জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় করা মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদ- দেওয়া হয়েছে। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গতকাল মঙ্গলবার এ রায় দেন। এ ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। মামলার একমাত্র আসামি ইনুর বিরুদ্ধে মোট আটটি অভিযোগ আনা হয়েছিল। রায় সরাসরি সম্প্রচার করা হয় বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি)। এর মধ্য দিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় ষষ্ঠ মামলার রায় ঘোষিত হলো।
রায় উপলক্ষে মঙ্গলবার দুপুর ১টা ৪২ মিনিটে হাজতখানা থেকে ইনুকে ট্রাইব্যুনালের এজলাসকক্ষে আনা হয়। ১টা ৫২ মিনিটে ২১১ পৃষ্ঠার রায় পাঠ শুরু করেন বিচারকরা। ট্রাইব্যুনাল-২-এর দ্বিতীয় সদস্য বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর অভিযোগগুলো পড়ে শোনান। প্রথম সদস্য বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ সাক্ষ্য-প্রমাণের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। এরপর দুপুর আড়াইটার দিকে রায় ঘোষণা করেন চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী। রায়ের পুরো কার্যক্রম বাংলাদেশ টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। ট্রাইব্যুনালে ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এম এইচ তামিম, ফারুক আহাম্মদ, আবদুস সাত্তার পালোয়ানসহ অন্য প্রসিকিউটররা।
প্রসিকিউশন (রাষ্ট্রপক্ষ) জানায়, ইনুর বিরুদ্ধে করা এ মামলার তদন্ত শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ। তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল হয় একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর। এ মামলায় ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয় গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর। উভয় পক্ষের শুনানির পর গত বছরের ২ নভেম্বর অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে গত বছরের ৩০ নভেম্বর এ মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। প্রথম সাক্ষ্য গ্রহণ হয় ১ ডিসেম্বর। প্রসিকিউশন এ মামলায় ১০ জন সাক্ষী হাজির করে। আসামিপক্ষও দুজন সাফাই সাক্ষী হাজির করে। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয় চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল। এক মাস পর যুক্তিতর্ক শেষ হয় ১৩ মে। এর পর থেকে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষায় ছিল। ২২ জুন ট্রাইব্যুনাল রায়ের জন্য গতকাল মঙ্গলবার ধার্য ছিল।
আদালত সূত্র জানিয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে মোট আটটি অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে তিনটি প্রমাণিত হয়েছে। সে জন্য তাকে ১০ বছর কারাভোগ করতে হবে। আর বাকি পাঁচটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। মামলার একমাত্র আসামি ইনু। রায় ঘোষণা উপলক্ষে তাকে গতকাল মঙ্গলবার কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। রায় সরাসরি সম্প্রচার করা হয় বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি)। ৮ অভিযোগের মধ্যে ৩, ৬ ও ৭ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ইনুকে দোষী সাব্যস্ত করে দ- দেওয়া হয়েছে।
রায়ে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ৩ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদ- দেওয়া হলো। ৬ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে ১ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণসহ ১০ বছরের সশ্রম কারাদ- দেওয়া হলো। ৭ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে ১ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণসহ ১০ বছরের সশ্রম কারাদ-ে দ-িত করা হলো। আসামির বিরুদ্ধে আরোপিত কারাদ-ের সব সাজা যুগপৎ চলতে থাকবে বলে রায়ে উল্লেখ করেন ট্রাইব্যুনাল। অর্থাৎ ইনু মোট ১০ বছর কারাভোগ করবেন। আর ১, ২, ৪, ৫ ও ৮ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।
ইনুর সাজা অপ্রতুল, রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে : চব্বিশের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১৪ দলীয় জোটের শরিক ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ১০ বছরের কারাদ-াদেশ অপ্রতুল জানিয়ে এর বিরুদ্ধে আপিল করার কথা জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। গতকাল রায় ঘোষণার পর এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ মন্তব্য করে বলেন, সাজা অপ্রতুল। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে অবশ্যই আপিল করা হবে।
রায় শুনে দ-িত ইনু যা বললেন : রায় ঘোষণার পর এটিকে ‘প্রহসনের বিচার’ ও ‘ফরমায়েশি রায়’ বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। রায় ঘোষণা শেষে এজলাস থেকে বের হওয়ার সময় ইনু বলেন, যাই হোক, যাই হোক। মিথ্যা মামলার হয়রানি ও নিপীড়ন থেকে মুক্তি পেলাম। এটি প্রহসনের বিচার। প্রহসনের আদালতে ফরমায়েশি রায়। প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলে সাবেক এই তথ্যমন্ত্রী বলেন, প্রশাসন বিমাতাসুলভ। রায় উপলক্ষে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হলে হাসিমুখেই কাঠগড়ায় উঠতে দেখা যায় মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলার একমাত্র আসামি হাসানুল হক ইনুকে। এজলাসে তোলার সময় দায়িত্বরত এক পুলিশ সদস্যকে আঙুল উঁচিয়ে শাসাতে থাকেন তিনি। ওই পুলিশ সদস্য তার হাত ধরতে গেলে ইনু বলে ওঠেন, ‘হাত ধরবেন না, ভদ্রতা শিখুন।’ বেশ উত্তেজিত হয়েই এ কথা উচ্চারণ করেন জাসদের এই সভাপতি।
প্রসংগত ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমন করতে গিয়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে এমন অভিযোগে বিচার চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। এর মধ্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যাসহ আট অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা হয় ইনুর বিরুদ্ধে। এই মামলায় ইনুর বিরুদ্ধে মোট আটটি অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে নিজের নির্বাচনি এলাকা কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যাসহ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় উসকানি দেওয়া, শেখ হাসিনার সঙ্গে থেকে আন্দোলনকারীদের দমনে গুলির নির্দেশ দেওয়া, কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন করে আন্দোলনকারীদের গুলির নির্দেশ দেওয়া ইত্যাদি।

