ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ভাঙছে আস্থার দেয়াল

পারভেজ খান
প্রকাশিত: মে ৭, ২০২৬, ০৫:৪৩ এএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

দেশজুড়ে শিশু ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের ঘটনা থামছেই না। মানবাধিকার সংগঠন ও শিশুরক্ষা সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যান বলছে, গত কয়েক বছরের চেয়ে সম্প্রতি অভিযোগের হার অনেক ক্ষেত্রেই বেশি। কখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কখনো খেলার মাঠ কিংবা আত্মীয়ের বাড়িসহ সবচেয়ে নিরাপদ ভাবা জায়গাগুলোতেই ভেঙে পড়ছে জোরালো আস্থার দুর্বল দেয়াল। সর্বশেষ নেত্রকোনায় ১১ বছরের এক শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে এক মাদ্রাসা শিক্ষক গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনায় আবারও সামনে এসেছে ভয়ংকর এই বাস্তবতা। সবচেয়ে আতঙ্কের দিকটি হলো, শিশুদের বড় অংশই নির্যাতনের শিকার হচ্ছে তাদের অতিপরিচিতজনের হাতে। তথ্য অনুসারে, দেশে গত চার মাসে প্রায় ৫০০ শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

দেশে আইন আছে, শাস্তিও কঠোর। তারপরও কেন কমছে না এ জঘন্য অপরাধ? এর কারণ কি বিচারে বিলম্ব, সামাজিক লজ্জা, ক্ষমতার অপব্যবহার, নৈতিক অবক্ষয়, নাকি ডিজিটাল বিকৃতি? উত্তর খুঁজতে গিয়ে উঠে এসেছে জটিল এক চিত্র।

খবর অনুসারে, নেত্রকোনার একটি মাদ্রাসার শিক্ষককে ১১ বছরের এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ করে অন্তঃসত্ত্বা করার অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। স্থানীয় সূত্র জানায়, শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়লে বিষয়টি পরিবার জানতে পারে। পরে থানায় মামলা হলে অভিযুক্ত শিক্ষককে আটক করা হয়।

অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার সংশ্লিষ্ট র‌্যাব-১৪ ময়মনসিংহের অধিনায়ক নয়মুল হাসান গতকাল বুধবার রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, গ্রেপ্তার এড়াতে অভিযুক্ত মাদ্রাসাশিক্ষক বিভিন্ন এলাকায় আত্মগোপনে ছিলেন। মোবাইল ফোনও ব্যবহার করছিলেন না। গোয়েন্দা নজরদারিতে তার অবস্থান শনাক্ত করার পর গৌরীপুরের সোনামপুরে এক আত্মীয়র বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে থানায় সোপর্দ করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। মেডিক্যাল রিপোর্ট ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত চলবে।

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি জানিয়েছে, ২০২৫ সালে কমপক্ষে ২ হাজার ৪৭ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সংগঠনটি জানায়, যারা ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, তাদের মধ্যে ৪৭৪টি শিশু। এ ছাড়া ১ হাজার ৩৭১টি শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ২৮৮ জন প্রাণ হারিয়েছে। ১ হাজার ৮৩টি শিশু বিভিন্নভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছে অন্তত ১৬৫টি শিশু। গত এপ্রিলে সারা দেশে ২৯৪ জন নারী ও শিশু বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৬৮ জন নারী ও শিশু। মার্চের তুলনায় এপ্রিলে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে। এপ্রিলে অন্তত ৩১২টি সহিংসতার ঘটনা রেকর্ড হয়েছে, যা আগের মাসের চেয়ে ২৩টি বেশি। এর মধ্যে ৫৪টি ধর্ষণ ও ১৪টি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা রয়েছে। ওই মাসেই ৮৯ জন নারী ও শিশু হত্যার শিকার হন।  এর আগের মাস মার্চে এই সংখ্যা ছিল ৭৩ জন। গত ফেব্রুয়ারিতে অন্তত ২৩৬ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হন। এর মধ্যে ধর্ষিত হয় ২৪টি শিশু। গত মঙ্গলবার এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।

যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের শিকার অনেক শিশুর পরিবার দরিদ্র ও অসহায় হওয়ায় তারা বিচারহীনতায় ভোগে। সমাজের প্রভাবশালীদের হুমকির মুখে অনেকেই এমন নির্যাতনের ঘটনা এড়িয়ে যান। গ্রামাঞ্চলে এসব ঘটনায় স্থানীয় প্রভাবশালীরা সালিশের মাধ্যমে সমাধান করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। গত তিন মাসে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে এমন উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

