ঢাকা রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৬

বিশ্বকাপ ফুটবল-২০২৬

আর্জেন্টিনা ও স্পেনের  মহাকাব্যিক লড়াই 

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ১৯, ২০২৬, ০২:৫৬ এএম

১০৪টি ম্যাচের লড়াইয়ে ৪৬টি দলের বিদায়ের পর আজ রোববার বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় আমেরিকার নিউজার্সি রাজ্যের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ২০২৬ ফুটবল বিশ^কাপের জমকালো ফাইনালে ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেনের মুখোমুখি হচ্ছে বর্তমান বিশ^চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। একদিকে বর্তমান বিশ^চ্যাম্পিয়নদের মুকুট ধরে রাখার লড়াই, অন্যদিকে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নদের দ্বিতীয়বার বিশ^কাপ জয়ের স্বপ্ন। ফাইনালের এই দ্বৈরথ বিশ^ ফুটবলে ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণেরও নিয়ামক হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি এই দ্বৈরথ গুরু স্পেন কোচের বিরুদ্ধে শিষ্য আর্জেন্টিনা কোচেরও। তবে এমন দ্বৈরথেও দুই দলের একটি জায়গাতে মিল রয়েছে, আর তা হলো উভয় দলের খেলোয়াড়রাই স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলে। বিশ^কাপে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের ৩৯ দিনব্যাপী দীর্ঘ লড়াইয়ে স্বাভাবিকভাবেই মূল প্রশ্ন এখন একটিইÑ আগামীর বিশ^ চ্যাম্পিয়ন কে, স্পেন নাকি আর্জেন্টিনা? আগামী চার বছর বিশ^ ফুটবলের নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে, ইউরোপ নাকি লাতিন? সেমিফাইনালের মহারণে ইংল্যান্ডকে হারানোর পর থেকেই চ্যাম্পিয়ন কে হতে পারে তা নিয়ে বিশ^জুড়ে চলছে নানা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ। কম্পিউটারের ডাটা অ্যানালিসিস থেকে বিভিন্ন বেটিং অ্যাপে চলছে ফাইনালিস্ট খোঁজার প্রতিযোগিতা। ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ যা-ই হোক, শেষ পর্যন্ত মাঠে যে দল যোগ্যতরভাবে ভালো খেলবে, তারাই হবে আগামীর চ্যাম্পিয়ন। এখানে ফেভারিট বা আন্ডারডগ বলে কিছু হয় না, তেমনটা মনে করেন উভয় দলের কোচও। পুরো বিশে^র নজর এখন স্পেন-আজেন্টিনার এই মহাকাব্যিক ফাইনাল ম্যাচের দিকে। কেননা দীর্ঘ অপেক্ষা শেষে আজ মধ্যরাতেই জানা যাবে আগামীর বিশ^চ্যাম্পিয়ন কে?    

এবারের ফাইনালে প্রথমবারের মতো সুপার বোলের আদলে জমকালো হাফটাইম শো অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে শাকিরা, বিটিএস এবং জাস্টিন বিবারের মতো শিল্পীরা পারফর্ম করবেন। এই হাফটাইম বা বিরতির সময় হবে মাত্র ১৭ মিনিট। 

মাঠের লড়াইয়ে এগিয়ে কে : এবারের বিশ^কাপে স্পেন-আর্জেন্টিনার আগের খেলাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রক্ষণে দুর্বলতা থাকলেও আক্রমণে তা পুষিয়ে দিচ্ছে আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে স্পেন রক্ষণ ও আক্রমণ উভয় দিকেই ব্যালান্সড একটি দল। স্পেনের আক্রমণের ধার দুই উইং, অন্যদিকে উইংয়ের দুর্বলতায় আর্জেন্টিনাকে মাঝমাঠ দিয়েই অধিকাংশ আক্রমণ পরিচালনা করতে হয়। 

এই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ১৯টি গোল করেছে আর্জেন্টিনা। হজম করেছে সাতটি গোল। তবে সাতটি গোল হজম করলেও প্রতিপক্ষকে খুব বেশি ভালো সুযোগ তৈরি করতে দেয়নি তারা। অন্যদিকে স্পেন গোল করেছে ১৩টি। তবে গোল হজম করেছে মাত্র ১টি। সেটিও কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে। পুরো বিশ্বকাপে তাদের বিপক্ষে সবচেয়ে কম মানের গোলের সুযোগ তৈরি করতে পেরেছে প্রতিপক্ষ। 

