সরকার বদলের পরও যেসব দেশীয় কোম্পানির দৌরাত্ম্য কমেনি, তাদের মধ্যে নাভানা গ্রুপ একটি। এই গ্রুপ এবং আফতাব অটোমোবাইলস লিমিটেডের মালিকপক্ষের চারজনের মধ্যে চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন শফিউল ইসলাম কামাল, ম্যানেজিং ডিরেক্টর খালেদা ইসলাম, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম সুমন, ভাইস চেয়ারম্যান সাজেদুল ইসলাম শুভ্র। তাদের মধ্যে শুধু সাইফুল ইসলাম সুমন কানাডায় পলাতক থাকলেও অন্যরা দেশে বহাল তবিয়তে দিন কাটাচ্ছেন। অর্থ পাচার থেকে শুরু করে অবৈধ সম্পদের মালিক হওয়াসহ এমন কোনো অপকর্ম নেই তারা করেননি। বহু নাটকীয়তার পর গত মঙ্গলবার দিবাগত ভোররাতে সাজেদুল ইসলামকে তেজগাঁও থানার পুলিশ আটক করলেও জামিন পেয়ে যান।
জানা গেছে, সাইফুল ইসলাম সুমন ও সাজেদুল ইসলাম শুভ্র দ্বীপরাষ্ট্র এন্টিগুয়া বারবুডার নাগরিকত্ব পেতেই শুধু ব্যয় করেছেন প্রায় ৪ লাখ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যংক জানিয়েছে, এভাবে বিদেশি নাগরিকত্বে বিনিয়োগ সম্পূর্ণ অবৈধ এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দেশে বসবাসকারী কোনো নাগরিককে এ ধরনের অনুমতি দেওয়া হয়নি। ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পরও তারা কীভাবে দেশে ব্যবসা চালাচ্ছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সাধারণ মানুষ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মালিকপক্ষের চারজন ছাড়াও তাদের অপকর্মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন শীর্ষ চার কর্মকর্তা। তারা হলেনÑ শাহাদাত হোসেন মিয়া, ফারজানা ইয়াসমিন, ইমরান বিন ফেরদৌস ও মোহাম্মদ মনিরুল আলম। তাদের সহযোগিতায় বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যবসার নামে হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে তা বিদেশে পাচার করেছেন শফিউল-সাইফুলরা। নাভানা ফার্মেসি, আফতাব অটোমোবাইলসের আড়ালে তারা কোটি কোটি টাকা দেশের বাইরে অবৈধভাবে পাচার করেছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গত বছরের শুরুতে এই আটজনের বিরুদ্ধে পাওনা টাকা আদায়ের জন্য শ্রম আদালতে মামলা দায়ের করেন কফিল উদ্দিন নামের একজন ব্যবসায়ী। গত বছরের ৮ মে যার রায় ঘোষণা করেন শ্রম আদালতের চেয়ারম্যান (জেলা ও দায়রা জজ) মোহাম্মদ গোলাম আযম। ওই রায়ে বাদী কফিল উদ্দিনকে তার সব পাওনা (২৩ লাখ টাকা) বুঝিয়ে দিতে আদেশ দেন আদালত। আদালত আরও উল্লেখ করেন, এই পাওনা পরিশোধে ব্যর্থ হলে বাদী কফিল উদ্দিন পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন। কিন্তু কফিল উদ্দিনকে আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক পাওনা পরিশোধ না করায় চলতি বছরের ৩ মে নাভানা গ্রুপ ও আফতাব অটোমোবাইলস লিমিটেডের মালিকপক্ষের চারজন এবং চার শীর্ষ কর্মকর্তার (উপরোক্ত আটজন) নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয় এবং তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানাকে এই ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। অভিযুক্তদের মধ্যে সাতজন এত দিন দেশে থাকলেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়েই ঘুরছিলেন। অপর পলাতক আসামি সাইফুল ইসলাম সুমন (কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের ত্রাণ উপকমিটির সদস্য) ৫ আগস্টের পর কানাডায় বিলাসবহুল জীবনযাপন করে আসছেন। বাকিরা দেশে থাকলেও গত মঙ্গলবার পর্যন্ত তাদের কাউকেই গ্রেপ্তার করেনি পুলিশ। শুধু তাই নয়, এই আসামিরা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে পুলিশের নাকের ডগায় ঘুরে বেড়ালেও এদের আটক করতে কোনো রকম তৎপরতাও দেখায়নি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা অথবা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। নাভানা গ্রুপের একটি প্রধান কার্যালয় তেজগাঁও বিভাগে হলেও অন্যান্য কার্যালয় গুলশান এলাকায়। ওয়ারেন্টভুক্ত এসব আসামি গুলশান অফিসে নিয়মিত কাজ করেছেন বলেও জানা যায়।
তবে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের অপকর্ম নিয়ে নানান প্রশ্ন উঠলে গত মঙ্গলবার নাভানা গ্রুপ ও আফতাব অটোমোবাইলস লিমিটেডের ভাইস চেয়ারম্যান সাজেদুল ইসলাম শুভ্রকে গ্রেপ্তার করতে রাতব্যাপী অভিযান চালিয়ে ভোরে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রাতে সাজেদুল ইসলাম শুভ্র বনানীর একটি ভবনে আত্মগোপন করেছিলেন। পুলিশের একটি দল তাকে গ্রেপ্তার করতে মঙ্গলবার সারা রাত অভিযান চালিয়ে ভবনটিতে প্রবেশে ব্যর্থ হয়। তখন থেকেই ভোর পর্যন্ত তারা ভবনের সামনে অপেক্ষা করছিলেন। অবশেষে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করলেও নিজ গাড়িতে চড়েই থানায় যান। থানা থেকে আবার নিজের গাড়িতে করে আদালতে গিয়ে কিছু সময় কাটিয়ে জামিন নিয়ে বাসায় চলে আসেন।
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুবুর রহমান দাবি করেন পুুলিশের গাড়িতেই তাকে থানায় এবং আদালতে নেওয়া হয়েছে।
পাওনাদারেরা অভিযোগ করেন, আশ্চর্যের বিষয় হলো, একদিকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকা এদের প্রত্যেকেই নিয়মিত অফিস করছেন, স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করছেন প্রতিষ্ঠানের কর্মীর ন্যায্য পাওনা বুঝিয়ে না দিয়ে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নাভানা গ্রুপের এক কর্মী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ৫ আগস্টের পর থেকেই বেতন অনিয়মিত। দুই বছরে বড়জোর তিন মাসের বেতন হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের অনেক কর্মী মানবেতর জীবনযাপন করছেন। আর তারা বান্ধবীর জন্মদিন উদযাপনের নামে মাস্তি করে বেড়াচ্ছেন।
এদিকে কানাডায় পলাতক নাভানা গ্রুপের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম সুমনের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ রয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক দুর্নীতি, অর্থ পাচার, কর্মচারী হয়রানি ও জালিয়াতি। ভুয়া কোম্পানি (যেমন কেবিজেড কোম্পানি লিমিটেড) ও অন্যের নামে জাল স্বাক্ষরে ঋণ নিয়ে (আইএফআইসি ব্যাংক থেকে ৫০-৫২ কোটি টাকার ঋণ) বিদেশে পলাতক রয়েছেন এই ব্যবসায়ী। যেই ঋণ সুদে-আসলে ৭০ কোটিতে দাঁড়িয়েছে জানিয়ে আইএফআইসি ব্যাংকের এক কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, তখন সালমান এফ রহমানের সঙ্গে সখ্যের জেরে কোনো ধরনের মর্টগেজ ছাড়াই এত টাকা ঋণ পান তিনি। যেখানে একজন ক্ষুদ্র্র ও কুটির শিল্প ব্যবসায়ীর ১ লাখ টাকা ঋণ নিতে বেগ পেতে হয়, সেখানে এই সাইফুল ইসলামরা কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়ে বিদেশে বিলাসবহুল জীবন কাটাচ্ছেন। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে ন্যাশনাল ফাইন্যান্সেরও মামলা রয়েছে, যা সিআইডিতে তদন্তাধীন বলে জানা গেছে। পাশাপাশি তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের তহবিলে নিয়মিত অর্থ জোগাতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তৎকালীন সরকারের উচ্চপদস্থদের ম্যানেজ করে কালীগঞ্জে নাভানা রিয়েল এস্টেট ও ল্যান্ড প্রজেক্টের (হাইল্যান্ড ১ ও হাইল্যান্ড ২) জন্য সাধারণ মানুষের জমি ভয়ভীতি দেখিয়ে নামমাত্র মূল্যে লিখে নিতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। আর এসবের জন্য গঠন করেছিলেন একটি নিজস্ব পেটোয়া বাহিনী।
এমন পরিস্থিতিতে দেশের আইনের শাসন নিয়ে আবারও প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে আমরা দেখেছি কীভাবে আইনের অপশাসনের মাধ্যমে দোষীরা ছাড় পেয়ে যেত। গণঅভ্যুত্থানের পর একটি নির্বাচিত সরকারের অধীনে অর্থ পাচারের মতো নিকৃষ্ট কাজে জড়িত কেউ আইনের ফাঁক গলে বের হয়ে যাবে, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সরকার যদি সত্যিই দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী হয়, তাহলে দ্রুততম সময়ে এসব অর্থ পাচারকারীকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসবে বলে আমি মনে করি। নইলে আবারও দেশে অরাজকতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা তীব্র।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের অর্থ পাচারের বিষয়টি নজরদারির মধ্যে রেখেছে জানিয়ে ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, বিগত আমলে যারা অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিল, বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) মাধ্যমে তাদের সবাইকে নজরদারির মধ্যে রাখছে। কারোরই সুযোগ নেই অর্থ পাচার করে ছাড় পাওয়ার।