পুলিশ বলছে, শিশুসংক্রান্ত অপরাধে জিরো টলারেন্স-নীতি আছে। এসব ঘটনার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত পরিচিতজন হয়ে থাকে। এ বিষয়ে শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ যেখানে বা যাদের কাছে শিশুরা নিরাপদ থাকার কথা সেসব ক্ষেত্র বা জায়গাতেই এমন অভিযোগ বেশি। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

অপরাধ বিশ্লেষক ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা কামরুল ইসলামের মতে, শিশু ধর্ষণের ঘটনা বাড়ার অন্যতম কারণ দ্রুত বিচার না হওয়া এবং অবাধ মাদক। অনেক মামলায় দীর্ঘসূত্রতা থাকে। অপরাধীরা মনে করে, শাস্তি এড়ানো সম্ভব। ফলে তারা এ ধরনের পৈশাচিক ঘটনা ঘটাতে দ্বিধা করে না। আবার অবাধে বা অতিরিক্ত মাদক সেবনও একজন মানুষকে অমানুষ করে তোলে। এ ব্যাপারে পুলিশকে সঠিক তদন্তে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে। দ্রুত তদন্ত ও বিচার করতে হবে। সাজাও প্রদান করতে হবে দ্রুত। এ ছাড়া প্রয়োজন সামাজিক দায়িত্ববোধ বাড়ানো। পাশাপাশি আরও বেশি পারিবারিক সতর্কতা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

কামরুল ইসলাম আরও বলেন, প্রযুক্তির অপব্যবহার বিশেষ করে পর্নোগ্রাফি সহজলভ্য হওয়াÑ কিশোর ও তরুণদের বিকৃত আচরণে প্রভাব ফেলছে। এই পরিস্থিতি থেকেও বের হয়ে আসতে হবে।

অপরাধ বিশ্লেষক ও গবেষক খন্দকার ফারুক আহমেদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, তারা গবেষণা করে দেখেছেন, ৯০ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে অপরাধী ভিকটিমের পূর্বপরিচিত। পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের ভেতরের ক্ষমতার অপব্যবহার একটি বড় কারণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম বলেন, আমাদের সমাজে যৌনশিক্ষা নেই, কিন্তু যৌন সহিংসতা আছে। শিশুরা ‘না’ বলতে শেখে না, পরিবারও বিষয়টি আড়াল করতে চায়। ফলে অপরাধী বেপরোয়া হয়ে ওঠে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। শুধু আইন করলেই হবে না, বাস্তবায়ন জরুরি।

আইনজীবী ব্যারিস্টার সায়েদ মুনিম বলেন, বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী শিশু ধর্ষণের শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদ- বা মৃত্যুদ- পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু মামলার তদন্ত ও বিচার দীর্ঘায়িত হয় সাক্ষী সুরক্ষা দুর্বল থাকায়। এতে অনেকেই সুবিচার পান না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মেডিক্যাল রিপোর্ট দেরিতে হয় আবার সাক্ষ্যও অনেক দুর্বল হয়। ফলে এসব মামলা আদালতে প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার এমনও দেখা যায়, সামাজিক চাপের কারণে অনেক পরিবার আপস করে ফেলে।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সালমা ইসলাম রূপালী বাংলাদেশকে জানান, মূল সমস্যা ক্ষমতার কাঠামো। শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, আত্মীয়Ñ যাদের সামাজিক প্রভাব বেশি, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলতে পরিবার ভয় পায়। অনলাইন পর্নোগ্রাফি, বিকৃত কনটেন্ট ও শিশুদের অনিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশও বড় ভূমিকা রাখছে। অনিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল কনটেন্ট কিশোরদের আচরণে প্রভাব ফেলছে। ফলে আইনের শাসন জোরালো করার পাশাপাশি পরিবারে নজরদারি ও মানসিক সহায়তা জরুরি।

অধ্যাপক সালমা ইসলাম বলেন, পুলিশ বা গণমাধ্যম থেকে পাওয়া তথ্যের চেয়ে প্রকৃত ঘটনা অনেক বেশি। সামাজিক লজ্জা, বিয়ের সম্ভাবনা নষ্ট হওয়ার ভয়, প্রভাবশালীদের চাপসহ নানা কারণে অনেকেই (অনেকেই বললে ভুল, অধিকাংশই) থানায় অভিযোগ করতে অনীহা প্রকাশ করেন। আর আমাদের দেশের প্রচলিত বাস্তবতায় এটাই স্বাভাবিক।

