বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার আলতাফনগরে অবস্থিত ‘সরকারি শহীদ এম. মনসুর আলী ডিগ্রি কলেজ’ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৮ সালে। কলেজটি সরকারিকরণ করা হয় ২০১৮ সালের ৭ অক্টোবর। প্রতিষ্ঠার পর সরকারি-বেসরকারি হিসেবে ৩১ বছর ধরে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে কলেজটি। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত মো. ইব্রাহিম আলী খান। তার বিরুদ্ধে নিয়োগকালে মাস্টার্সে শর্ত অনুযায়ী কাম্য যোগ্যতা না থাকা এবং মাস্টার্সের ভুয়া সনদ দাখিল করে তথ্য গোপনের মাধ্যমে চাকরি করার গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) পরিদর্শন প্রতিবেদনেও সনদের বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে এই প্রভাষকের উত্তোলিত বেতন-ভাতা ফেরতের নির্দেশ দেওয়া হয়। ডিআইএ’র আপত্তির বিষয়ে ব্রডশিট জবাবে প্রতিষ্ঠান প্রধান ও কলেজের পরিচালনা পরিষদের সভাপতির সুপারিশে অভিযুক্ত প্রভাষকের সনদের তারিখ ভুল ছিল বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু তারপরও প্রশ্ন রয়েছে, নিয়োগের সময় থেকে সনদের তারিখ ভুল চিহ্নিত হওয়ার লম্বা সময়ে ওই প্রভাষকের নিয়োগ বৈধকরণসহ অন্যান্য প্রশাসনিক কাজ কোন সনদকে ভিত্তি করে হয়েছে? এ ছাড়া প্রতিষ্ঠান প্রধান ডিআইএ’র কাছে ব্রডশিট জবাবে প্রভাষক পদে নিয়োগে ‘মাস্টার্স পরীক্ষার্থীরাও’ আবেদন করতে পারবেন উল্লেখ করলেও ১৯৯৮ সালে কলেজের অর্গানাইজিং কমিটির সভার কার্যবিবরণী, পত্রিকায় প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে অর্থনীতি বিষয়ে প্রভাষক পদে কাম্য যোগ্যতা দ্বিতীয় শ্রেণির মাস্টার্সের কথা উল্লেখ ছিল। আশ্চর্যের বিষয়, সনদ ও নিয়োগ নিয়ে এত প্রশ্ন থাকার পরও ইব্রাহিম আলী খান কীভাবে এখনো চাকরিতে বহাল রয়েছেন, তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। শিক্ষার মতো বিষয়ে এমন অনিয়ম দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন দুপচাঁচিয়ার শিক্ষা অনুরাগী ও সুশীল সমাজ।
নিয়োগের পটভূমি ও অডিটের চাঞ্চল্যকর তথ্য : অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৯৮ সালের ৫ জুলাই তৎকালীন কলেজের গভর্নিং বডির রেজল্যুশন অনুযায়ী একই বছরের ১৯ জুলাই স্থানীয় একটি দৈনিক পত্রিকায় অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে অর্থনীতি বিষয়েও প্রভাষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। বিজ্ঞপ্তিতে অর্থনীতি বিষয়ে ন্যূনতম দ্বিতীয় শ্রেণির মাস্টার্স (স্নাতকোত্তর) ডিগ্রি থাকার শর্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল।
মো. ইব্রাহিম আলী খান বিজ্ঞপ্তির শর্তানুযায়ী অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক পদে নিয়োগের আবেদন করেন। পরে ১৯৯৮ সালের ২৯ জুলাই রেজল্যুশনের মাধ্যমে তাকে কলেজে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। একই বছরের ৩০ জুলাই ইস্যুকৃত নিয়োগপত্রের ভিত্তিতে ১৯৯৮ সালের ১ আগস্ট প্রভাষক পদে তিনি কলেজে যোগদান করেন।
নিয়োগের এই প্রক্রিয়াকে পাকাপোক্ত করতে ১৯৯৯ সালের ৬ মে একটি ‘নিয়োগ বৈধকরণ বিজ্ঞপ্তি’ প্রকাশ করা হয়। এরপর ১০ মে সাক্ষাৎকার গ্রহণ এবং ১২ মে ১৯৯৯ তারিখে রেজল্যুশন করে তার এই নিয়োগকে বৈধ ঘোষণা করা হয়। এরপর ১৯৯৯ সালের ১ অক্টোবর থেকে তিনি এমপিওভুক্ত (মান্থলি পে-অর্ডার) হন, যার মাধ্যমে সরকারি কোষাগার থেকে তার বেতন-ভাতা উত্তোলন শুরু হয়। এ ছাড়া ২০০০ সালের ১৪ জানুয়ারির রেজল্যুশন কপি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ৩০ জুলাই ১৯৯৮ সালের নিয়োগ এবং ১ আগস্ট ১৯৯৮ সালের যোগদানের ভিত্তিতেই তার নিয়োগটি পুনরায় বৈধকরণ করা হয়েছিল।
কাগজে-কলমে সবকিছু ঠিকঠাক মনে হলেও বিপত্তি ঘটে ২০০৩ সালে। ওই বছর ডিআইএ কলেজটিতে একটি বিশেষ ও নিবিড় অডিট পরিচালনা করে। সেই অডিট প্রতিবেদনেই প্রভাষক ইব্রাহিম আলী খানের মাস্টার্স (এমএসএস) সনদটি ‘জাল’ ও ‘ভুয়া’ বলে উল্লেখ করা হয়।
অডিট প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্তানুসারে অর্থনীতিতে দ্বিতীয় শ্রেণির মাস্টার্স পাস থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও ১৯৯৮ সালের ১ আগস্ট চাকরিতে যোগদানের সময় ইব্রাহিম আলী খানের এমএসএস পরীক্ষাই সম্পন্ন হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইব্রাহিম খানের এমএসএস পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯৮ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর মাসের মধ্যে। অথচ রহস্যজনক ও অলৌকিকভাবে তিনি একই বছরের ১২ ডিসেম্বর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইস্যুকৃত একটি সাময়িক (প্রভিশনাল) সনদপত্র কলেজে জমা দেন। ডিআইএ’র কর্মকর্তারা তদন্তে নেমে জানতে পারেন, ওই সময় পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার ফলই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়নি। ফলে পরীক্ষার মূল ফল প্রকাশের আগেই ভুয়া সাময়িক সনদ তৈরি করে তা দাখিল করা হয়।
