দেশে ডিজিটাল লেনদেন দ্রুত বাড়ছে। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), ইন্টারনেট ব্যাংকিং, কার্ড পেমেন্ট, কিউআর কোড, ই-কমার্স, ফেসবুকভিত্তিক ব্যবসা, অনলাইন সাবস্ক্রিপশন ও ডিজিটাল বিজ্ঞাপনÑ সব মিলিয়ে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে। কিন্তু এই বিশাল ডিজিটাল অর্থনীতির প্রকৃত আকার কত, সে বিষয়ে রাষ্ট্রের কাছে কোনো সমন্বিত পরিসংখ্যান নেই। দেশের সরকারি সংস্থাগুলোর কাছেও সামগ্রিক ডিজিটাল অর্থনীতির আকার, কোন খাতে কত লেনদেন হচ্ছে কিংবা ডিজিটাল খাত জাতীয় অর্থনীতিতে ঠিক কতটা অবদান রাখছে, তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র নেই। ফলে দ্রুত সম্প্রসারিত এই অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে নীতিনির্ধারণ, রাজস্ব আদায়, বৈদেশিক মুদ্রার বহিঃপ্রবাহ এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ পরিকল্পনায় বড় ধরনের তথ্যশূন্যতা তৈরি হয়েছে। বিশে^র অধিকাংশ দেশ এবং বড় কোম্পানিগুলো এসব তথ্য পর্যালোচনা করে বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ করে। আর্থিক খাত বিশ্লেষকরা বলছেন, যে অর্থনীতির সঠিক আকার জানা নেই, সেই অর্থনীতির সম্ভাবনাকেও পুরোপুরি কাজে লাগানো যায় না। ডিজিটাল অর্থনীতির পরিসর যত বাড়বে, ততই প্রয়োজন হবে একটি সমন্বিত জাতীয় ডিজিটাল অর্থনীতি পরিমাপ কাঠামো।
জানা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং, ডিজিটাল পেমেন্ট ও অনলাইনভিত্তিক সেবার বিস্তারের ফলে বাংলাদেশেও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে ডিজিটাল অর্থনীতি। গত এক দশকে ই-কমার্স, এফ-কমার্স, স্মার্ট লজিস্টিকস, ফ্রিল্যান্সিং এবং প্রযুক্তিনির্ভর ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই) খাতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ফলে অর্থনৈতিক কর্মকা-ের বড় একটি অংশ ক্রমেই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মনির্ভর হয়ে উঠছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাতেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) আইসিটি ব্যবহারবিষয়ক জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবার মোবাইল ফোন সুবিধার আওতায় এসেছে। মোট জনসংখ্যার ৭৪ দশমিক ৫২ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন প্রায় ১০ কোটি ৩৮ লাখ মানুষ এবং ফিক্সড ব্রডব্যান্ড ব্যবহারকারীর হারও ক্রমেই বাড়ছে। অর্থাৎ ডিজিটাল অবকাঠামো দ্রুত বিস্তৃত হলেও সেই অবকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠা সামগ্রিক ডিজিটাল অর্থনীতির আকার, মূল্য সংযোজন কিংবা জাতীয় অর্থনীতিতে এর প্রকৃত অবদান সম্পর্কে এখনো কোনো সমন্বিত সরকারি হিসাব নেই।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কয়েক লাখ উদ্যোক্তা, ফ্রিল্যান্সার, প্রযুক্তিকর্মী, মার্চেন্ট ও লজিস্টিকস সেবাদাতা ডিজিটাল কমার্স ইকোসিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণেও দেশের ই-কমার্স বাজারের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ও ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে এবং প্রতিদিন হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে। কিউআর কোডভিত্তিক পেমেন্ট ব্যবস্থায়ও যুক্ত হচ্ছেন বিপুলসংখ্যক ব্যবসায়ী। এ ছাড়া জটিল কর ও ভ্যাট-ব্যবস্থা, উচ্চ পেমেন্ট গেটওয়ে ব্যয়, মার্চেন্ট ফি, লজিস্টিকস ব্যয় এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা উদ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল বাণিজ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ব্যবসা, সীমান্তপারের ডিজিটাল সেবা এবং বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ব্যয়ের সমন্বিত তথ্য না থাকায় এই খাতের প্রকৃত আকার, রাজস্ব সম্ভাবনা এবং অর্থনৈতিক অবদান নির্ধারণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
মোটাদাগে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার প্রায় প্রতিটি খাতের তথ্য সংরক্ষণ করে। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, কার্ড, কিউআর পেমেন্ট, এটিএম, ইএফটিএন ও আরটিজিএসÑ সব কিছুর নিয়মিত পরিসংখ্যান রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ডিজিটাল লেনদেনের মূল্য ১০২.২৪ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। কিন্তু এই পরিসংখ্যান মূলত ব্যাংক, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, কার্ড ও অন্যান্য পেমেন্ট অবকাঠামোর মাধ্যমে হওয়া লেনদেনকে প্রতিফলিত করে। এর বাইরে ই-কমার্স, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ব্যবসা, বিদেশি ডিজিটাল সেবা, সফটওয়্যার সাবস্ক্রিপশন, ডিজিটাল বিজ্ঞাপন, গিগ ইকোনমি ও অন্যান্য ডিজিটাল অর্থনৈতিক কর্মকা-ের সমন্বিত জাতীয় হিসাব এখনো নেই। জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, আমরা শুধু পেমেন্ট সিস্টেমের তথ্য রাখি। যে কারণে আমরা ডিজিটাল লেনদেনকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। কারণ সব লেনদেন ডিজিটাল হয়ে গেলে স্বচ্ছতা বাড়বে। অনিয়ম-দুর্নীতি কমে আসবে। একই সঙ্গে নগদ টাকা ছাপানোর পেছনে সরকারের খরচও কমবে। তবে পুরো ডিজিটাল অর্থনীতির হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে নেই। যে কারণে ডিজিটাল অর্থনীতির আকার এক বাক্যে বলা সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করেন।
ডিজিটাল অর্থনীতির পূর্ণাঙ্গ পরিমাপ না থাকায় সম্ভাব্য করযোগ্য অর্থনৈতিক কর্মকা-ের একটি অংশ সরকারের নজরের বাইরে থেকে যেতে পারে বলে মনে করছেন কর-পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া। তার মতে, যা পরিমাপ করা যায় না, তা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ বা করের আওতায় আনা কঠিন। ডিজিটাল অর্থনীতির পূর্ণাঙ্গ পরিমাপ না থাকলে নীতিনির্ধারণ, রাজস্ব পরিকল্পনা এবং বিনিয়োগ কৌশলÑ সব ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বাংলাদেশে ডিজিটাল অর্থনীতির পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান না থাকায় কর-প্রশাসন কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেÑ এমন প্রশ্নের জবাবে নাম না প্রকাশ করার শর্তে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ডিজিটাল সেবায় প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে যায়। এই ব্যয়ের একটি বড় অংশ প্রাতিষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক (হুন্ডি বা অবৈধ) উভয় পথেই স্থানান্তরিত হয়। এ জন্য ডিজিটাল অর্থনীতিকে করের আওতায় আনতে হলে একটি সুনির্দিষ্ট কর-কাঠামো তৈরি এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিগত পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে ই-কমার্স, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, ফ্রিল্যান্সিং এবং সোশ্যাল মিডিয়া বিজ্ঞাপন থেকে রাজস্ব আদায়ের জন্য দেশের কর-নীতিতে ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করেন এ কর্মকর্তা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুারো (বিবিএস) নিয়মিত তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জরিপ পরিচালনা করলেও ডিজিটাল অর্থনীতির আকার বা জাতীয় অর্থনীতিতে এর সম্মিলিত অবদান নিয়ে কোনো পৃথক পরিসংখ্যান প্রকাশ করে না। জানতে চাইলে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ড. আবু শাহীন মো. আসাদুজ্জামান বলেন, দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির একটি বড় অংশ চলে ফেসবুক পেজ বা ছোট ছোট অনলাইন গ্রুপের মাধ্যমে। এই ব্যবসাগুলোর সিংহ ভাগই অনানুষ্ঠানিক এবং কোনো ট্রেড লাইসেন্স বা ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় নেই। ফলে এদের সুনির্দিষ্ট লেনদেনের আর্থিক ডেটা বিবিএসের পক্ষে সংগ্রহ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এ ছাড়া বাংলাদেশে লাখ লাখ ফ্রিল্যান্সার রয়েছে। কিন্তু তাদের উপার্জনের একটি বড় অংশ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে অনানুষ্ঠানিক উপায়ে (যেমন- গেটওয়ে রেসেলার নেটওয়ার্ক) দেশে আসে। এই অনানুষ্ঠানিক বৈদেশিক লেনদেনের কোনো একক ও সুনির্দিষ্ট তথ্যভা-ার বিবিএসের কাছে থাকে না। আবু শাহীন বলেন, ডিজিটাল অর্থনীতির তথ্য বিভাজিত হয়ে আছে বিভিন্ন সংস্থার কাছে। যেমন মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের ডেটা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে, ইন্টারনেট ও টেলিকমের ডেটা বিটিআরসির কাছে এবং করের ডেটা এনবিআরের কাছে থাকে। এই সংস্থাগুলোর মধ্যে রিয়েল-টাইম ডেটা শেয়ারিংয়ের জন্য কোনো কেন্দ্রীয় বা সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম নেই।
দেশের মোট জিডিপিতে আইসিটি খাতের অবদান বর্তমানে ১ থেকে ২.৫ শতাংশের মধ্যে। সরকার আগামী ৫ বছরে এটিকে ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। সরকার আইসিটি খাতের জিডিপিতে অবদানের তথ্য প্রকাশ করলেও, সেটি দেশের সামগ্রিক ডিজিটাল অর্থনীতির আকার নির্দেশ করে না। কারণ ডিজিটাল অর্থনীতি শুধু তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, পরিবহন, আর্থিক সেবা ও অন্যান্য খাতে ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকা-ও এর অন্তর্ভুক্ত। জানতে চাইলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা বলেন, বাংলাদেশের ডিজিটাল কর্মকা-ে বিনিয়োগসংক্রান্ত কোনো হিসাব করার প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল। ফলে এ ধরনের কোনো পরিসংখ্যান স্পষ্ট পাওয়া যায় না। তবে এই পরিসংখ্যানের ঘাটতি দূর করতে এবং সামগ্রিক ডিজিটাল অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে আইসিটি বিভাগ মূলত দুটি উদ্যোগের ওপর জোর দিচ্ছে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল ডিজিটাল আর্কিটেকচারের মাধ্যমে সব মন্ত্রণালয়ের ডেটা এক ছাতার নিচে আনা হচ্ছে, যাতে কোন খাতে কতটুকু প্রযুক্তি ব্যবহার করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে তা নির্ণয় করা যায়। এ ছাড়া এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহযোগিতায় ডিজিটাল অর্থনীতি পরিমাপের একটি আধুনিক ফ্রেমওয়ার্ক তৈরির চেষ্টা চলছে, যা প্রচলিত আইসিটি খাতের বাইরে গিয়ে সামগ্রিক ‘ডিজিটাল জিডিপি’র প্রকৃত চিত্র তুলে ধরবে।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, দেশে ইন্টারনেট ও মোবাইল ব্রডব্যান্ডের ব্যবহার ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দেশে মোট ইন্টারনেট পেনিট্রেশন ৭৪ দশমিক ৫২ শতাংশে পৌঁছেছে। মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন প্রায় ১০ কোটি ৩৮ লাখ মানুষ এবং ফিক্সড ব্রডব্যান্ড ব্যবহারকারীর হারও ক্রমেই বাড়ছে। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে দেখায় যে, ডিজিটাল অর্থনীতি সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় সংযোগ ও ডিজিটাল অবকাঠামো দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। তবে বিটিআরসির তথ্য মূলত ইন্টারনেট গ্রাহক, মোবাইল ব্রডব্যান্ড, টেলিডেনসিটি ও সংযোগের বিস্তার পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। এই তথ্য থেকে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির মোট আকার, ডিজিটাল বাণিজ্যের পরিমাণ, প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতির মূল্য কিংবা ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে সৃষ্ট অর্থনৈতিক মূল্য সংযোজন নির্ধারণ করা যায় না। অর্থাৎ ডিজিটাল অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তির তথ্য