শিশু অধিকার ফোরামের নেতা খায়রুজ্জামান কামাল গতকাল বুধবার এই প্রতিবেদককে বলেন, শিশু ধর্ষণের অধিকাংশ ঘটনা প্রকাশ পায় না। ফলে বাস্তব সংখ্যা আরও বেশি। এই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা নীতিমালা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। এ ছাড়া দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা নিষ্পত্তি, সাক্ষী ও ভিকটিম সুরক্ষা প্রোগ্রাম জোরদার, প্রাথমিক পর্যায়ে যৌন ও নৈতিক শিক্ষা এবং ডিজিটাল কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ ও সচেতনতা আরও বাড়ানো দরকার।

তিনি বলেন, শিশুর নিরাপত্তা শুধু আইনের বিষয় নয়, এটি সামাজিক চুক্তি। এটা একজন শিশুর অধিকারও। পরিবার, স্কুল, রাষ্ট্রÑ সবার সম্মিলিত দায় আছে। শিশুদের নিরাপদ রাখতে হলে শুধু অপরাধীর শাস্তি নয়, প্রতিরোধমূলক কাঠামোও শক্ত করতে হবেÑ এটাই এখন সময়ের দাবি।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, হেলপ ফর ইউ, বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএআরএফ) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো বলছে, শিশু নির্যাতনের অভিযোগের বড় অংশই যৌন সহিংসতা। ভুক্তভোগীদের উল্লেখযোগ্য অংশ ৬ থেকে ১৫ বছর বয়সী।

শিক্ষাবিদ হাসান মনসুর বলেন, আমাদের দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাগুলো সরকারি নজরদারির বাইরেই থেকে যায়। অনেক মাদ্রাসা ও আবাসিক প্রতিষ্ঠানে সিসিটিভি নেই। ডে কেয়ার ইউনিটগুলোও কতটা নজরদারিতে থাকে? অনেক প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষক নিয়োগে মনস্তাত্ত্বিক যাচাই হয় না। শিশু সুরক্ষা নীতিমালা কোথাও কার্যকর নয় এবং অভিযোগ করলে প্রতিষ্ঠান ‘সুনাম’ রক্ষায় তা চেপে যেতে চায়। এটা ঠিক নয়। এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে সবার আগে এই নীরবতার সংস্কৃতি ভাঙতে হবে।

হাসান মনসুর বলেন, সরকারি পর্যায় থেকে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মনিটরিং আরও জোরদার করা দরকার। একই সঙ্গে পরিবারে খোলামেলা আলোচনা না থাকায় শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা ভুল উৎস থেকে শিক্ষা নেয় বলে তিনি জানান। ফলে এটাও জরুরি।

শিশু অধিকারকর্মীদের মতে, সামাজিক লজ্জা ও কুসংস্কার বড় বাধা। এই সমাজে ভুক্তভোগীকে দোষারোপের প্রবণতা আছে, এই কারণে পরিবার বিচার চায় না, মীমাংসা চায়। এই বাস্তবতার কারণে অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হয়। এখান থেকে বের হতে হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা নীতিমালা এবং শিক্ষক নিয়োগে ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই ও মনস্তাত্ত্বিক মূল্যায়ন দরকার। একই সঙ্গে দরকার, প্রাথমিক স্তরে বয়সভিত্তিক যৌন ও নৈতিক শিক্ষা এবং পরিবারভিত্তিক সচেতনতা কর্মসূচি।

শিশু অধিকার বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, গ্রামাঞ্চলের খোলা মাঠে খেলতে থাকা শিশুরা, শিক্ষা ও আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা এবং বাসগৃহে শিশু গৃহকর্মী প্রায়ই এই ধরনের নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হয়। এটি রাষ্ট্র বা সমাজের জন্য ব্যর্থতা। দ্রুত বিচার, প্রতিরোধমূলক শিক্ষা ও সামাজিক জিরো টলারেন্স ছাড়া এই পরিস্থিতি বদলাবে না। শুধু আইন দিয়ে নয়, সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে এ অপরাধ থামানো যাবে না। শিশু সুরক্ষা এখন আর আলাদা কোনো ইস্যু নয় এটি জাতীয় নিরাপত্তা, নৈতিকতা ও মানবিকতার প্রশ্ন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশে প্রচলিত বিশেষ সুরক্ষা কাঠামো আরও জোরদার করতে হবে। আইনের প্রয়োজনে শিশুবান্ধব জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ তৈরি করতে হবে। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আরও সক্রিয় করতে হবে। স্কুল-কমিউনিটি সচেতনতা কর্মসূচি তৈরি করে শিশুদের সেফ টাচ/আনসেফ বা ব্যাড টাচ সম্পর্কে শিক্ষা এবং অনলাইন নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এ ছাড়া পারিবারিক সেবা বা আশ্রয়ের আদলে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার ও কাউন্সেলিং বা ট্রমা কেয়ার আরও বাড়ানো জরুরি।