প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার তাদের প্রথম বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে আগামী ১১ জুন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই বাজেট পেশ করবেন সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এবারে বাজেট ঘাটতি কমাতে দেশে কিছু পণ্যে সম্পূরক শুল্ক আরোপ এবং রোহিত করবে সরকার; যে কারণে কিছু পণ্যের দাম বাড়বে ও কিছুর কমবে।
জানা গেছে, দাম কমার তালিকায় রয়েছেÑ জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, শিক্ষা সরঞ্জাম ও ইলেকট্রিক রিচার্জেবল গাড়ি বা বাস। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন বিমায় উৎসাহী করতে স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট সুবিধা ও সেবার দাম কমবে।
দেশের জ্বালানি সরবরাহ সংকটকালে আমদানিযোগ্য জ্বালানিনির্ভরতা কমিয়ে আনার কথা ভাবছে সরকার। এ কারণে গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রানার অটোমোবাইলস পিএলসি চীনের রিচার্জেবল গাড়ি দেশে উৎপাদন করবে। এই সুবিধা বাড়াতে এরই মধ্যে চীনের বিওয়াইডবলু কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিও সম্পন্ন হয়েছে। অন্যদিকে চলতি বছর জুনে বিদেশ থেকে রিচার্জেবল ৪০০ বাস দেশে আনছে সরকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎচালিত বাস আমদানিতে শুল্ক-কর অব্যাহতির পর অন্যান্য কাজে ব্যবহারে বিদ্যুৎচালিত বাস ও ট্রাক আমদানিতেও বড় ধরনের শুল্ক-কর অব্যাহতির সিদ্ধান্ত দিয়েছে সরকার।
অন্যদিকে, উচ্চহারে সম্পূরক শুল্ক আরোপ করায় দাম বাড়তে পারে তামাকজাত পণ্য, অ্যালকোহল (মদ), বিভিন্ন খনিজ দ্রব্য এবং কাপড় তৈরির কিছু কাঁচামালের। একই সঙ্গে চিনিযুক্ত পানীয়র ওপর স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ এবং উচ্চহারে সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হবে। দীর্ঘ প্রাক-বাজেট আলোচনা শেষে এমন সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
বাজেট উপস্থাপনের আগে ১১ মে সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে বসতে যাচ্ছে এনবিআর কর্তৃপক্ষ। এরপর ১৩ মে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বসবে এনবিআর কর্তৃপক্ষ। এমনটা জানিয়েছেন সংস্থাটির শীর্ষ এক কর্মকর্তা।
অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও চলমান বৈশি^ক সংকটের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আগামী অর্থবছরের জন্য একটি চ্যালেঞ্জিং বাজেট প্রণয়ন করতে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। প্রাথমিকভাবে অর্থবিভাগ বাজেটের সম্ভাব্য আকার নির্ধারণ করেছে ৯ লাখ ২০ হাজার ৮০৩ কোটি টাকা, যা হতে যাচ্ছে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট। এর মধ্যে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের হোঁচট খেয়ে আহরণ লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে চার লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে এনবিআর। যদিও কাগজে-কলমে লক্ষ্যমাত্রায় কোনো পরিবর্তন করা হচ্ছে না।
পণ্যের দাম বৃদ্ধির প্রাক-বাজেট আলোচনায় তামাকের মূল্যস্তর ও কর সংস্কারের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছে অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া অ্যালায়েন্স (আত্মা)। তামাকজাত পণ্যের দাম সমন্বয় এবং কর কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে তিনটি প্রধান প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রস্তাব দিয়েছে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরো (বিইআর) এবং বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি (বিএনটিপি)। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তামাক ও চিনিযুক্ত পানীয়র দাম বাড়ছে বলে বিশেষ সূত্র জানিয়েছে।
দাম বাড়ার সম্ভাবনা : ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে যেসব পণ্যের দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম তামাকজাত পণ্য (বিড়ি, সিগারেট), মদ ও নির্দিষ্ট কিছু খনিজ দ্রব্য। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, বাজেটে বিড়ি, সিগারেট এবং মদের ওপর কর বা শুল্ক বাড়ানোর কারণে এগুলোর দাম বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তামাকের বিদ্যমান চারটি স্তরকে কমিয়ে তিনটি স্তরে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। নিম্ন ও মাঝারি- এই দুটি স্তরকে একত্রিত করে প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের দাম ১০০ টাকা নির্ধারণ করা হতে পারে। কারণ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সিগারেটের দাম এখনো অনেক কম। উচ্চ স্তরের ১০ শলাকা সিগারেটের দাম ১৫০ টাকা এবং প্রিমিয়াম স্তরের দাম ২০০ টাকা বা তার বেশি করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বর্তমানে প্রচলিত ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক (এসডি) বহাল রাখার পাশাপাশি প্রতি ১০ শলাকার প্যাকেটে অতিরিক্ত ৪ টাকা ‘সুনির্দিষ্ট শুল্ক’ (স্পেসিফিক এসডি) বা প্রতি শলাকায় ৪০ পয়সা শুল্ক আরোপ করার কথা বলা হয়েছে।
