ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬

এক বিতর্ক এড়াতে আরেক বিতর্কে সিলেট প্রশাসন

সিলেট ব্যুরো
প্রকাশিত: জুন ২৫, ২০২৬, ০২:৪৪ এএম

সিলেটে হযরত শাহজালালের (রহ) মাজারের দানবাক্স বিতর্ক ও সমালোচনা এড়াতে জেলা প্রশাসক (ডিসি) সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহারের পর ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি সাহাকে। তার দায়িত্বভার গ্রহণের পর থেকে প্রশাসনের বাইরে সিলেটজুড়ে সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক মহলে চলছে নানামুখী গুঞ্জন। রাজনৈতিক সূত্র জানায়, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি সাহাকে জেলা প্রশাসকের চলতি দায়িত্ব দিয়ে আরেক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে প্রশাসন। তাকে দায়িত্ব দিতে গিয়ে প্রশাসনে রীতিমতো টানাপোড়েন শুরু হয়। মূলত মাজার বিতর্কের পর এই দায়িত্ব হস্তান্তর ঘিরে নানা সংশয় ও সন্দেহ ডালপালা মেলেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সারওয়ার আলম বিদায়ের আগে চেয়েছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. নূরের জামান চৌধুরী দায়িত্ব পালন করুন। তিনি ৩৩তম বিসিএস কর্মকর্তা। নূরের জামান চৌধুরী অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুতে সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) হিসেবে যোগদান করেন।

তাকে দায়িত্ব দেওয়ার লক্ষ্যে কাগজপত্রও তৈরি করা হয়। তবে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কড়া নির্দেশ এবং বিভাগীয় কমিশনারের অনমনীয় অবস্থানের কারণে শেষ পর্যন্ত পিংকি সাহাকে এই দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

সূত্র আরও জানায়, এই আকস্মিক রদবদল ও দায়িত্ব বণ্টনের নেপথ্যে রয়েছে হযরত শাহজালালের (রহ.) মাজারের দানবাক্স বিতর্ক। সম্প্রতি দরগাহর দানবাক্সকেন্দ্রিক আর্থিক অনিয়ম এবং প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের জেরে ডিসি সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করা হয়। যদিও সরকারি তরফ থেকে এ দাবি অস্বীকার করা হচ্ছে। তাকে প্রত্যাহারের পর প্রশ্ন ওঠে, কার হাতে যাচ্ছে সিলেটের শীর্ষ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ? একটি পক্ষের আশঙ্কা ছিল, ডিসির পছন্দের কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিলে সেখানে পরোক্ষভাবে ‘জামায়াত কানেকশন’-এর প্রভাব তৈরি হতে পারে। এমন একটি বিতর্কিত পরিস্থিতিতে প্রশাসন কোনো ধরনের ঝুঁকি না নিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন কৌশলের আশ্রয় নেয়।

পিংকি সাহার দায়িত্ব গ্রহণও পুরোপুরি বিতর্কহীন রাখা যাচ্ছে না। বিদায়ী ডিসি সারওয়ার আলমের পক্ষের একটি মহল এখন মাঠপর্যায়ে জল ঘোলা করার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে জানা গেছে। তারা নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ধর্মীয় বিশ্বাস এবং তিনি ‘ইসকন ভক্ত’Ñ এমন বিষয়কে সামনে এনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন মহলে সমালোচনা ও বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করছে। যদিও এর আগে সুবর্ণা সরকার সিলেটের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের পরিচালক থাকাকালে একাধিকবার সিলেটের জেলা প্রশাসকের (ভারপ্রাপ্ত) দায়িত্ব পালন করেন। এমনকি বিতর্কিত ডিসি শের মাহবুব মুরাদের বিদায়ের পর তাকে জেলা প্রশাসকের চলতি দায়িত্বও দেওয়া হয়। বিদায়ী ডিসি সারওয়ার আলমও সুবর্ণা সরকারের কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নিয়েছিলেন। তখন নারী কর্মকর্তা হিসেবে তাকে নিয়ে কোনো মহল থেকে সমালোচনা বা আপত্তি ওঠেনি। অথচ যে অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন শের মাহবুব মুরাদ, সুবর্ণা সরকারও সেই একই অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন। প্রচলিত আছে, সুবর্না সরকারের পরামর্শ ও সহায়তাতেই সাদাপাথর কা-ে জড়িয়ে পড়েছিলেন মাহবুব মুরাদ। কেননা দীর্ঘদিন সিলেটে অবস্থানের কারণে সাদাপাথর লুটপাটকারীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে উঠেছিল সুবর্ণার।

