নারীর সঙ্গে আপত্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় বরখাস্ত হওয়া বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানটির বন্দর ও পরিবহন বিভাগের পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন চাকরিতে ফিরতে কোটি টাকার মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। নারীকা-ে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করার পর তদন্ত প্রতিবেদন পক্ষে দেওয়ার জন্য রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করারও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, বিএনপির প্রভাবশালী দুজন নেতাকে দিয়ে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে কয়েক দিনের মধ্যে আরিফ উদ্দিনের বরখাস্ত আদেশ প্রত্যাহার করে তাকে স্বপদে পুনর্বহাল করতে।
বন্দর ও পরিবহন বিভাগের পরিচালক এ কে এম আরিফকে নারীর সঙ্গে অনৈক সম্পর্কের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় গত মঙ্গলবার সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। একই সঙ্গে তার পদে দায়িত্ব দেওয়া হয় আরেক কর্মকর্তাকে। বরখাস্তের আদেশে বলা হয়েছে, বিআইডব্লিউটিএ বন্দর ও পরিবহন বিভাগের পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে নারী কেলেঙ্কারি, দুর্নীতি ও অসদাচরণের অভিযোগের ভিডিও ক্লিপ প্রকাশিত হওয়ায় কর্তৃপক্ষের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা, ১৯৯০-এর বিধি ৩৫ (খ) ও (ঙ) লঙ্ঘনের কারণে বিধি ৪১(১) অনুযায়ী তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, বরখাস্তকালীন তিনি বিধি অনুযায়ী খোরাকি ভাতা পাবেন। একই সঙ্গে তাকে বিআইডব্লিউটিএর প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগে নিয়মিত হাজিরা দিতে হবে। হাজিরা প্রদান সাপেক্ষে তার খোরাকি ভাতা পরিশোধ করা হবে।
সূত্র জানিয়েছে, এ কে এম আরিফ উদ্দিনের ঘটনা তদন্তে বিআইডব্লিটিএর সদস্য (পরিকল্পনা ও পরিচালন) যুগ্ম সচিব মো. সাজেদুর রহমানকে আহ্বায়ক করে একই দিন (গত ২৩ জুন) একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির আরও দুজন সদস্য হলেন প্রতিষ্ঠানটির অর্থ বিভাগের পরিচালক মো. মিজানুর রহমান এবং আইসিটি বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মো. সুলতান আরেফিন। কমিটি গঠনের আদেশে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ক্লিপ ও অন্যান্য অভিযোগ নিয়ে প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে যাচাই-বাছাই করে সত্যতা ও প্রকৃত তথ্য উদঘাটন এবং এ সংশ্লিষ্টতা নিরূপণ করবে তদন্ত কমিটি। কমিটি এ বিষয়ে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে সুপারিশ করবে। তার বিরুদ্ধে অন্য কোনো অভিযোগ থাকলে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ বা মতামত থাকলে তা-ও দেবে। তিন কার্যদিবসের মধ্যে সুনির্দিষ্ট সুপারিশসহ তদন্ত প্রতিবেদন বিআইডব্লিটিএর চেয়ারম্যানের কাছে জমা দেবে। ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটির এক কর্মদিবস পার হয়েছে। শুক্র ও শনিবার সরকারি বন্ধ থাকায় কমিটি আগামী সোমবার বা মঙ্গলবারের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা। যদি কোনো কারণে কমিটি সময় চায়, তাহলে সময় বাড়তে পারে।
বিআইডব্লিটিএর একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, বরখাস্ত কর্মকর্তা আরিফ উদ্দিন বিএনপির দুজন প্রভাশলালী নেতাকে দিয়ে ফোন করিয়েছেন। তারা আরিফ উদ্দিনের বরখাস্ত আদেশ প্রত্যাহার করে চাকরিতে বহাল করার জোর সুপারিশ করেছেন। আরিফ উদ্দিন চাইছেন তাকে আগের পদে অর্থাৎ, পরিচালক (বন্দর ও পরিবহন বিভাগ) পদে পুনর্বহাল করার জন্য। কিন্তু কর্তৃপক্ষ রাজনৈতিক চাপের কারণে তাকে চাকরিতে পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত নিলেও বন্দর ও পরিবহন বিভাগের পরিবর্তে অন্য কোনো জায়গায় পদায়ন করতে চাইছেন। তদন্ত কমিটি তদন্ত করলেও এখনো প্রতিবেদন জমা দেয়নি। দু-এক দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর তার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিআইডব্লিউটিএর এই কর্মকর্তা (এ কে এম আরিফ উদ্দিন) একটি গণমাধ্যমের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক পরিচয়ধারী এক নারীর সঙ্গে আপত্তিজন অবস্থায় ধরা পড়েন। বিবস্ত্র অবস্থায় রুমের মধ্যে আটক করা হয় তাকে। এ ঘটনার একটি ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি বিআইডব্লিটিএর নজরে এলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এ নিয়ে অভ্যন্তরীণ মিটিংয়ের মাধ্যমে তাকে বরখাস্ত না করে তদন্ত কমিটি গঠন করার প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু অধিকাংশ কর্মকর্তা তাকে বরখাস্তের সুপারিশ করলে কর্তৃপক্ষ আরিফ উদ্দিনকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর নির্দেশে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