দুই দশক ধরে অডিট নির্দেশনা হিমাগারে : প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০০০ সালের ১৪ জানুয়ারি এই জাল সনদের ভিত্তিতেই চতুরতার সঙ্গে তার নিয়োগ বৈধকরণ করা হয়েছিল। সনদটি সম্পূর্ণ জাল প্রমাণিত হওয়ায় অডিট কর্তৃপক্ষ কঠোর অবস্থান নেয়। ১৯৯৯ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০০০ সালের ৩১ মে পর্যন্ত তার উত্তোলিত মোট ১ লাখ ৮৮ হাজার ৪৩০ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ওই সময়ের পরেও তার দ্বারা গৃহীত সব অর্থ ফেরতযোগ্য এবং ভবিষ্যতে তিনি আর কোনো সরকারি বেতন-ভাতা পাবেন না বলে অডিট প্রতিবেদনে কঠোর ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, অডিট বিভাগের সেই সুনির্দিষ্ট ও কঠোর নির্দেশনার দুই দশক পেরিয়ে গেলেও কলেজ কর্তৃপক্ষ বা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর থেকে তার বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। উল্টো এক অদৃশ্য শক্তির ইশারায় তথ্য গোপন রেখে ইব্রাহিম আলী খান এখনো কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত এবং প্রতি মাসে নিয়মিত সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও জনগণের ট্যাক্সের টাকা বেতন-ভাতা হিসেবে ভোগ করে যাচ্ছেন। কলেজটি সরকারি হওয়ার পর তার এই অবস্থান আরও সুসংহত হয়েছে, যা নিয়ে এলাকায় চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে।
অভিযুক্ত ও কলেজ কর্তৃপক্ষের দায়সারা বক্তব্য : যোগাযোগ করা হলে প্রভাষক ইব্রাহিম আলী খান তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ ও অডিট প্রতিবেদন অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি প্রথম নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে চাকরিতে যোগদান করিনি। পরবর্তীতে অন্য একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আমি নিয়োগ পাই। সে সময় মাস্টার্সে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের শর্ত ছিল না। কলেজ কর্তৃপক্ষ ও তৎকালীন গভর্নিং বডির সভায় আমার সব কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করেই আমাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আমি সম্পূর্ণ বৈধভাবেই এমপিওভুক্ত হয়ে দীর্ঘদিন ধরে চাকরি করছি।’ মাস্টার্সের সাময়িক সনদ ইস্যুর তারিখ আবেদন করে সংশোধন করে নিয়েছেন বলে জানালেও সনদ সংশোধনের আবেদনের কোনো কপি কিংবা সনদ সংশোধনের আবেদনের জন্য কোনো ব্যাংক রশিদ তিনি দেখাতে পারেননি।
এ বিষয়ে সরকারি শহীদ এম. মনসুর আলী ডিগ্রি কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজের দায় এড়িয়ে বলেন, ‘আমি মাত্র ১৬ মাস হলো এই কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেছি। ইব্রাহিম আলী খানের নিয়োগকালে অনেক কাগজপত্র সম্পর্কে আমার বিস্তারিত জানা নেই। তিনি আমাদের কাছে দাবি করছেন যে, তার নিয়োগের সময় মাস্টার্সের নির্দিষ্ট বিষয়ের কোনো শর্ত ছিল না। বর্তমানে ফাইলে থাকা কাগজপত্র দেখে আপাতদৃষ্টিতে সেগুলো বৈধই মনে হচ্ছে। তবে যদি কোনো সময় অডিট বিভাগে তার সনদ জাল বা ভুয়া বলে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয় বা নতুন কোনো সরকারি নির্দেশনা আসে, তাহলে বিধি মোতাবেক অবশ্যই প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
যা বলছে ডিআইএ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় : অভিযুক্ত প্রভাষকের সব কাগজপত্র ডিআইএ’র মাধ্যমে পরীক্ষা করানো হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিআইএ সূত্র জানায়, কাগজপত্রে সমস্যা রয়েছে। তবে এরই মধ্যে অনেকদিন অতিবাহিত হওয়ায় নতুন করে তদন্ত প্রয়োজন। তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পন্ন হতে পারে।
ডিআইএ’র পরিচালক অধ্যাপক এম. এম সহিদুল ইসলাম এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে চাননি। তবে বিধিমোতাবেক তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে এ বিষয়ে জানতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের নিরীক্ষা ও আইন শাখায় যোগাযোগ করা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই শাখার এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘যে সময়ের ঘটনা তারও কয়েক বছর পর বিসিএসের মাধ্যমে চাকরিতে ঢুকেছি’। সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করার পর এ বিষয়ে বক্তব্য দেওয়া সম্ভব মর্মে জানানো হয় এই শাখা থেকে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে এই অনিয়মের শিকড় উপড়ে সরকারি অর্থ আত্মসাতের দায়ে অভিযুক্ত প্রভাষকের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষা অনুরাগী ও সুশীল সমাজ।