সূত্রের দাবি, পিংকি সাহাকে দায়িত্ব দেওয়ার পেছনে নীতিনির্ধারকদের একটি সুনির্দিষ্ট কৌশল থাকতে পারে। দরগাহ দানবাক্স বিতর্কের পর প্রশাসন এমন একজনকে খুঁজছিল, যিনি এই স্পর্শকাতর ধর্মীয় বিষয়ে কোনো পক্ষের হয়ে শক্ত অবস্থানে যাবেন না। পিংকি সাহা অন্য ধর্মের অনুসারী এবং একজন নারী কর্মকর্তা হওয়ায় তিনি মাজারের অভ্যন্তরীণ বা ধর্মীয় দ্বন্দ্বে নিজেকে জড়ানো থেকে বিরত থাকবেন এবং সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে শুধু রুটিন প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করবেন। এই সমীকরণ থেকেই হয়তো উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে তাকে এই চেয়ারে বসানো হয়েছে।

এত বড় ঘটনা ঘটলেও এতদিন নীরব ছিলেন সিলেটের দুই মন্ত্রী। এর মধ্যে গতকাল বুধবার সিলেটে পা রেখে ডিসি সারওয়ার আলম প্রত্যাহার ইস্যুতে কথা বলেন মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। এদিন সিলেটের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন তিনি। এর আগে গণমাধ্যমকে মন্ত্রী বলেন, সারওয়ার আলম আমাদের চোখ খুলে দিয়েছেন। তার স্বচ্ছতার পদক্ষেপে আমাদের সহযোগিতা করা প্রয়োজন। আমরা সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করব যেন মাজারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং মানুষের যে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা, সেটা পূরণ হয়। আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, আমি দেশের বাইরে ছিলাম। বাইরে থেকে আসার পরে আমি বাণিজ্যমন্ত্রীকে পার্লামেন্টে পেয়ে আলাপ করেছি। আমরা চাইব আমাদের সিলেটের বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারসহ সবাই বসে, সিলেটের সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে আলোচনা করে জনগণের মনে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে।

তিনি ডিসি সারওয়ার আলমকে সরানোর ব্যাপারে বলেন, এটা জনপ্রশাসন নিজেই আগে থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল। এটি তাদের রুটিন ওয়ার্ক। হয়তো এই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত; কিন্তু আল্টিমেটলি এটা আরও আগে হলেও হতো, পরে হলেও হতো। অনেকটা কাকতালীয়ভাবেও তার বদলির আদেশটি ওই সময় পড়ে গেছে।

উল্লেখ্য, গত কয়েকদিনে সিলেটে ঘটে যাওয়া একগুচ্ছ নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহের পরই পরিস্থিতি এমন মোড় নিয়েছে। ঘটনার সূত্রপাত গত ১৮ জুন বিকালে, যখন বিদায়ী ডিসি সারওয়ার আলমের নির্দেশে হযরত শাহজালালের (রহ.) মাজারের আয়ের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনার কথা বলে সেখানে থাকা ঐতিহাসিক তিনটি ‘ডেগ’ ও দানবাক্স সিলগালা করে প্রশাসনের নিজস্ব নতুন দানবাক্স বসানো এবং নিরাপত্তার জন্য আনসার মোতায়েন করা হয়। এর পরদিনই তিনি হযরত শাহপরাণ (রহ.) মাজারের আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও মাদকের আসর বন্ধে কঠোর নির্দেশ দেন। মাজারের দীর্ঘদিনের রেওয়াজে প্রশাসনের এমন নজিরবিহীন হস্তক্ষেপের পর মাজারের ভক্ত ও স্থানীয়দের একটি অংশ চরম ক্ষুব্ধ হন, যার রেশ ধরে মাত্র তিন দিনের মাথায় গত ২১ জুন বিকেলে ডিসি সারওয়ার আলমকে আকস্মিক প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। এই প্রত্যাহারের প্রতিবাদে আবার তার সমর্থক একটি পক্ষ রাস্তায় নেমে পুনর্বহালের দাবিতে মানববন্ধন করে। এই চরম উত্তেজনার মধ্যেই গত ২২ জুন বিকেলে বিদায়ী ডিসির উপস্থিতিতে মাজারের সিলগালা করা ঐতিহাসিক ডেগগুলো খুলে সর্বমোট ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৫৯ টাকা ও ৭ আনা সোনা প্রকাশ্যে গণনা করে সোনালী ব্যাংকে মাজারের নতুন অ্যাকাউন্টে জমা করা হয়। এরপর সেই রাতেই সব রুটিন দায়িত্ব পিংকি সাহার কাছে বুঝিয়ে দিয়ে সারওয়ার আলম পরদিন সিলেট ত্যাগ করেন। তবে মাজারের দানবাক্স ও ডেগগুলোর নিয়ন্ত্রণ আপাতত জেলা প্রশাসনের হাতেই রয়েছে।