পল্লবীর ছোট্ট রামিসা, কুমিল্লার স্কুলছাত্রী, গাজীপুরের কিশোরী কিংবা গ্রামের এক অসহায় গৃহবধূ। নাম আলাদা, ঠিকানা আলাদা, জীবনও আলাদা ছিল। কিন্তু তাদের অনেকের গল্পের শেষ অধ্যায় এক ভয়ংকর বাস্তবতায় গিয়ে মিলেছে। কোথাও ধর্ষণ, কোথাও সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, কোথাও ধর্ষণের পর হত্যা, আবার কোথাও বিচার না পেয়ে নীরব কান্নায় ডুবে থাকা এক জীবন।
বাংলাদেশে ধর্ষণ এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়। এটি ধীরে ধীরে সামাজিক নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা এবং মানবিক মূল্যবোধের গভীর সংকটে রূপ নিচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে নারী ও শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার খবর। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে, মানববন্ধন হয়, বিচার দাবিতে সোচ্চার হয় মানুষ। কিন্তু কিছুদিন পরই আরেকটি নতুন ঘটনা আগের ঘটনাকে আড়াল করে দেয়। প্রশ্ন উঠছে, কেন বাড়ছে ধর্ষণ? কেন শিশু পর্যন্ত নিরাপদ নয়? কঠোর আইন থাকার পরও কেন থামছে না এই অপরাধ?
পরিসংখ্যান বলছে, উদ্বেগের কারণ রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩ হাজার ৯৯১ জন নারী ও শিশু। এর মধ্যে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৯০২ জন। ধর্ষণের পর প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৯৭ জন। একই সময়ে শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ২ হাজার ৩৩৯টি।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) জানিয়েছে, চলতি বছরের মে মাসে ৮৩ নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তাদের প্রায় ৭০ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে। ধর্ষণের পর ছয়জনকে হত্যা করা হয়েছে, যাদের চারজনই শিশু।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র-আসকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই ১৮০টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৮১ জন ভুক্তভোগী অপ্রাপ্তবয়স্ক। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ১২ বছরের নিচের শিশুর সংখ্যা ৫৬ জন। অর্থাৎ যৌন সহিংসতার সবচেয়ে বড় শিকার হয়ে উঠছে শিশুরাই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকাশিত পরিসংখ্যানই যদি এত ভয়াবহ হয়, তাহলে আড়ালে থাকা প্রকৃত চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. কাজী গোলাম মোখলেছুর রহমান জানিয়েছেন, শুধু ২০২৫ সালেই ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে ১ হাজার ১০০ নারী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসেছেন। এটি দেশের একটি হাসপাতালের হিসাব মাত্র। ফলে সারা দেশের বাস্তব পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা সহজেই অনুমান করা যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, শিশুদের প্রতিরোধক্ষমতা সীমিত। তারা সহজে ভয় পায় এবং অনেক ক্ষেত্রেই ঘটনার কথা প্রকাশ করতে পারে না। ফলে অপরাধীরা তাদের সহজ টার্গেট হিসেবে বেছে নেয়।
রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। শিশুটির বাবা যখন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বিচার দাবি করেন, তখন বহু মানুষ নিজেদের সন্তানের মুখ দেখতে পান রামিসার মধ্যে। এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, ধর্ষণের শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে বয়স কোনো সুরক্ষা নয়।
সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, নারী ও শিশু যখন নিরাপদ থাকে না, তখন বুঝতে হবে সমাজের নৈতিক প্রতিরোধব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। তার মতে, বিচারহীনতা ধর্ষণ বৃদ্ধির অন্যতম বড় কারণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে বহু আলোচিত ধর্ষণ মামলার বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। তদন্তে গাফিলতি, সাক্ষীর অনুপস্থিতি, রাজনৈতিক প্রভাব, দীর্ঘসূত্রতা এবং আপিল প্রক্রিয়ার জটিলতায় অনেক অপরাধী কার্যত শাস্তির বাইরে থেকে যায়। ড. তৌহিদুল হকের ভাষায়, ধরা পড়লেও কিছু হবে নাÑ এই ধারণাটিই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