সূত্র জানিয়েছে, ওই নারী ছাড়াও একাধিক নারীর সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন হোটেল বা ফ্ল্যাটে আরিফ উদ্দিনের রাত কাটানোর অনেক গল্প রয়েছে। মোহাম্মদপুরে এক নারীকে বিয়ের আশ^াসে শারীরিক সম্পর্ক গড়েন। ওই নারী স্ত্রীর অধিকার না পেয়ে নৌপরিবহনমন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগও দেন। মন্ত্রী বিষয়টি জানার পর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। একজন সরকারি কর্মকর্তার এমন নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধ তিনি মেনে নিতে পারেননি। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগও উঠতে থাকে। তার বিতর্কিত নানা কর্মকা-ে নৌমন্ত্রী ও বিআইডব্লিটিএর অধিকাংশ কর্মকর্তা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন।
বিআইডব্লিউটিএর একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিআইডব্লিউটিএর অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আরিফ উদ্দিন। ২০২৪ সালে জুলাই বিপ্লবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাতারাতি নিজেকে বিএনপির লোক পরিচয় দেওয়া শুরু করেন। একসময় ছাত্রদলের রাজনীতি করতেন এমন প্রভাব খাটিয়ে বিআইডব্লিউটিএর অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদকের পদটি ভাগিয়ে নেন। তার বিরুদ্ধে নির্বাচনে কাউকে প্রার্থী হতে দেওয়া হয়নি। অথচ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এই কর্মকর্তা সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তৎকালীন নৌমন্ত্রীদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে বিআইডব্লিউটিএর টেন্ডার, নিয়োগ, বদলি থেকে শুরু করে সবকিছুতেই নিয়ন্ত্রণ ছিল তার। ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক হন এই কর্মকর্তা। ওই সময় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করলেও অনুসন্ধান থমকে থাকে।
সূত্র জানিয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের নানা অভিযোগ থাকলেও আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বীরদর্পেই চাকরি করেছেন এই কর্মকর্তা। নিয়মবহির্ভূত কার্যকলাপের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করার অভিযোগ থাকলেও দাপটের সঙ্গে বিআইডব্লিউটিএ নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এই কর্মকর্তা অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অনিয়মের অভিযোগে একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করে তদন্ত করছে। বিআইডব্লিউটিএতে বদলি, পদোন্নতি এবং বিভিন্ন দরপত্র (টেন্ডার) প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। দুদকে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠতা ও প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে আরিফ উদ্দিন বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন। এমনকি সরকার পরিবর্তনের পরও তিনি নিজের প্রভাব অক্ষুণœ রেখে আগের মতোই সুবিধা ভোগ করে যাচ্ছেন।
২০২৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর দুদকের উপপরিচালক মো. হাফিজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বিআইডব্লিউটিএর পরিচালকের (প্রশাসন) কাছে আরিফের বিভিন্ন নথিপত্র চাওয়া হয়। দুদকের চাহিদাপত্রে উল্লেখিত নথিপত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে : নারায়ণগঞ্জ ও সদরঘাট পোর্টের নির্দিষ্ট সময়ের ব্যাংক হিসাবের বিবরণ। ব্যক্তিগত নথি এবং চাকরিজীবনের শুরু থেকে জুন ২০২৩ পর্যন্ত বেতন-ভাতার তথ্য। এ ছাড়া তার স্ত্রী, সন্তান ও ভাইদের নামে ব্যবসা বা শেয়ার পরিচালনার অনুমোদনসংক্রান্ত কাগজপত্র। আরিফ হাসনাতের বিরুদ্ধে অবৈধ আয়ের অর্থে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিপুল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি অনুযায়ী তার সম্পদ বিবরণীতে রয়েছে রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে একটি বহুতল ভবন। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট। পাবনা জেলায় বিপুল পরিমাণ জমি। একাধিক বেসরকারি ব্যাংকে বিপুল অঙ্কের ফিক্সড ডিপোজিট।

