বাজেট উপস্থাপন শেষ হয়েছে। সংসদের টেবিল থেকে মোটা নথিপত্র নেমে গেছে, অর্থমন্ত্রীর কণ্ঠে সংখ্যার ঝড়ও আপাতত থেমেছে। কিন্তু দেশের বাতাসে এখনো বাজেটের সুবাস বা গন্ধ। কেউ বলছেন স্বপ্নের বাজেট, কেউ বলছেন কল্পনার, আবার কেউ কেউ বলছেন, এটা একধরনের সাহিত্যকর্ম। যেখানে বাস্তবতা অতিথি চরিত্র, আশাবাদ প্রধান নায়ক। বাজেট এলে দেশের মানুষের প্রথম প্রশ্ন হয়, ‘বাজারে গেলে পকেটের কী হবে?’ অর্থমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে যখন হাজার হাজার কোটি টাকার হিসাব পড়েন, তখন গ্রামের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে শহরের ড্রয়িংরুম পর্যন্ত একটাই হিসাব চলে, ডিম কত হবে, চাল কত হবে আর কাঁচামরিচ এবার কিডনির সমান দামে উঠবে কি না!
বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী বেশ দৃঢ় কণ্ঠেই জানালেন, সরকার এগোচ্ছে ‘থ্রি আর’ কৌশলে। ঠিক কী সেই থ্রি আর, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে যেমন আলোচনা চলছে, তেমনি পাড়ার চায়ের দোকানেও।
একজন অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক বললেন, থ্রি আর মানে নিশ্চয়ই রিলিফ, রিকভারি আর রিল্যাক্সেশন। পাশে বসা এক মুদি দোকানি মাথা নেড়ে বললেন, ‘না না, এটা হলো রোজগার, রেশন আর রেহাই।’ এক ছাত্র বললেন, ‘আমাদেরও একটা থ্রি আর আছেÑ রেজাল্ট, রেজিস্ট্রেশন আর রুম ভাড়া। এগুলো ঠিক থাকলেই দেশ ভালো লাগে।’ আরেকজন ফিসফিস করে বললেন, ভাই, আমার কাছে তো মনে হয় রিজার্ভ, রেমিট্যান্স আর রিজার্ভের জন্য দোয়া।’
আসলে অর্থনীতির জটিল শব্দ যত মানুষের কাছে পৌঁছায়, ততই তারা নিজের মতো করে এর ব্যাখ্যা খুঁজে নেয়। দেশের মানুষ বহুদিন ধরেই এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে তারা অর্থনীতির চেয়ে অর্থের সন্ধানেই বেশি আগ্রহী।
সংবাদ সম্মেলনের সবচেয়ে আলোচিত বক্তব্য ছিল, ‘অভাব থাকলে দুর্নীতির প্রবণতা বাড়ে, বেতন বাড়লে তা কমবে।’ এই বক্তব্য শুনে দেশের বিভিন্ন দপ্তরে নাকি একধরনের নীরব দার্শনিকতা নেমে এসেছে। এক সরকারি কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বললেন, ‘আমরা এত দিন ভুল বুঝে এসেছি। দুর্নীতি আসলে নৈতিকতার বিষয় নয়, এটা ক্ষুধার বিষয়। এখন যদি বেতন বাড়ে, তাহলে হয়তো দুর্নীতিও ডায়েটে যাবে।” আরেকজন যোগ করলেন, ‘তাহলে দুর্নীতি দমন কমিশনের বদলে বেতন বৃদ্ধির কমিশনই যথেষ্ট ছিল!’ অবশ্য বিরোধী দল বিষয়টিকে এত সহজভাবে নেয়নি। তাদের মতে, বাজেটের পাতায় যত আশা লেখা আছে, বাস্তবের খাতায় তত প্রশ্ন জমে আছে।
অবশ্য অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল ‘অভাব থাকলে দুর্নীতি বাড়ে, বেতন বাড়লে তা কমে।’ কথাটি শুনে দেশের মানুষ কিছুক্ষণ ভেবেছে, তারপর হিসাব করতে বসেছে। কারণ প্রশ্ন হলো, এই দেশে সরকারি চাকরি করেন মোট জনসংখ্যার কত শতাংশ? সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো সরকারের হাতে থাকলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর চাবি কি অর্থ মন্ত্রণালয়ের ড্রয়ারে রাখা আছে? গার্মেন্টস কর্মী, দোকানের সেলসম্যান, এনজিওকর্মী, প্রাইভেট স্কুলের শিক্ষক, ফ্রিল্যান্সার, ভ্যানচালক, রিকশাচালক, দিনমজুরÑ তাদের বেতন বাড়ানোর দায়িত্ব কে নেবে? নাকি দুর্নীতি প্রতিরোধের এই মহৌষধ শুধু বেতনভোগীদের জন্য, আর বাকিরা ভাগ্যের ওপর চলবে? পুরান ঢাকার এক রিকশাচালক বিষয়টি শুনে হেসে বললেন, ‘স্যাররা বেতন বাড়াইয়া দুর্নীতি কমাইব, আমরা ভাড়া বাড়াইলে যাত্রী কমে যায়। তাই আমরা এখনো নীতিবান।’ পাশে দাঁড়ানো এক দিনমজুর বললেন, ‘আমার তো বেতনই নাই, আমি দিনে কাজ পাইলে টাকা পাই। তাহলে আমার দুর্নীতি কমানোর ব্যবস্থা কী?’ প্রশ্নটি শুনে আশপাশের সবাই চুপ। কারণ অর্থনীতির বইয়ে এর উত্তর থাকলেও বাজারের থলেতে তার কোনো নমুনা পাওয়া যায়নি।
আরেকজন চায়ের দোকানি আরও গভীর গবেষণা হাজির করলেন। তিনি বললেন, ‘এই হিসাবে দেশে সবচেয়ে সৎ মানুষ হওয়ার কথা রিকশাচালকদের। তাদের কোনো বেতন নেই, ইনক্রিমেন্ট নেই, বোনাস নেই। তার পরও তারা অফিসের ফাইল গায়েব করে না, ব্যাংকের ঋণ খেলাপি করে না, বিদেশে টাকা পাঠায় না। তাহলে সমীকরণটা কোথাও একটু গোলমেলে না?’ তার কথা শেষ হতেই দোকানে উপস্থিত সবাই চায়ে চুমুক দিলেও যুক্তিটা গিলতে একটু কষ্টই হলো।
বাজেটের পর এখন দেশের মানুষের মনে একটাই কৌতূহলÑ সরকার কি আগামীতে শুধু সরকারি কর্মচারীদের বেতন নয়, আলুর বেতন, পেঁয়াজের বেতন, ডিমের বেতনও নিয়ন্ত্রণ করবে? কারণ দেখা যাচ্ছে, মানুষের বেতন বাড়তে সময় লাগে, কিন্তু বাজারের বেতন কমিশন যেন প্রতি সপ্তাহেই বসে। সরকারি কর্মচারী পাঁচ বছরে একবার ইনক্রিমেন্ট পান আর কাঁচামরিচ কখনো কখনো দিনে দুবারও পদোন্নতি পেয়ে যায়। অর্থনীতির এই বিস্ময়কর ক্যারিয়ার গ্রোথ দেখে অনেক চাকরিজীবী এখন মনে মনে পরের জন্মে মরিচ হওয়ার আবেদন করার কথা ভাবছেন।
জনগণ অবশ্য নিজেদের মতো করে থ্রি আরের নতুন অর্থও বের করেছে। রিফর্ম মানে বাজারে গিয়ে আগের কেনাকাটার অভ্যাস সংস্কার করা; রিকভারি মানে মাসের মাঝামাঝি পকেটের হারানো টাকা খুঁজে বের করার চেষ্টা আর রেজিলিয়েন্স মানে ডিমের দাম শুনেও অজ্ঞান না হওয়ার মানসিক শক্তি। অর্থনীতিবিদেরা হয়তো এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত হবেন না, কিন্তু বাজারে যারা ঘোরেন, তাদের কাছে এটিই এখন সবচেয়ে বাস্তব অর্থনৈতিক তত্ত্ব।
বিরোধী দলের নেতারা হয়তো বলতে চাইছেন, ‘অর্থমন্ত্রী বলছেন চার-পাঁচ বছরে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু আমরা জানতে চাই, অর্থনীতি এখন বসে আছে কোথায়? আর ঘুরে দাঁড়ানোর আগে সে কতবার ঘুরবে?’