বিড়ি : ২০ শলাকার ফিল্টার ও ফিল্টারবিহীন বিড়ির অভিন্ন খুচরা মূল্য ৩০ টাকা নির্ধারণ এবং এর ওপর ৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
জর্দা ও গুল : প্রতি ১০ গ্রাম জর্দার দাম ৬০ টাকা এবং প্রতি ১০ গ্রাম গুলের দাম ৩০ টাকা নির্ধারণ করার কথা বলা হয়েছে, যার ওপর ৬০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক থাকবে।
খনিজ দ্রব্য : বিদেশে থেকে আমদানি করা খনিজ দ্রব্যের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি করা হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে কাপড় তৈরির কাঁচামালের (যেমন : প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম আঁশ, কটন ও সিন্থেটিক সুতা) দাম বাড়তে পারে।
দাম কমতে পারে : ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জনস্বাস্থ্য ও জীবনদায়ী পণ্যের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বেশ কিছু পণ্যের দাম কমানোর প্রস্তাব বা ঘোষণা আসছে। যেসব পণ্যের দাম কমতে পারে তার মধ্যে রয়েছে ওষুধ। এর মধ্যে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ জীবনদায়ী ওষুধÑ বিশেষ করে ক্যানসার ও ডায়াবেটিসের ওষুধের দাম কমতে পারে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে জীবন বিমা ও স্বাস্থ্য বিমা পলিসিগুলোকে করমুক্ত করার প্রস্তাব প্রাক-বাজেটে করা হয়েছে।
জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব পণ্য, যেমন- সোলার প্যানেল, লিথিয়াম-আয়ন সেল (ব্যাটারির জন্য) এবং বায়োগ্যাস মিশ্রিত সিএনজির দাম কমতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষাসামগ্রী ও স্টেশনারি বিভিন্ন পণ্যের মধ্যেÑ নোটবুক, পেনসিল এবং ইরেজারের দাম কমার আভাস মিলেছে।
৪০০ ইলেকট্রিক গাড়ি (রিচার্জেবল) আসছে : বাজেটে যাত্রীবাহী বাস বা ইলেকট্রিক গাড়ির দাম কমতে পারে। এরই মধ্যে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, রাজধানী থেকে পুরোনো গাড়ি সরিয়ে ফেলা হবে। যাত্রীদের সুবিধায় নতুন ৪০০ ইলেকট্রিক গাড়ি (রিচার্জেবল) আগামী জুনে দেশে আনছে সরকার। এসব গাড়ি ঢাকার পাশের জেলা গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জসহ ঢাকার ভেতরে চলাচল করবে।
তবে সারা দেশে ইলেকট্রিক গাড়ির আরও সুবিধা বাড়াতে দেশীয়ভাবে উৎপাদন শুরু করতে যাচ্ছে বিভিন্ন কোম্পানি। তার মধ্যে চীনের শীর্ষ বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বিওয়াইডাবলুর গাড়ি সরবরাহ ও উৎপাদন করবে দেশীয় রানার গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান রানার অটোমোবাইলস পিএলসি। এ লক্ষ্যে রানার অটোমোবাইলস বিওয়াইডাবলু অটো ইন্ডাস্ট্রি কোম্পানির সঙ্গে গত মার্চের শেষদিকে একটি সরবরাহ ও উৎপাদন চুক্তিও করেছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) দেওয়া এক ঘোষণায় রানার অটোমোবাইলস জানায়, গত ২০ মার্চ অনুষ্ঠিত কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের সভায় এ চুক্তি অনুমোদন দেওয়া হয়। এর লক্ষ্যÑ স্থানীয় পর্যায়ে বৈদ্যুতিক গাড়ির উৎপাদন বাড়ানো এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুযোগ তৈরি।
তথ্য অনুসারে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে। নতুন সরকারের এই প্রথম বাজেট পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
প্রাথমিকভাবে অর্থবিভাগ এবারের বাজেটের সম্ভাব্য আকার নির্ধারণ করেছে ৯ লাখ ২০ হাজার ৮০৩ কোটি টাকা। এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট ভিন্ন প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করা হয়েছিল। নির্বাচিত সংসদ না থাকায় তখন অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ টেলিভিশনে সরাসরি ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব তুলে ধরেছিলেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন