ছয় নবজাতক শিশুর মৃত্যুতে কোনোভাবেই থামছে না আদ্-দ্বীন হাসপাতাল বিতর্ক। গত রোববার নিজ নির্বাচনি এলাকায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, আদ্-দ্বীন হাসপাতাল মন্ত্রীকে ‘ম্যানেজ’ করার জন্য কোটি কোটি টাকা নিয়ে পেছনে ঘুরেছে। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ না করে হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছেন। মন্ত্রীর এই বক্তব্যের চ্যালেঞ্জ করেছে আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষ। শুধু তাই নয়, কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কারণে কোনো শিশুর মৃত্যু হয়নি বলেও দাবি করেন আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ডা. শেখ মো. মহিউদ্দিন। হাসপাতাল টিকিয়ে রাখতে সরকারের পেছনে ‘ঘুষের টাকা’ নিয়ে ঘোরার অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে তিনি বলেন, যদি এটি কেউ প্রমাণিত করতে পারে তাহলে আমরা দায় স্বীকার করে নেব।
গতকাল সোমবার বিকেলে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন ডা. শেখ মো. মহিউদ্দিন। সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কড়া পদক্ষেপের পর হাসপাতালটির বর্তমান পরিস্থিতি, আইনি লড়াই এবং শিশুদের মৃত্যুর অভিযোগ নিয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে তিনি এই সংবাদ সম্মেলন ডাকেন। ডা. শেখ মো. মহিউদ্দিন বলেন, সরকার যে প্রতিবেদন দিয়েছে, তার ভিত্তিতে ইতিমধ্যে একটি বিশেষজ্ঞ দল গঠন করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী হাসপাতালের প্রতিটি কক্ষের কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং তা দ্রুত সহনীয় মাত্রায় আনার কাজ চলছে। এ ছাড়া ভবন থেকে বেকারি স্থানান্তরের কাজও প্রক্রিয়াধীন। তিনি বলেন, কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কারণে শিশুদের মৃত্যু হয়েছে বলে যে কথা ছড়ানো হচ্ছে, তা সঠিক নয়। এই কারণে কোনো শিশুর মৃত্যু হয়নি।
হাসপাতালের লাইসেন্স টিকিয়ে রাখতে বিপুল অঙ্কের টাকা লেনদেন বা ঘুষের চেষ্টার যে গুঞ্জন উঠেছে, সে বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা মন্ত্রীর পেছনে টাকা নিয়ে ঘুরিনি। ঘুষ দেওয়ার বিষয়ে কোনো অভিযোগ থাকলে মন্ত্রী নিজে কথা বললেই ভালো হয়। লাইসেন্স বাতিল ও হাসপাতাল বন্ধের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মঙ্গলবার (আজ) মন্ত্রণালয়ে আপিল করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, হাইকোর্টে নতুন কোনো রিট করার বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এখনো কিছু জানে না। তবে মঙ্গলবার আমরা আপিল করব। হাসপাতাল ভবনটির কাঠামোগত উপযোগিতা নিয়ে ডা. মহিউদ্দিন বলেন, ভবনটি হাসপাতালের জন্য অনুপযোগী বলে সরকারের পক্ষ থেকে যে মতামত দেওয়া হয়েছে, সেটি যদি আইনি ও কারিগরিভাবে প্রমাণিত হয়, তবে আমরা এই ভবন ভেঙে ফেলব।
লাইসেন্স বাতিলের পর হাসপাতালের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তিনি জানান, উদ্ভূত পরিস্থিতির মধ্যেই তারা বসে নেই। হাসপাতালের সেবার মান উন্নত করতে বর্তমানে কর্মরত ডাক্তার ও নার্সদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
আদ্-দ্বীনের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ : ঢাকার মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদন করেছেন সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী। সোমবার জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ইউনূছ আলী আকন্দ জনস্বার্থে এ রিট আবেদন করেন। ইউনূছ আলী আকন্দ বলেন, বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর বেঞ্চে এ আবেদনের শুনানি করবেন। তিনি জানান, যে আইনের অধীনে হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে, ১৯৮২ সালের সেই মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ রেগুলেশন অর্ডিনেন্সও চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।
হাসপাতাল বন্ধ হলেও আদ্-দ্বীন উইমেনস মেডিকেল কলেজ বন্ধ হয়নি : লাইসেন্স বাতিল হলেও আদ্-দ্বীন মেডিকেলের শিক্ষার্থীরা অন্য হাসপাতালে প্রশিক্ষণ নিতে পারবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। এদিন এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আদ্-দ্বীন হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়া হলেও আদ্-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজ বন্ধ করা হয়নি। আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা অন্য হাসপাতালে প্র্যাক্টিস করতে পারবে। তাদের আরও হাসপাতাল আছে, সেখানে নিতে পারে। অমানবিক সেবার কারণে আমরা কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সরকারের পক্ষ থেকে হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলের আদেশ জারি করা হয়। হাসপাতালটিতে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আদেশে বলা হয়েছে, আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর (শো-কজ) নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। গত ৯ জুন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সেই নোটিশের যে জবাব দাখিল করে, তা সরকারের কাছে সন্তোষজনক প্রতীয়মান হয়নি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে জনস্বার্থে হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করা হলো।
কোরবানি ঈদের ঠিক আগের দিন গত ২৭ মে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে চিকিৎসাাধীন অবস্থায় ছয়টি শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় হাসপাতালের বিরুদ্ধে অবহেলা ও গাফিলতির অভিযোগ উঠলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটির রিপোর্টের জবাবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

