যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৈশ্বিক পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়ার পর বাংলাদেশে একপ্রকার স্বস্তির পাশাপাশি অস্থিরতাও দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ আপাতত ‘নীরব পর্যবেক্ষণ’ কৌশল নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাওয়ার আগপর্যন্ত কোনো পদক্ষেপে যাচ্ছে না সরকার। নতুন শুল্কের ফলে আগের চুক্তি অকার্যকর হয়েছে বলেও বাংলাদেশ মনে করছে। তাই এ বিষয়ে আগ বাড়িয়ে কোনো উদ্যোগ নেবে না বাংলাদেশ।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন বৈশ্বিক শুল্ক কার্যকর হয়েছে ১০ শতাংশ হারে। এর আগে গত শুক্রবার দেশটির সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের আরোপিত পাল্টা শুল্ক অবৈধ ঘোষণা করেন। গত সপ্তাহের রায় প্রকাশের মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশে ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের নির্দেশ দেন। পরে তিনি তা ১৫ শতাংশে উন্নীত করার হুমকি দেন। তবে সেই শুল্ক এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করার নির্দেশ দেননি তিনি। ফলে শেষমেশ শুল্ক কার্যকর হচ্ছে ১০ শতাংশ হারে।
এ বিষয়ে বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি শুল্কসংক্রান্ত চুক্তি হয়েছিল। তবে সেই চুক্তি কার্যকর হওয়ার জন্য উভয় পক্ষের আনুষ্ঠানিক অবহিতকরণ প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে সেই অবহিতকরণ দেয়নি। একইভাবে বাংলাদেশও এ বিষয়ে নতুন করে কোনো কাজ করছে না।
তার বক্তব্য স্পষ্ট, ‘তারা একটি চিঠি দেবে। সেই চিঠিতে তারা কী বলে, তা আগে দেখতে চাই। এর পরই আমরা প্রতিক্রিয়া জানাব।’
অর্থাৎ, বাংলাদেশের অবস্থান এখন পর্যবেক্ষণমূলক। যুক্তরাষ্ট্র নতুন শুল্ক আরোপের বিষয়ে কী ব্যাখ্যা দেয়, পূর্বের চুক্তি সম্পর্কে তাদের অবস্থান কীÑ এসব পরিষ্কার হওয়ার পরই ঢাকা সিদ্ধান্ত নেবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ৬-৩ ভোটে রায় দিয়ে বলেন, ১৯৭৭ সালের ‘আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন’ ব্যবহার করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে ব্যাপক বৈশ্বিক শুল্ক আরোপ করেছিলেন, তা ক্ষমতার সীমা অতিক্রমের শামিল।
এই রায়ের মাধ্যমে আদালত স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, জাতীয় জরুরি অবস্থার অজুহাতে ব্যাপক বাণিজ্যনীতি প্রণয়ন করা নির্বাহী বিভাগের একক এখতিয়ারের বিষয় নয়। রায়ের পরপরই ট্রাম্প আদালতের কড়া সমালোচনা করেন এবং কয়েকজন বিচারপতিকে ‘দুর্বল’ ও ‘অযৌক্তিক’ বলে অভিহিত করেন।
আদালতের রায়ের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের সেকশন ১২২-এর অধীনে নতুন করে ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ দেওয়া এক বার্তায় তিনি শুল্কহার বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করলেও চূড়ান্তভাবে তা ১০ শতাংশেই থাকছে।
আইন অনুযায়ী, এই শুল্ক সর্বোচ্চ প্রায় পাঁচ মাস পর্যন্ত বলবৎ রাখা যাবে। এরপর তা বহাল রাখতে হলে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হবে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের পূর্ববর্তী শুল্কচুক্তি সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পর কার্যত বাতিল হয়ে গেছে। ফলে এখন নতুন করে যে শুল্ক আরোপ হয়েছে, সেটিই কার্যকর বাস্তবতা।
তার মতে, আগের চুক্তিতে বাংলাদেশের কিছু অসুবিধা ছিল। সেটি বাতিল হওয়ায় বাংলাদেশ কিছুটা স্বস্তি পেলেও ভবিষ্যতে নতুন চুক্তি করতে গেলে বাংলাদেশকে কিছুটা কৌশলগতভাবে পিছিয়ে থেকে দর-কষাকষি করতে হতে পারে।
তিনি বলেন, এই পরিস্থিতি থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসা যায়, সেটি এখন নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের জন্য এখন তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণÑ প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে কী জানায় তা স্পষ্ট হওয়া। দ্বিতীয়ত, পূর্বের চুক্তি বাতিলের প্রেক্ষাপটে নতুন দর-কষাকষির সুযোগ ও ঝুঁকি নিরূপণ করা এবং তৃতীয়ত, বৈশ্বিক শুল্কযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রপ্তানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরাসরি প্রতিক্রিয়া না দিয়ে কূটনৈতিকভাবে অপেক্ষা করছে। চিঠি পাওয়ার পরই সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির এই অস্থিরতা দীর্ঘ মেয়াদে বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের যে বাণিজ্যচুক্তি সই হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার পাশাপাশি সংস্কার করতে হতো। শুল্ক, শ্রম আইন, ডিজিটাল নীতি, কৃষি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংস্কার করতে হতো। সেই সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে কিনতে হতো নানা পণ্য।
