ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করার লক্ষ্য নিয়ে তিন দিনের দ্বিপাক্ষিক সফরে চীনে আছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই তার প্রথম বিদেশ সফর, যার দ্বিতীয় গন্তব্য হিসেবে বেইজিংকে বেছে নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফর ঘিরে দেশের কূটনৈতিক ও ব্যবসা-বাণিজ্য মহলে ব্যাপক আগ্রহ ও কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো আভাস দিয়েছে, অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই সফরে দুই দেশের মধ্যে শিল্প খাত ও মেগা অবকাঠামোসহ বহুমাত্রিক সহযোগিতার লক্ষ্যে ১৫টিরও বেশি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হতে পারে।
চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসের এক মতামত নিবন্ধে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী শুক্রবার পর্যন্ত চীন সফর করবেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি তার প্রথম বিদেশ সফর এবং দ্বিতীয় গন্তব্য হিসেবে চীনে এসেছেন।
বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলো এ সফর নিয়ে ব্যাপক আশাবাদী। তাদের ধারণা, এই সফরে ১৫টির বেশি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও সমঝোতা সই হতে পারে, যার মধ্যে বড় অবকাঠামো ও শিল্প খাতের প্রকল্পও থাকবে।
চীন ও বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে একে অপরের বন্ধু, প্রতিবেশী এবং কৌশলগত সহযোগী। কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে দুই দেশ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পাঁচ নীতির ভিত্তিতে পারস্পরিক সম্মান ও সমতার সম্পর্ক বজায় রেখেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্রেও তারা একটি উদাহরণ তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক পর্যায়ে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ‘সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতা অংশীদারত্বে’ উন্নীত করা হয়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে টানা ১৫ বছর ধরে চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে চীনে রপ্তানি হওয়া শতভাগ শুল্কযোগ্য পণ্যে শূন্য শুল্ক সুবিধা দিয়েছে বেইজিং। অবকাঠামো উন্নয়নেও দুই দেশের সহযোগিতা উল্লেখযোগ্য। পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্প বাংলাদেশের পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
আঞ্চলিক পর্যায়ে চীন ও বাংলাদেশ শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে একসঙ্গে কাজ করছে এবং রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায়ও সহযোগিতা করছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় তাদের সহযোগিতা আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে। এ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে দারিদ্র্যবিমোচন ও আঞ্চলিক সুশাসন নিয়ে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মও গড়ে তুলেছে উভয় দেশ।
তবে এসব সাফল্যের পরও দুই দেশের সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিতে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রভাব। কিছু পরাশক্তি বাংলাদেশকে নির্দিষ্ট নিরাপত্তা ও উন্নয়ন কাঠামোর মধ্যে টানার চেষ্টা করছে। এমনকি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়েও হস্তক্ষেপ, অসম চুক্তির চাপ এবং ‘ঋণের ফাঁদ’ তত্ত্বের মতো বর্ণনা ব্যবহার করে চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতির ধারাবাহিকতা। তৃতীয় চ্যালেঞ্জ দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য। দক্ষিণ এশিয়ায় এখনো অনেকের মধ্যে চীন সম্পর্কে ধারণা সীমিত। বাংলাদেশের কিছু প্রভাবশালী মহল পশ্চিমা উন্নয়ন মডেলের প্রতি বেশি আস্থাশীল এবং চীনের উন্নয়নপথ ও শিল্প সহযোগিতার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নেয়।
অন্যদিকে, কিছু অভিজাত মহল চীনের উন্নয়ন মডেল ও সহযোগিতার সুবিধা স্বীকার করলেও যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন। একই সঙ্গে দেশের কিছু আলোচনায় বাণিজ্য ঘাটতির জন্য শুধু চীনা পণ্যের প্রবেশকে দায়ী করা হয়, অথচ রপ্তানি পণ্যের সীমিত বৈচিত্র্য ও সক্ষমতার মতো কাঠামোগত বিষয়গুলো উপেক্ষিত থাকে।
তবে এসব চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করা অসম্ভব নয়। এর জন্য উভয় পক্ষের আরও দূরদর্শিতা ও ধৈর্যের প্রয়োজন। বিশেষ করে পারস্পরিক দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য কমাতে খোলামেলা আলোচনা ও যোগাযোগ বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের প্রকৃত অর্থে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি অনুসরণের রাজনৈতিক সাহস দেখাতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে কতটা গভীর সহযোগিতা চায়, তা দুই দেশ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরবে।