থাকলেও এর সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিমাপ এখনো অনুপস্থিত। জানতে চাইলে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ডিজিটাল অর্থনীতি শুধু ইন্টারনেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ই-কমার্স, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং ফ্রিল্যান্সিং খাতের সঙ্গে জড়িত। তাই বিটিআরসি, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এর ডেটা লিংক করে একটি সমন্বিত কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করছে। এ ছাড়া ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, সোশ্যাল মিডিয়া বুস্টিং এবং বিদেশি অ্যাপসগুলোর মাধ্যমে কী পরিমাণ অর্থনৈতিক লেনদেন হচ্ছে, তার একটি সুনির্দিষ্ট ডেটা ব্যাংক তৈরি করতে বিটিআরসি কাজ করছে। যা রাজস্ব ফাঁকি রোধেও সহায়তা করবে বলে তিনি মনে করেন।
দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের রপ্তানি আয়ের তথ্য আছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) কাছে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, বাংলাদেশের ডিজিটাল সেবা রপ্তানি খাত ১.৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা বার্ষিক প্রায় ৪০% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের রপ্তানি বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশে বিস্তৃত, যার মধ্যে একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বড় বাজার হলো যুক্তরাষ্ট্র (মোট রপ্তানির ৩৪%)।
জানতে চাইলে বেসিসের সাবেক সভাপতি ফাহিম মাসরুর বলেন, বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির বাজার এখন বহুমাত্রিক এবং দ্রুত বর্ধনশীল। যেখানে আইসিটি খাতের অভ্যন্তরীণ বাজার ও রপ্তানি আয় মিলিয়ে এর সামগ্রিক আকার বর্তমানে কয়েক বিলিয়ন ডলারের। তিনি বলেন, বেসিসের অধীনে বর্তমানে ২,০০০-এর বেশি নিবন্ধিত সফটওয়্যার ও আইটি এনাবলড সার্ভিসেস কোম্পানি রয়েছে এবং দেশজুড়ে প্রায় ৪,৫০০ কোম্পানি কাজ করছে। বৈশ্বিক অনলাইন শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অংশ প্রায় ১৬%। ৬ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি পেশাদার ফ্রিল্যান্সারের হাত ধরে গত অর্থবছরগুলোতে ফ্রিল্যান্সিং রেমিট্যান্স ১.২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। দেশের অভ্যন্তরীণ ই-কমার্স ও এফ-কমার্স (ফেসবুক কমার্স) খাতের বাজার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারে।
জানতে চাইলে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, প্রান্তিক পর্যায়েও এখন ‘গিগ ইকোনমি’ বা ফ্রিল্যান্সিং ছড়িয়ে পড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ঠাকুরগাঁওয়ের প্রায় দেড় হাজার ফ্রিল্যান্সার বিশ্ববাজারে ডিজিটাল পণ্য বিক্রি করছেন। কিন্তু এই সম্ভাবনাময় খাতের বড় বাধা হলো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভাব। তিনি অভিযোগ করেন, ফ্রিল্যান্সারদের উপার্জিত অর্থ সহজ উপায়ে দেশে আনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো সুস্পষ্ট নীতিমালা নেই। এমনকি ক্রেডিট কার্ডের মতো মৌলিক আর্থিক সুবিধাও তারা পাচ্ছেন না, যা তাদের আয়কে মূলধারার অর্থনীতিতে যুক্ত হতে বাধা দিচ্ছে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভাতা ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধের ফলে দুর্নীতি কমেছে। এ জন্য একটি ‘একীভূত জাতীয় তথ্যভা-ার’ তৈরি করতে হবে। তিনি বলেন, এই তথ্যভা-ার পরিচালনার জন্য একটি স্বায়ত্তশাসিত নজরদারি ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গঠন করা জরুরি। এটি কোনোভাবেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা নির্বাচন কমিশনের অধীনে থাকা উচিত নয়। এই তথ্যভা-ারে এনআইডি, টিআইএন, বিআইএন এবং সব সরকারি ভাতার তথ্য সংরক্ষিত থাকবে।