চুক্তিপত্রে কেবল পণ্যের শুল্ক নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক বাণিজ্য ও নিয়ন্ত্রণকাঠামো ঢেলে সাজানোর বাধ্যবাধকতার কথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোক্যাল ট্রেড শীর্ষক এই চুক্তিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের নাম এসেছে ৫৯ বার। অথচ বাংলাদেশের নাম এসেছে ২০৫ বার। মূলত বাংলাদেশকে কী করতে হবে, তার বিবরণ দেওয়া হয়েছে এই চুক্তিপত্রে।
অন্যদিকে এই বাণিজ্যচুক্তি করায় বাংলাদেশের পণ্যে ২০ শতাংশের পরিবর্তে তা কমিয়ে ১৯ শতাংশ পাল্টা শুল্ক বসানোর কথা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। এখানে কিছুটা ছাড় দেওয়া হলেও অন্য সব শুল্ক আগের মতোই ছিল।
চুক্তিপত্রে বলা আছে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক উড়োজাহাজ, যন্ত্রাংশ ও সেবা কেনা বাড়ানোর উদ্যোগ নেবে বাংলাদেশ। চুক্তির ৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, এই পরিকল্পনার আওতায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনবে বলে অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছে। ভবিষ্যতে আরও উড়োজাহাজ কেনার সুযোগ রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ¦ালানি আমদানি বাড়ানোর চেষ্টা করবে। বেসরকারি পর্যায়েও তা কেনা হতে পারে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেনার দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি অন্তর্ভুক্ত। আগামী ১৫ বছরে জ¦ালানি আমদানির সম্ভাব্য দাম ধরা হয়েছে প্রায় ১৫ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার।
খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্য আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেবে। এসব পণ্যের মধ্যে আছেÑ প্রতি বছর (পাঁচ বছরের জন্য) অন্তত ৭ লাখ মেট্রিক টন গম, এক বছরে সর্বোচ্চ ১২৫ কোটি ডলারের বা ২৬ লাখ মেট্রিক টন (যেটি কম) সয়াবিন ও সয়াজাত পণ্য ও তুলা। এসব কৃষিপণ্যের সম্ভাব্য দাম ধরা হয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ৩৫০ কোটি ডলার।
৬ নম্বর ধারায় আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেবে। একই সঙ্গে কিছু নির্দিষ্ট দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা সীমিত রাখার চেষ্টা করবে। তবে কোন কোন দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা সীমিত করতে হবে, তা চুক্তিতে উল্লেখ নেই।
চুক্তি কার্যকর হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) সব ধরনের ভর্তুকির পূর্ণাঙ্গ তথ্য জমা দিতে হবে। ডব্লিউটিওর ভর্তুকি ও পাল্টা ব্যবস্থাসংক্রান্ত চুক্তির বিধান অনুযায়ী তা বাধ্যতামূলক।
চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা অনেক পণ্যে আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ধাপে ধাপে কমাতে বা পুরোপুরি তুলে নিতে হবে। কিছু পণ্যে চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুল্ক উঠে যাবে। আবার কিছু পণ্যে ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে শুল্ক প্রত্যাহারের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে কোনো ধরনের কোটা আরোপ না করার বাধ্যবাধকতাও থাকছে।
চুক্তিপত্রের বড় একটি অংশজুড়ে অশুল্ক বাধা কমানোর নির্দেশনা আছে। যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য যেন প্রতিযোগিতায় ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে বাংলাদেশকে।
চুক্তির ২ দশমিক ২ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এমনভাবে আমদানি লাইসেন্সিং নীতির প্রয়োগ করতে পারবে না, যাতে সেই সব পণ্যের আমদানি বাধাগ্রস্ত হয়। চুক্তিপত্রের ভাষ্য, পুরো প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, বৈষম্যহীন ও অযথা জটিলতামুক্ত। পাশাপাশি এ ধরনের ব্যবস্থা যেন যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষুণœ না করে, তা-ও নিশ্চিত করতে হবে।