স্পেনের খেলোয়াড়রা শুধু বল নিয়ন্ত্রণেই নয়, প্রতি ম্যাচে তারা আর্জেন্টিনার তুলনায় বেশি দৌড়েছেন এবং বেশি গতিতে ছুটেছেন। প্রতিপক্ষের অর্ধে গিয়ে বল কেড়ে নেওয়ার দিক থেকেও তারা অন্যতম সেরা দল। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা তাদের সব প্রতিপক্ষের চেয়ে কম দৌড়েও প্রতিটি ম্যাচ জিতেছে। অতিরিক্ত সময় খেলায় তাদের মাঠে থাকার সময় বেশি হলেও খেলোয়াড়দের বিশ্রামের বিষয়টি ভালোভাবে সামলানো হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, সফলতার সঙ্গে রক্ষণ সামলিয়ে যে দল আক্রমণ চালাতে পারবে তারাই ম্যাচে জয়ী হতে পারবে। 

দলীয় লড়াইয়ের পাশাপাশি খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত দ্বৈরথও দলকে সাফল্যের পথ দেখাতে পারে। যেমনÑ দুর্বার মেসিকে জায়গা ছেড়ে দিলে যে সর্বনাশ, তা ভালো করে জানা স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের। প্রতিপক্ষের অধিনায়ককে কড়া পাহারায় রাখার গুরুত্বদায়িত্ব তিনি তুলে দিতে পারেন এমেরিক লাপোর্তের কাঁধে। অন্যদিকে যুদ্ধটা ১৯ বছর বয়সি স্পেনের লামিনে ইয়ামালের সঙ্গে আর্জেন্টিনার রক্ষণ দেয়ালের সবচেয়ে শক্ত পাথর নিকোলাস তালিয়াফিকোর। মূলত ওয়ান-অন-ওয়ান পরিস্থিতিতে তালিয়াফিকো ভীষণ শক্তিশালী, পরীক্ষিত ও সচেতন। মেসি ও ইয়ামালকে ভয়ংকর হয়ে উঠতে হলে ঠিকঠাক পেতে হবে বলের জোগান। সেটা আসবে মাঝমাঠ থেকে। মাঝমাঠ দখলের তুমুল লড়াই হতে পারে স্পেনের রদ্রি ও আর্জেন্টিার এনজো ফার্নান্দেজের মধ্যে। রদ্রির যোগ্যতা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই, অন্যদিকে ফাইনালেও মাঝমাঠ দখল রাখার পাশাপাশি, গোলের দাবি মেটাতে হতে পারে ফার্নান্দেজকে। নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে আসরের শুরুর দিকে সন্তুষ্ট না থাকলেও, ইংল্যান্ডের ম্যাচের পর আত্মবিশ্বাসে টগবগ করছেন এনজো। ফাইনালের চূড়ান্ত গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে এই তিনটি দ্বৈরথ। 

কাতারের লুসাইল স্টেডিয়াম থেকে নিউ ইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়াম-লিওনেল মেসির নেতৃত্বে নামা আর্জেন্টিনার দুই দলের পার্থক্য শুধু সাড়ে তিন বছরের। এই সময়ে স্কালোনির এই স্কোয়াড বড় হয়েছে, বয়স ও অভিজ্ঞতা দুটোতেই। চার বছরে দুই দলের স্কোয়াডে পরিবর্তন এসেছে মোট ৯টি জায়গায়। কিন্তু বেশির ভাগ পরিবর্তনই এসেছে বেঞ্চে, একাদশের আশপাশে বলার মতো পরিবর্তন এসেছে মাত্র দুটি। ফুটবলকে বিদায় জানানো দি মারিয়া আর অফ ফর্মের কারণে বাদ পড়া পাওলো দিবালা। এই দুজনকে বাদ দিলে দুই বিশ্বকাপের একাদশে পার্থক্য খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর। তাই গতবারের মতো এবারও এই দলের ওপরই নির্ভয়ে ভরসা রাখছেন স্কালোনি। 

জয় কার, কী বলছে পূর্বাভাস : ফুটবল বিশ্বকাপের ফল নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্লেষক পূর্বাভাস দিয়ে থাকে। সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকে ভিডিও গেম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইএ স্পোর্টস। কারণ, সর্বশেষ চারটি বিশ্বকাপে তাদের কম্পিউটারভিত্তিক সিমুলেশন শেষ পর্যন্ত বাস্তবের ফলের সঙ্গে মিলে গেছে। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালের আগে নতুন ভবিষ্যদ্বাণী প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের হিসাব বলছে, এবার শিরোপা জিততে চলেছে স্পেন।