এই ঘোষণার পর দেশের সাধারণ মানুষ ক্যালেন্ডার হাতে নিয়ে হিসাব শুরু করেছেন। এক রিকশাচালক বললেন, ‘চার বছর পর যদি ভালো হয়, তাহলে এখনকার বাজারটা কে সামলাবে?’ এক গৃহিণী বললেন, ‘ভবিষ্যৎ ভালো হবে শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু পেঁয়াজওয়ালাকে তো ভবিষ্যতের দাম ধরে টাকা দেওয়া যায় না।’
বাজেট ঘোষণার পর দেশের বাজারও যথারীতি নিজস্ব প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। ডিমের দোকানে ডিম চুপচাপ, কিন্তু দাম কথা বলছে। সবজির ঝুড়িতে করলা আগের মতোই তিতা, তবে দামের কারণে তার তিক্ততা আরও গভীর হয়েছে। মাছের বাজারে ইলিশ এখনো গণতান্ত্রিক নয়; সে এখনো ধনীদের সঙ্গে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
মধ্যবিত্ত মানুষগুলো সবচেয়ে মজার অবস্থায় আছে। তারা বাজেট নিয়ে আলোচনা করে, অর্থনীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়, আবার মাস শেষে মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপে ব্যালেন্স দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এই শ্রেণি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দার্শনিক সম্প্রদায়। তারা জানেনÑ যেমন স্বপ্ন দেখতে হয়, তেমনি বাজারও করতে হয়।
বাজেট নিয়ে দেশের মানুষ বরাবরই আশাবাদ ও সংশয়ের মাঝখানে হাঁটে। সরকার বলে সামনে আলো, মানুষ বিদ্যুতের বিল হাতে ধরে সেই আলোর খরচ হিসাব করে। মাসের শেষে বেঁচে থাকার অঙ্ক কষে।
বাজারে গিয়ে একজন ভদ্রলোক দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলেন, ভাই, আলুর দাম কত? দোকানদার বললেন, ৬০ টাকা। ভদ্রলোক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, আলু তো দেখি ধীরে ধীরে জমির নিচ থেকে উঠে অভিজাত শ্রেণিতে চলে যাচ্ছে। দোকানদার বললেন, আলু এখনো সাধারণ মানুষের দলে আছে। মরিচ আর পেঁয়াজ তো অনেক আগেই ভিআইপি হয়ে গেছে। পেঁয়াজ একটু নাটুকে। কয়েক মাস চুপচাপ থাকবে, হঠাৎ একদিন সিদ্ধান্ত নেবেÑ আজ থেকে আমি সোনার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করব। কাঁচামরিচ সবচেয়ে রহস্যময়। সকালে এক দাম, দুপুরে আরেক দাম, সন্ধ্যায় আরেক। তার দাম দেখলে মনে হয় শেয়ারবাজারের কোনো সূচক।
ডিমের আবার আলাদা কাহিনি। একসময় ছিল গরিবের প্রোটিন। এখন ডিমও মাঝে মাঝে এমন ভাব ধরে যে, তাকে দেখে মনে হয় বিদেশ থেকে আমদানি করা কোনো বিলাসপণ্য।
বাজেটের পরে অবশ্য সরকার বলে, কিছু পণ্যের ওপর কর কমানো হয়েছে। খবর শুনে সাধারণ মানুষের চোখে আশার আলো জ¦লে ওঠে। কিন্তু সেই আলো বেশিক্ষণ থাকে না। কারণ মানুষ জানে, কর কমা আর বাজারে দাম কমাÑ এ দুটো ভিন্ন গ্রহের ঘটনা।
পত্রিকা আর টেলিভিশনে শোনা যায়, ‘অমুক পণ্যে শুল্ক কমানো হয়েছে।’ বাজারে গিয়ে দেখা যায়, ‘দাম অপরিবর্তিত।’ কদিন পরে দেখা যায়, ‘দাম সামান্য বেড়েছে।’
অবশ্য ব্যবসায়ীদেরও যুক্তি আছে। তারা বলেন, ডলারের দাম বেড়েছে, পরিবহন খরচ বেড়েছে, সরবরাহ কম, সবকিছু স্বাভাবিক হলে আগামীতে কমে যেতে পারে। আসলে তাদের কাছে দাম বাড়ানোর কারণের কখনো অভাব হয় না।
জনগণও এসব কথা শোনেন। মাথা নাড়েন। তারপর বাজারে গিয়ে এক কেজি মাছের দাম জিজ্ঞেস করে আবার বাস্তবে ফিরে আসেন। আগে বাজারের তালিকা বানানো হতো কী কিনতে হবে। এখন তালিকা বানানোর আগে ভাবতে হয়, কী কী বাদ দিতে হবে। এটাই বাস্তবতা।
তবু এই দেশ আশ্চর্য। এখানে প্রতিটি বাজেটের পর মানুষ নতুন করে আশা করতে শেখে। তারা বিশ্বাস করে, কোনো একদিন হয়তো সত্যিই অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। ডলারের দাম শান্ত হবে, বাজারের ব্যাগ হালকা নয়, সস্তা হবে, আর মাসের শেষে বেতন আর খরচের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হবে।
সেই দিন আসা পর্যন্ত থ্রি আরের তরি নদীতে ভাসবে, অর্থনীতির মাঝি বৈঠা চালাবেন, বিরোধী দল দূর থেকে ঢেউ গুনবে আর সাধারণ মানুষ তীরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করবে। তারা ভাববে, বাজেটের কবিতায় লেখা প্রতিশ্রুতিগুলো একদিন হয়তো বাস্তবের গদ্য হয়ে উঠবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন