মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার আশিদ্রোন ইউনিয়নে ৪ কোটি ৫ লাখ টাকা ব্যয়ে চলমান একটি সড়ক নির্মাণ ও সংস্কার প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে খোয়া ও বালুর পরিবর্তে মাটি ব্যবহার এবং আরসিসি ঢালাইয়ে নি¤œমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগে ক্ষুব্ধ হয়ে কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী। এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর একটি লিখিত অভিযোগও জমা দেওয়া হয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তদারকির অভাব ও নিয়ম না মেনে তড়িঘড়ি করে কাজ করায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। নি¤œমানের সামগ্রী দিয়ে দায়সারাভাবে কাজ শেষ করা হলে সরকারের বিপুল অর্থ অপচয় হবে এবং সড়কটি টেকসই হবে না।
জানা গেছে, উপজেলার আশিদ্রোন ইউনিয়নের হোসনাবাদ গ্রামসহ ৭টি চা বাগান এলাকার একমাত্র প্রধান চলাচলের পথ হোসনাবাদ-বিলাসছড়া সড়ক। এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন ভারী ট্রাক, জিপ, সিএনজিসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচল করে। পাশাপাশি চা শ্রমিকদের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যমও এটি। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে সড়কটি খানাখন্দে রূপ নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছিল। পরবর্তীতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর সড়কটি সংস্কারের উদ্যোগ নেয় প্রশাসন।
এলজিইডি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ‘কালিঘাট-মনু-দলই সার্কুলার রোড’ সংস্কারের জন্য ৪ কোটি ৫ লাখ ২২ হাজার ৮৪৬ টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। কমলগঞ্জের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সানি এন্টারপ্রাইজ এই কাজের দায়িত্ব পায়। চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি কাজের আদেশ ইস্যু করা হয় এবং প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
স্থানীয় বাসিন্দা শাহিন মিয়া, বিনোদ তাঁতি ও সঞ্জয় মুন্ডাসহ অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে সড়ক সংস্কার যদি পাথরের পরিবর্তে ইটের খোয়া ও রাবিশ দিয়ে হয়, আর তা দেখার যদি কেউ না থাকে, তবে এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে? হাত দিয়ে টানলেই কার্পেটিং উঠে যাচ্ছে। তাই আমরা বাধ্য হয়ে গত রোববার সকালে সড়কের বাকি অংশের আরসিসি ঢালাইয়ের কাজ বন্ধ করে দিয়েছি।’
হোসনাবাদ পানপুঞ্জির প্রধান (মন্ত্রী) ওয়েল সুরং অভিযোগ করেন, ‘কাজের শুরু থেকেই পরিমাণমতো রড, সিমেন্ট, সাদা পাথর বা ভালো মানের ইট ব্যবহার করা হচ্ছে না। এলজিইডির নিয়মিত মনিটরিং না থাকায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইচ্ছেমতো কাজ করে যাচ্ছে। রাস্তার পাশে পুরোনো গাইডওয়াল কোনোমতে মেরামত করে তার ওপর নি¤œমানের ইট-পিলার বসানো হয়েছে, যা এখনই ফাটল ধরেছে।’
কাজে নিযুক্ত শ্রমিক জাফর আলী জানান, ঠিকাদার যেভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, তারা সেভাবেই কাজ করছেন। শিডিউলে কী আছে, তা শ্রমিকদের জানার কথা নয়। তবে এলজিইডির কার্যসহকারী আবু বকর সিদ্দিক জানান, শিডিউল অনুযায়ী কাজ হলেও ‘সেলভেজ’ (পুরোনো মালামাল)-এর কারণে ইটের মান কিছুটা নি¤œমানের মনে হতে পারে।
এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সানি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. হাসানুজ্জামান বলেন, ‘যেটিকে খারাপ বলা হচ্ছে, সেটি মূলত সেলভেজের ইট, যা সরকার আমাদের কাছে টেন্ডারের সময় ৭৫ লাখ টাকায় বিক্রি করেছে। সেই পুরোনো ইট দিয়েই খোয়া বানিয়ে সিসি ঢালাই দেওয়া হচ্ছে। গাইডওয়ালের পাশে মাটি ভরাট করা হয়েছে যাতে রাস্তা না ভাঙে।’
এলজিইডির উপ-সহকারী প্রকৌশলী সঞ্জয় প-িত বলেন, ‘সেলভেজের ৭৫ লাখ টাকা বাদ দিলে মূল খরচ দাঁড়াবে প্রায় ৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা। কাজে কিছুটা বেশকম (উনিশ-বিশ) হয়েছে, শতভাগ ভালো কাজ হচ্ছে নাÑ এটি সত্য। তবে পুরোপুরি নি¤œমানের কাজ হচ্ছে না।’
শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রকৌশলী মো. আব্দুর রাকিব বলেন, ‘মাঝেমধ্যে আমি কাজ পরিদর্শনে গিয়েছি, তবে মূলত দায়িত্বে আছেন উপ-সহকারী প্রকৌশলী। যেহেতু নি¤œমানের কাজের অভিযোগ উঠেছে, আমি নিজে সরেজমিনে গিয়ে ত্রুটিপূর্ণ ও নি¤œমানের সামগ্রী থাকলে তা অপসারণের ব্যবস্থা করব।’
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান বলেন, ‘এলাকাবাসীর একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। সড়ক নির্মাণে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি সহ্য করা হবে না। আমি এলজিইডি প্রকৌশলীকে বিষয়টি তদন্তের জন্য নির্দেশ দিচ্ছি এবং তদন্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

