনের মাসিক বিদ্যুৎ বিল এক-পঞ্চমাংশ (২০ শতাংশ) বৃদ্ধি পাবে। এই বাড়তি উৎপাদন খরচ সমন্বয়ের জন্য কমিশন ২ টাকা ৪৬ পয়সা বৃদ্ধি করা জরুরি।

২. মূল্যস্ফীতি ও পরিচালন ব্যয় : বর্তমান বাজার পরিস্থিতি, শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ঊর্ধ্বগতির কারণে অন্যান্য পরিচালন ব্যয় সমন্বয় বাবদ আরও ৩ টাকা ৫০ পয়সা কমিশন বাড়ানো প্রয়োজন।

ফাইলবন্দির এক দশক : মালিক সমিতি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানায়, সিএনজি খাতের এই কমিশন বৃদ্ধির দাবি নতুন নয়। এর আগে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং পেট্রোবাংলা কর্তৃক গঠিত উচ্চপর্যায়ের টেকনিক্যাল কমিটি সিএনজি স্টেশন মালিকদের কমিশন বা মার্জিন ২ টাকা ৯৮ পয়সা বৃদ্ধির চূড়ান্ত সুপারিশ করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ২০১৫ সালে মাত্র ১ টাকা মার্জিন বৃদ্ধি করে অবশিষ্ট ১ টাকা ৯৮ পয়সা বৃদ্ধির বিষয়টি দীর্ঘ এক দশক ধরে রহস্যজনকভাবে ফাইলবন্দি করে রেখেছে।

অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলেন, সিএনজির ক্রয় ও বিক্রয়মূল্য সরকারিভাবে নির্ধারিত থাকায় এই বাড়তি উৎপাদন খরচ তারা নিজেরা গ্রাহকদের ওপর চাপাতে পারছেন না। ফলে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার এই পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ এখন চরম লোকসান ও ধ্বংসের মুখে পড়েছে।