× UCB Sticker Card
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

ইকবাল হাসান ফরিদ

প্রকাশিত: মে ২৫, ২০২৬, ০৯:৩৬ পিএম

চামড়ায় এবারও সিন্ডিকেট শঙ্কা

ইকবাল হাসান ফরিদ

প্রকাশিত: মে ২৫, ২০২৬, ০৯:৩৬ পিএম

ছবি- রূপালী বাংলাদেশ গ্রাফিক্স

ছবি- রূপালী বাংলাদেশ গ্রাফিক্স

কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে এবারও বাড়ছে উদ্বেগ। সরকারের নানামুখী উদ্যোগের পরও কোরবানিতে পশুর চামড়ায় এবারও সিন্ডিকেটের থাবার আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রতি বছর সরকার দাম নির্ধারণ করে, বৈঠক হয়, মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু ঈদের দিন মাঠের বাস্তবতা হয়ে ওঠে ভিন্ন। কোথাও পানির দরে বিক্রি, কোথাও রাস্তার পাশে পড়ে থাকে শত শত চামড়া, আবার কোথাও সংরক্ষণের অভাবে পচে নষ্ট হয় কোটি টাকার সম্পদ।

চামড়া খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ বছরও সেই পুরোনো আশঙ্কা কাটেনি। বরং ঈদ সামনে রেখে রাজধানীর পোস্তা, সাভারের চামড়া শিল্পনগরী, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীর কয়েকটি বড় আড়তকে কেন্দ্র করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। দাদন বাণিজ্য, কৃত্রিম আতঙ্ক, লবণের সংকট এবং ট্যানারির ধীরগতির ক্রয়ের কারণে শেষ পর্যন্ত ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন সাধারণ কোরবানিদাতা, মৌসুমি ব্যবসায়ী এবং সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল কওমি মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো।

এবার পরিস্থিতি সামাল দিতে আগেভাগেই সক্রিয় হয়েছে সরকার। সিন্ডিকেট ভাঙতে এবং চামড়া পাচার বন্ধ করতে নেওয়া হয়েছে নানামুখী উদ্যোগ। শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রায় ১৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকার লবণ কেনা হয়েছে। এসব লবণ জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বিভিন্ন মাদ্রাসা, এতিমখানা ও চামড়া সংগ্রাহকদের বিনা মূল্যে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কাঁচা চামড়ার নতুন মূল্য নির্ধারণ, পরিবহন নিয়ন্ত্রণ, মাঠপর্যায়ে মনিটরিং এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

সরকার এ বছর ঢাকার ভেতরে গরুর কাঁচা চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করেছে। গত বছরের তুলনায় গড়ে ২ টাকা বাড়ানো হয়েছে। খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরির চামড়া ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে মাঠের ব্যবসায়ীরা বলছেন, কাগজে-কলমে নির্ধারিত দাম আর বাস্তব বাজারের মধ্যে বিশাল ফারাক থেকেই যাচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঈদের অন্তত এক মাস আগে থেকেই সিন্ডিকেটের মূল খেলোয়াড়রা মাঠপর্যায়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ফড়িয়াদের দাদন বা অগ্রিম টাকা দিয়ে নিয়ন্ত্রণে নেয়। ফলে ঈদের দিন চামড়া কেনাবেচার পুরো বাজার চলে যায় তাদের ইশারায়।

একাধিক মৌসুমি ব্যবসায়ী রূপালী বাংলাদেশকে জানান, অগ্রিম টাকা নেওয়ার পর তাদের নির্দিষ্ট দামে চামড়া সরবরাহ করতে বাধ্য করা হয়। বাজারে চাহিদা থাকলেও স্বাধীনভাবে দরদাম করার সুযোগ থাকে না।

মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী মিরপুরের আলী আমজাদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ঈদের আগে থেকেই সব এলাকা ভাগাভাগি হয়ে যায়। কে কোথায় চামড়া কিনবে, সেটাও ঠিক করা থাকে। বাইরে থেকে কেউ ব্যবসা করতে গেলে নানা চাপ আসে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা, কামরাঙ্গীরচর ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় প্রভাবশালী চক্র আগে থেকেই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে রাখে। অনেক ক্ষেত্রে ভয়ভীতি ও পেশিশক্তি প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটে। ফলে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক কম মূল্যে চামড়া বিক্রি করেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চামড়া বাজারে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে উঠেছে গুজব। ঈদের আগে থেকেই ছড়িয়ে দেওয়া হয় নানা আতঙ্ক। বলা হয়, ট্যানারিতে জায়গা নেই, বিদেশে চাহিদা কমে গেছে, ব্যাংক ঋণ বন্ধ, ট্যানারি মালিকরা টাকা দিচ্ছেন না। এই আতঙ্কে ছোট ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ দ্রুত চামড়া বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন।

বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে কৃত্রিম অনিশ্চয়তা তৈরি করে একটি শ্রেণি কম দামে বিপুল পরিমাণ চামড়া কিনে নেয়। পরে সেই চামড়াই বেশি দামে ট্যানারিতে বিক্রি করা হয়।