ইএ স্পোর্টসের পূর্বাভাসকে গুরুত্ব দেওয়ার অন্যতম কারণ, তাদের সাম্প্রতিক সাফল্য। ২০১০ বিশ্বকাপে স্পেন, ২০১৪-তে জার্মানি, ২০১৮-তে ফ্রান্স এবং ২০২২-এ আর্জেন্টিনাকে আগেভাগেই চ্যাম্পিয়ন হিসেবে বেছে নিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। চারটি আসরেই শেষ পর্যন্ত ওই দলগুলো শিরোপা জিতেছে। তবে ২০০৬ বিশ্বকাপের আগে চেক প্রজাতন্ত্রকে তারা সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন হিসেবে দেখিয়েছিল। কিন্তু দলটি সেবার গ্রুপ পর্বই পেরোতে পারেনি। এরপর অবশ্য টানা চারটি বিশ্বকাপে তাদের পূর্বাভাস বাস্তবে রূপ নেওয়ায় নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে এবারের ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে।

লড়াই শেষ পর্যন্ত গুরু-শিষ্যের : মহাকাব্যিক ফাইনালে আর্জেন্টিনা না স্পেন কে জিতবে, এটা জানার পাশাপাশি গুরু না শিষ্যÑ কে বিজয়ী তারও উত্তর জানা আজকের লড়াইয়ের ময়দান থেকে। বর্তমান বিশ^চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনির কোচিংয়ের শিক্ষক স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। তবে সংবাদ সম্মলনে উভয় কোচই অন্য দলের প্রতি সমীহ দেখিয়ে জয়ের আশাই ব্যক্ত করেছেন। তবে স্পেন কোচ ফাইনালের রেফারিকে  বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে বলেছেন। যাতে কঠোরভাবে সব নিয়ম প্রয়োগ করা সম্ভব হয়।  

স্প্যানিশ দৈনিক স্পোর্তকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দে লা ফুয়েন্তে বলেন, ‘রেফারি কোনোভাবেই শিথিলতা দেখাতে পারেন না কিংবা নিয়ম ভাঙার সুযোগ দিতে পারেন না। ফুটবলের বৈধতার যে সীমারেখা আছে, তা কোনোভাবেই অতিক্রম করা উচিত নয়।’

অন্যদিকে ফাইনালের আগে দলের প্রস্তুতির সময় সূচি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আর্জেন্টাইন কোচ লিওনেল স্কালোনি। স্কালোনি বলেন, ‘এমন সময়ে অনুশীলন করতে হয়েছে, যা আমরা চাইনি। সংবাদ সম্মেলন ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতার কারণে তাড়াহুড়ো করে একটি সেশন শেষ করতে হয়েছে। যেখানে কৌশলগত প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ ছিল না।’

স্কালোনি বলেন, ‘এখন আমাদের মূল লক্ষ্য খেলোয়াড়দের বিশ্রাম নিশ্চিত করা। এরপর দেখব তারা কী অবস্থায় আছে। কারণ কয়েকজন ফুটবলার এখনো শতভাগ ফিট নয়। তাদের অবস্থা মূল্যায়ন করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

প্রতিপক্ষ স্পেনের শক্তিমত্তাকে সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন স্কালোনি। তিনি বলেন, ‘আমরা নিজেদের খেলাটা মাথায় রেখেই মাঠে নামব। তবে প্রতিপক্ষের ভালো দিকগুলোও অবশ্যই বিবেচনায় রাখছি।’

ফাইনালে ইয়ামালকে কীভাবে থামানো যেতে পারে? স্কালোনি রসিকতা করে বললেন, ‘ইয়ামালকে কীভাবে থামানো যাবে? আমরা যদি তাকে তার রুমে আটকে রাখতে পারতাম।’ ইয়ামালের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘সে দুর্দান্ত খেলোয়াড়। ফুটবলের জন্য সে অমূল্য সম্পদ।’

বিশ্বকাপের মহারণে লিওনেল মেসি যেমন আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় ভরসা, তেমনি প্রতিপক্ষের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। কিন্তু স্পেনের প্রধান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে জানালেন, মেসিকে আটকাতে কোনো ফুটবলারকে আলাদা করে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে না। বরং পুরো দল মিলে মেসির ওপর কড়া নজর রাখার পরিকল্পনা করেছে তারা।