মার্কিন বা আন্তর্জাতিক মান ও কারিগরি বিধিমালা মেনে তৈরি পণ্য, যার সনদ সরকারি বা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষাগার থেকে দেওয়া হয়েছেÑ এমন মার্কিন পণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অতিরিক্ত পরীক্ষা বা সামঞ্জস্যের কথা বলে মূল্যায়নের শর্ত আরোপ করতে পারবে না। অর্থাৎ, বৈধ সনদ থাকলে পণ্য প্রবেশে নতুন করে বাধা দেওয়া যাবে না। এ ক্ষেত্রে দুটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবেÑ প্রথমত, সামঞ্জস্য মূল্যায়নকারী মার্কিন সংস্থাগুলোকে বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্থাগুলোর সমান সুবিধা দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, যেসব পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণকাঠামো অনুযায়ী তৃতীয় পক্ষের আলাদা পরীক্ষার আওতায় পড়ে না, সেসব পণ্যের ক্ষেত্রে মার্কিন কমপ্লায়েন্স পদ্ধতি গ্রহণে বাংলাদেশ সহযোগিতা করবে।
এ ছাড়া কারিগরি বিধিমালা, মান ও সামঞ্জস্য বিধানের পদ্ধতি যেন বৈষম্যমূলকভাবে প্রয়োগ না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে বাংলাদেশকে। সেই সঙ্গে এসব বিধান যেন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে গুপ্ত বিধিনিষেধ হিসেবে কাজ না করে, তা-ও নিশ্চিত করতে হবে। পরস্পরের পরিপন্থি বিদ্যমান কারিগরি বাধা যেমনÑ অপ্রয়োজনীয় বা নতুন পরীক্ষা (যে পরীক্ষা আগেও করা হয়েছে)Ñ এসব ধাপে ধাপে তুলে দিতে হবে।
শ্রম খাতে চুক্তির শর্তগুলো যথেষ্ট বিশদ ও বিস্তারিত। বাংলাদেশকে বাধ্যতামূলক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করতে হবে। সেই সঙ্গে শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত এবং শ্রম আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলেও (ইপিজেড) শ্রম অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য শ্রম আইনের সুরক্ষা দুর্বল করা যাবে নাÑ এমন শর্তও যুক্ত করা হয়েছে। পরিবেশ খাতে বাংলাদেশকে পরিবেশ সুরক্ষা আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং বাণিজ্যে পরিবেশগত অসাম্য তৈরি হয় এমন কিছু করা যাবে না।
চুক্তিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, নিষেধাজ্ঞা ও বিনিয়োগ নিরাপত্তা নীতির সঙ্গে সমন্বয় করতে তৃতীয় কোনো দেশের কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে কম দামে পণ্য রপ্তানি করলে তা ঠেকানোর ব্যবস্থা নিতে হবে বাংলাদেশকে। যে কারণে বাংলাদেশের বাজারে মার্কিন পণ্য রপ্তানি বা অন্য কোনো দেশের বাজারে মার্কিন পণ্য রপ্তানি ব্যাহত হতে পারে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত আছেÑ এমন দেশ থেকে পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর বা জ¦ালানি কেনার ওপর কড়াকড়ি আরোপের শর্তও রাখা হয়েছে।
চুক্তিপত্রের ৩ নম্বর ধারায় অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক কেবল অর্থনৈতিক বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে সাইবার নিরাপত্তা, তথ্য সুরক্ষা ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের মতো সংবেদনশীল বিষয়।
চুক্তিপত্রে বলা হয়েছে, দেশের সমুদ্রবন্দর, বন্দর টার্মিনাল, লজিস্টিকস ট্র্যাকিং নেটওয়ার্ক ও বাণিজ্যিক জাহাজের বহরে ব্যবহৃত ডিজিটাল লজিস্টিকস প্ল্যাটফর্মগুলোয় যথাযথ সাইবার নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করবে বাংলাদেশ। এসব প্ল্যাটফর্মের ডেটা যেন ফাঁস না হয়, জাতীয় নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি না করে বা অন্য কোনো দেশ অনুমোদন ছাড়া সে তথ্য যেন না পায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে উৎপন্ন বা যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন যেসব পণ্য ‘এক্সপোর্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন রেগুলেশনস (ইএআর)’-এর আওতাভুক্ত, সেগুলোর অননুমোদিত রপ্তানি, পুনরায় রপ্তানি বা দেশের ভেতরে হস্তান্তর সীমিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বাংলাদেশ। এ ধরনের পণ্য পুনরায় রপ্তানির ক্ষেত্রে রপ্তানিকারককে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ব্যুরো অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড সিকিউরিটির (বিআইএস) অনুমোদনপত্র দেখাতে হবে অথবা প্রমাণ করতে হবে; বিআইএসের অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। ইএআরের আওতাভুক্ত পণ্য নিয়ে দুই দেশ তথ্য বিনিময় ও সহযোগিতা করবে।