আইনবিদ ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, অপরাধীর দ্রুত বিচার এবং দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে আইনের ভয় তৈরি হয় না।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, সমাজ থেকে ধর্ষণের ভাইরাস রুখতে হলে তিনটি কাজ আন্তরিকতার সঙ্গে করতে হবে। ধর্ষণবিরোধী অ্যাওয়ারনেস বাড়াতে পুলিশকে উদ্যোগ নিতে হবে এবং ধর্ষণের কোন ঘটনা ঘটলে এর তদন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে করতে হবে। আদালতে বিচার দ্রুত শেষ করতে হবে এবং রায় দ্রুত কার্যকর করতে হবে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্ষণ মূলত যৌনতার অপরাধ নয়, এটি ক্ষমতার অপব্যবহার। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিশোধ, আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, পারিবারিক বিরোধ কিংবা সামাজিক অপমানের উদ্দেশ্যে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন আলোচিত ঘটনায় দেখা গেছে, অপরাধীরা শুধু শারীরিক নির্যাতন নয়, ভুক্তভোগীর সামাজিক মর্যাদা ধ্বংস করতেও সচেষ্ট থাকে।
একজন সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ধর্ষণের অনেক ঘটনায় মাদক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য মাদক আত্মনিয়ন্ত্রণ কমিয়ে দেয়। একই সঙ্গে সহিংস ও অপরাধপ্রবণ আচরণ বাড়িয়ে তোলে। মাদকবিরোধী কার্যক্রম শক্তিশালী না হলে যৌন সহিংসতা প্রতিরোধ করাও কঠিন হবে। এ ছাড়া এখন স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট মানুষের জীবন সহজ করেছে। তবে এর অপব্যবহারও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
এ বিষয়ে সাইবার অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, অনলাইনে যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, ডিজিটাল স্টকিং এবং ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা বাড়ছে। একই সঙ্গে অশ্লীল কনটেন্টের সহজলভ্যতা, অনলাইন গ্রুমিং এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার কিশোরদের একটি অংশকে ঝুঁঁকিপূর্ণ আচরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সাইবার বিশ্লেষক তানভীর জোহার মতে, প্রযুক্তি নিজে অপরাধী নয়; অপরাধী হলো এর অনৈতিক ব্যবহার।
বিশ্লেষকরা বলছেন, একসময় পরিবার ছিল সামাজিক নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এখন অনেক পরিবারে সদস্যরা একই ছাদের নিচে থেকেও বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করছেন। এর নেতিবাচক প্রভাবও পড়ছে সমাজে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা পরিবার থেকেই শুরু হয়। সেই জায়গাটি দুর্বল হয়ে পড়লে সমাজেও তার প্রভাব পড়ে। তার মতে, অনেক শিশু এখন বাস্তব সম্পর্কের চেয়ে ভার্চুয়াল জগতে বেশি সময় কাটাচ্ছে, যা আবেগীয় ও নৈতিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, ধর্ষণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক সামাজিক মনোভাব। ধর্ষণের পরও সমাজের একটি অংশ প্রশ্ন তোলে ভুক্তভোগীর দিকেই। কেন বাইরে গিয়েছিল, কেন একা ছিল, কেন ওই পোশাক পরেছিলÑ এ ধরনের প্রশ্ন অপরাধীকে নয়, বরং ভুক্তভোগীকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। ফলে অনেক পরিবার মামলা করতে ভয় পায়। অপরাধীরাও সেই সুযোগ নেয়। তারা মনে করেন, শুধু কঠোর আইন করলেই হবে না। কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ধর্ষণ প্রতিরোধে জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। ধর্ষণ মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা। প্রতিটি জেলায় আধুনিক ফরেনসিক সুবিধা গড়ে তোলা। সাক্ষী ও ভুক্তভোগী সুরক্ষাব্যবস্থা চালু করা। স্কুল পর্যায়ে সম্মতি, লিঙ্গসমতা ও নৈতিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা। মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করা। শিশু সুরক্ষা টাস্কফোর্স গঠন করা। পরিবারভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম বৃদ্ধি করা। অনলাইন যৌন অপরাধ দমনে বিশেষায়িত সাইবার ইউনিট শক্তিশালী করা।

