ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬

প্রথম সেমিফাইনাল

ইতিহাসের পাল্লা স্পেনের দিকে, ছাড়বে না ফ্রান্সও

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ১৪, ২০২৬, ০৫:৪৯ এএম

বিশ্বকাপের শেষ চারে জায়গা করে নেওয়ার পর এবার ফাইনালের টিকিটের লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপের দুই পরাশক্তি ফ্রান্স ও স্পেন। বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার রাতে আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই সেমিফাইনাল শুধু দুটি শক্তিশালী দলের লড়াই নয়, বরং এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলা আন্তর্জাতিক ফুটবলের অন্যতম জমজমাট প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন অধ্যায়।

কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামকে ২-১ গোলে হারিয়ে শেষ চার নিশ্চিত করে স্পেন। অন্যদিকে মরক্কোকে ২-০ গোলে পরাজিত করে টানা আরেকটি বিশ^কাপ সেমিফাইনালে জায়গা করে নেয় ফ্রান্স। ফলে বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে দুই দলের মুখোমুখি হওয়া ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

তবে পরিসংখ্যান বলছে, ইতিহাসের পাল্লা কিছুটা স্পেনের দিকেই ঝুঁকে আছে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে এখন পর্যন্ত দুই দলের দেখা হয়েছে ৩৮ বার। এর মধ্যে স্পেন জিতেছে ১৮টি ম্যাচ, ফ্রান্সের জয় ১৩টিতে। বাকি সাতটি ম্যাচ ড্র হয়েছে। গোলের হিসাবেও এগিয়ে স্পেন। তারা করেছে ৬১ গোল, বিপরীতে ফ্রান্সের গোল ৪৬টি।

দুই দলের লড়াই শুধু প্রীতি ম্যাচেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বকাপ, ইউরো, বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব ও উয়েফা নেশনস লিগÑ বড় সব টুর্নামেন্টেই একাধিকবার মুখোমুখি হয়েছে তারা। এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে একবার, বিশ্বকাপ বাছাইয়ে দুবার, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে ছয়বার, উয়েফা নেশনস লিগে দুবার এবং আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে ২৭ বার মুখোমুখি হয়েছে স্পেন ও ফ্রান্স।

এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার সূচনা ১৯২২ সালে। প্যারিসে অনুষ্ঠিত প্রথম ম্যাচে স্বাগতিক ফ্রান্সকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দেয় স্পেন। শুরুর কয়েক দশক ছিল পুরোপুরি স্প্যানিশদের দখলে। প্রথম ৯টি দেখার মধ্যে সাতটিতেই জয় পায় তারা। ১৯২৯ সালে ৮-১ গোলের বিশাল জয় এবং ১৯৪৯ সালে প্যারিসে ৫-১ ব্যবধানের জয় এখনো দুই দলের লড়াইয়ের সবচেয়ে স্মরণীয় ফলগুলোর একটি। ওই সময় ফ্রান্সের একমাত্র জয় আসে ১৯৩৩ সালে, ১-০ ব্যবধানে।

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ধীরে ধীরে পাল্টাতে শুরু করে চিত্র। ১৯৫৫ সালে মাদ্রিদে ২-১ এবং ১৯৫৯ সালে রোমাঞ্চকর ৪-৩ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ভারসাম্য ফেরাতে শুরু করে ফ্রান্স। এরপর দুই দলই ইউরোপের শীর্ষ শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করলে ম্যাচগুলো আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বড় টুর্নামেন্টে দুই দলের দ্বৈরথ নতুন মাত্রা পায় আশির দশক থেকে। ১৯৮৪ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে স্পেনকে ২-০ গোলে হারিয়ে শিরোপা জেতে ফ্রান্স। এরপর ইউরো ২০০০ এবং ২০০৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতেও স্প্যানিশদের বিদায় করে দেয় ‘লে ব্লু’রা।

তবে স্পেনের সোনালি প্রজন্মের উত্থানের পর বদলে যায় দৃশ্যপট। ইউরো ২০১২-এর কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারানোর পর ২০১৪ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ১-০ ব্যবধানের গুরুত্বপূর্ণ জয় পায় তারা। সাম্প্রতিক সময়েও এগিয়ে স্পেন। ২০২১ সালে উয়েফা নেশনস লিগের ফাইনালে ২-১ ব্যবধানে জিতে শিরোপা জেতে ফ্রান্স। কিন্তু তার পরের দুই দেখায় প্রতিশোধ নেয় স্পেন। ২০২৪ ইউরো সেমিফাইনালে ২-১ ব্যবধানে জয় পাওয়ার পর ২০২৫ উয়েফা নেশনস লিগে রোমাঞ্চকর ৫-৪ ব্যবধানে জিতে আত্মবিশ^াস আরও বাড়িয়ে নেয় ‘লা রোহা’রা।

দীর্ঘ ১০৪ বছরের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় স্পেনের পরিসংখ্যানগত শ্রেষ্ঠত্ব থাকলেও নকআউট ফুটবলে অতীতের হিসাব খুব কমই প্রভাব ফেলে। বিশ্বকাপের ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করতে আজ দুই দলই নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দেবে। তাই ইতিহাস, বর্তমান ফর্ম ও দুই দলের তারকাবহুল স্কোয়াডÑ সব মিলিয়ে ফ্রান্স-স্পেন সেমিফাইনাল হতে যাচ্ছে এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণীয় লড়াই।

সবকিছু ঠিক থাকলে আজ ফ্রান্সের নেতৃত্ব দেবেন তুখোড় ফর্মে থাকা কিলিয়ান এমবাপ্পে। অন্যদিকে তরুণ ও অভিজ্ঞদের সমন্বয়ে গড়া স্পেনের নেতৃত্বের ভার থাকবে রদ্রি ফার্নান্দেজের কাঁধে। তবে ম্যাচ শুরুর আগে দল নির্বাচনে কিছুটা পিছিয়ে আছে ফরাসিরা। কারণ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ের চোট ও ফিটনেস-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা কোচ দিদিয়ের দেশমের ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ম্যাচের আগে ফ্রান্স শিবিরে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা মাঝমাঠ নিয়ে। শারীরিক অস্বস্তিতে ভুগছেন মিডফিল্ডার মানু কোনো। একই সঙ্গে কুঁচকির চোটে ভুগছেন অরেলিয়েন চুয়ামেনি। দুজনেরই মাঠে নামা শেষ মুহূর্তের ফিটনেস পরীক্ষার ওপর নির্ভর করছে। রক্ষণভাগেও রয়েছে অনিশ্চয়তা। পিঠের সমস্যার কারণে অভিজ্ঞ দুই সেন্টারব্যাক দায়ো উপামেকানো ও উইলিয়াম সালিবা শনিবারের অনুশীলনে অংশ নেননি। যদিও তাদের বাদ পড়ার বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, তবু অনুশীলনে অনুপস্থিতি ফরাসি শিবিরে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

অন্যদিকে স্পেন রয়েছে অনেকটাই নিশ্চিন্ত। এখন পর্যন্ত তাদের দলে কোনো ইনজুরির খবর নেই। ফলে কোচ নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী সেরা একাদশ নিয়েই মাঠে নামার সুযোগ পাচ্ছেন। মাঝমাঠে রদ্রি ও ফাবিয়ান রুইসের নিয়ন্ত্রণ, সামনে লামিন ইয়ামালের গতি, দানি ওলমোর সৃজনশীলতা এবং মিকেল ওইয়ারসাবালের ফিনিশিংÑ সব মিলিয়ে আত্মবিশ্বাসী স্প্যানিশরা।

ফরাসিদের জন্য এটি যেমন ইনজুরি-সংকট সামলে নিজেদের শক্তিমত্তা প্রমাণের ম্যাচ, তেমনি স্পেন চাইবে পূর্ণ শক্তির দল নিয়ে নিজেদের ধারাবাহিকতা ধরে রেখে আরেকটি ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করতে। তাই সেমিফাইনালের এই মহারণে কৌশল, স্নায়ুচাপ ও মুহূর্তের সিদ্ধান্তই গড়ে দিতে পারে ফাইনালের পথ।

এ পর্যন্ত প্রকাশিত সম্ভাব্য একাদশ অনুসারে দুই দলই ৪-২-৩-১ ছকে খেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ফ্রান্সের সম্ভাব্য একাদশ (৪-২-৩-১) : গোলরক্ষক মাইক মেনিয়াঁ; রক্ষণভাগে জুল কুন্দে, দায়ো উপামেকানো, উইলিয়াম সালিবা ও লুকা দিন; মাঝমাঠে মানু কোনো ও আদ্রিয়েন রাবিও; আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডে উসমান দেম্বেলে, মাইকেল অলিসে ও দেজিরে দুয়ে; একমাত্র স্ট্রাইকার হিসেবে থাকবেন অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে।

স্পেনের সম্ভাব্য একাদশ (৪-২-৩-১) : গোলরক্ষক উনাই সিমন; রক্ষণভাগে পেদ্রো পোরো, পাও কুবার্সি, আয়মেরিক লাপোর্ত ও মার্ক কুকুরেয়া; মাঝমাঠে রদ্রি ও ফাবিয়ান রুইস; আক্রমণভাগে লামিন ইয়ামাল, দানি ওলমো ও অ্যালেক্স বায়েনা; স্ট্রাইকার হিসেবে থাকবেন মিকেল ওইয়ারসাবাল।