যুক্তরাষ্ট্রে উৎপন্ন বা যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত পণ্যের শুল্ক ও লেনদেনের তথ্য বাংলাদেশ পর্যালোচনা করবে। এসব তথ্য প্রয়োজনে বিনিময় করা হবে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, বিশেষ করে বিআইএস বা তার মনোনীত সংস্থা উদ্বেগজনক লেনদেন শনাক্ত করতে পারবে।
আরও বলা হয়েছে, একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আইন লঙ্ঘন ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। আইনের লঙ্ঘন হলে তার প্রতিকারে ব্যবস্থা নিতে হবে।
চুক্তিপত্রের ভাষ্য, বাংলাদেশ নিজস্ব রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা ও প্রয়োগের কাঠামো গড়ে তুলবে। এর মধ্যে দেওয়ানি ও ফৌজদারি শাস্তির বিধান প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, নিরীক্ষা ও তদন্ত সক্ষমতা জোরদার করার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে এসব আইন প্রয়োগের কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
কৃষি খাতে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি ব্যবস্থার স্বীকৃতি দিতে হবে। চুক্তির ১ দশমিক ৩ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের দেওয়া খাদ্য ও কৃষিপণ্যের সনদ বাংলাদেশে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে।
চুক্তির ২ দশমিক ৩ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, অ্যানেক্স-১-এর সিডিউল-১-এ যে শর্তগুলো নির্ধারিত আছে, তার আলোকে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্যের জন্য বাংলাদেশের বাজারে বৈষম্যহীন কিংবা অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার দেবে।
একই সঙ্গে কৃষিপণ্যের স্বাস্থ্য ও উদ্ভিদ সুরক্ষাসংক্রান্ত (এসপিএস) সব ব্যবস্থা বৈজ্ঞানিক তথ্য ও ঝুঁঁকি বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নিতে হবে। এসব বিধান যেন বাণিজ্যের ক্ষেত্রে গোপন বাধা হিসেবে ব্যবহৃত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। পারস্পরিক সুবিধার পরিপন্থি এবং অযৌক্তিক এসপিএস-সংক্রান্ত বাধাগুলোও তুলে দিতে হবে।
চুক্তির ১ দশমিক ৬ নম্বর ধারায় কৃষি জৈব প্রযুক্তিপণ্যের বাণিজ্য সহজ করতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে বিজ্ঞান ও ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণকাঠামো বজায় রাখতে হবে। চুক্তি কার্যকর হওয়ার ২৪ মাসের মধ্যে এমন নীতি গ্রহণ করতে হবে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে বিক্রি হওয়া ও প্রয়োজনীয় প্রাক-বাজার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া জৈব প্রযুক্তিপণ্য বাংলাদেশে আমদানি ও বাজারজাত করতে অতিরিক্ত অনুমোদন, পর্যালোচনা বা বিশেষ লেবেলিংয়ের প্রয়োজন না হয়।
পোলট্রি ও প্রাণিসম্পদ খাতেও রোগসংক্রান্ত আমদানি নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সীমিত করতে হবে।
চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে কপিরাইট, ট্রেডমার্ক ও পেটেন্ট সুরক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অনলাইনসহ সব ক্ষেত্রেই মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ও সীমান্তভিত্তিক ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
এ ছাড়া বাংলাদেশকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মাদ্রিদ প্রটোকল, পেটেন্ট কো-অপারেশন ট্রিটি ও একাধিক ডব্লিউআইপিও চুক্তিতে যোগ দিতে হবে। ফলে দেশের বিদ্যমান আইনকাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।
ডিজিটাল নীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অঙ্গীকার করতে হবে, যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানির ওপর বৈষম্যমূলক ডিজিটাল কর আরোপ করা হবে না। একই সঙ্গে ব্যবসার প্রয়োজনে আন্তঃসীমান্ত তথ্যপ্রবাহের অনুমতি দিতে হবে।
ইলেকট্রনিক কনটেন্টে কোনো ধরনের কাস্টমস শুল্ক আরোপ করা যাবে না। যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণœ হয় এমন কোনো ডিজিটাল বাণিজ্যচুক্তি অন্য দেশের সঙ্গে করলে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে সই হওয়া এই বাণিজ্যচুক্তি বাতিল করতে পারবে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল আরোপিত শুল্কহার প্রযোজ্য হবে।
২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে পুরোপুরি ডিজিটাল ও কাগজবিহীন কাস্টমস ব্যবস্থা চালু করতে হবে। ই-ডকুমেন্ট ও স্বয়ংক্রিয় ক্লিয়ারেন্স বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানিতে করছাড়-সংক্রান্ত কোনো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় আপত্তি তুলতে পারবে না।