সূত্র জানায়, চামড়া সংরক্ষণের প্রধান উপকরণ লবণ। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লবণ না দিলে চামড়া দ্রুত পচে যায়। আর এই দুর্বলতাকেই হাতিয়ার বানায় অসাধু চক্র।
চামড়া ব্যবসায়ী পুরান ঢাকার জলিল মন্ডল রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রতি বছর ঈদের আগে লবণের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়। গ্রামে দাম হঠাৎ বেড়ে যায়। তখন অনেকেই চামড়া সংরক্ষণ করতে পারেন না। বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করে দেন।’

গত কয়েক বছরে দেখা গেছে, সংরক্ষণের অভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার চামড়া নষ্ট হয়েছে। কোথাও মাটিতে পুঁতে রাখা হয়েছে, কোথাও রাস্তার পাশে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এবার সেই সংকট ঠেকাতে সরকার আগেভাগেই লবণ কেনার উদ্যোগ নিয়েছে।

বিসিকের লেদার সেলের উপপরিচালক মো. মিজানুর রহমান রূপালী বাংলাদেশকে জানান, কাঁচা চামড়ায় একবার লবণ দিয়ে দিলে প্রায় তিন মাস সংরক্ষণ করা যায়। এবার যাতে কোনো সংকট না হয়, সে লক্ষ্যে আগেই লবণ সরবরাহের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে এবার ১৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকার লবণ কেনা হয়েছে ডিলারদের কাছ থেকে। এসব লবণ জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলোতে বিনা মূল্যে দেওয়া হবে। পাশাপাশি সারা দেশে প্রায় দুই লাখ লিফলেট বিতরণ, হাটে ব্যানার স্থাপন এবং এসএমএস প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

চামড়া ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ঈদের পর প্রথম দুই-তিন দিন অনেক ট্যানারি ইচ্ছাকৃতভাবে ধীরগতিতে চামড়া কেনে। এতে আড়তগুলোতে চামড়ার চাপ বাড়ে। একপর্যায়ে সংরক্ষণের ঝুঁকি দেখিয়ে কম দামে বিপুল পরিমাণ চামড়া কিনে নেয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী।

রাজধানীর পোস্তার এক আড়তদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ট্যানারি মালিকরা আগে টাকা দেয় না। ব্যাংকও সহজে ঋণ দেয় না। তখন ছোট ব্যবসায়ীরা আর টিকতে পারে না। কম দামে চামড়া ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহিন আহমেদ। তিনি রূপালী বাংলাদেশকে জানান, এবার ৭৫ থেকে ৮০ লাখ পিস চামড়া কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ট্যানারি খাতে আর্থিক সংকট রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারেও মন্দা চলছে।

সূত্রমতে, চামড়া বাজারের এই অস্থিরতার সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগে কওমি মাদ্রাসা, এতিমখানা ও হেফজখানাগুলোতে। কারণ প্রতি বছর কোরবানির চামড়া বিক্রির অর্থ দিয়েই বহু প্রতিষ্ঠান তাদের বার্ষিক ব্যয়ের বড় অংশ পরিচালনা করে। রাজধানীর একটি কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা আইয়ুব আলী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, সারা দিন কষ্ট করে চামড়া সংগ্রহ করি। কিন্তু বিক্রি করতে গেলে বলা হয় বাজার নেই। শেষে অর্ধেক দামে দিতে হয়। এতে এতিম ছাত্রদের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, চামড়ার এই অর্থনীতি কেবল ব্যবসার বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো দরিদ্র শিক্ষার্থীর জীবন। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, চামড়ার বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের নৈরাজ্য চলছে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কম দামে চামড়া কিনে বিপুল মুনাফা করছে। ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত না হলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের খামার শাখার উপপরিচালক মো. শরিফুল হক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘স্বাস্থ্যসম্মতভাবে পশুর চামড়া ছাড়ানো ও সংরক্ষণের জন্য সারা দেশে ১৫ হাজার ৪৪৪ জন পেশাদার এবং ২২ হাজার ৯১৮ জন অপেশাদার কসাইকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ইসলামিক ফাউন্ডেশন, মসজিদের ইমাম, মাদ্রাসার ছাত্র, জনপ্রতিনিধি ও ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণে ২ হাজার ৬৬৩টি সভা হয়েছে। পাশাপাশি ২ লাখ ৮৮ হাজার লিফলেট ও পোস্টার বিতরণ করা হয়েছে।

বিসিক সূত্র জানায়, কোরবানির পরবর্তী সাত দিন ঢাকার বাইরে থেকে চামড়া রাজধানীতে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা হবে। সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়ানো হবে। এ ছাড়া চামড়া পাচার, চাঁদাবাজি, গুজব ও বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে যৌথ মনিটরিং টিম গঠন করা হচ্ছে।

সরকারি প্রস্তুতি থাকলেও ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকদের বড় অংশ মনে করছেন, কেবল বৈঠক বা সীমিত অভিযান দিয়ে এই সংকটের সমাধান কঠিন। তাদের মতে, দাদননির্ভর বাজারব্যবস্থা ভাঙা, ডিজিটাল মূল্য মনিটরিং চালু, ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি লবণ সরবরাহ এবং মাদ্রাসা-এতিমখানার কাছ থেকে সরাসরি ট্যানারির মাধ্যমে চামড়া কেনার ব্যবস্থা না করলে প্রতিবছরের এই নৈরাজ্য চলতেই থাকবে।

Link copied!