ফিফা বিশ্বকাপের পরিধি ৩২ থেকে একলাফে ৪৮ দলে উন্নীত হওয়াকে ফুটবলীয় অর্থনীতির চেনা সমীকরণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মাঠের লড়াই যখন শুরু হয়, তখন সেই গাণিতিক সংখ্যার আড়ালে থাকা আবেগ মহাকাব্যিক রূপ ধারণ করে। ২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপ ফুটবল মানচিত্রে এনেছে অভূতপূর্ব ভারসাম্য। একদিকে প্রশান্ত কিংবা আটলান্টিকের বুকের ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র এবং মধ্য এশিয়ার উদীয়মান শক্তিরা উড়াচ্ছে নতুনের কেতন; অন্যদিকে ইউরোপের ঐতিহ্যবাহী পরাশক্তিরা, যারা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বমঞ্চের আলো থেকে নির্বাসিত ছিল, তারা ফিরছে রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের গল্প নিয়ে। ২০২৬ বিশ্বকাপ হলো নতুনের স্পর্ধিত আত্মপ্রকাশ এবং পুরোনোদের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারের অনন্য নাট্যমঞ্চ।
ক্ষুদ্র দ্বীপের রূপকথা
বিশ্বকাপের বর্ধিত কলেবর ফুটবল বিশ্বের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে এমন কিছু লড়াকু জাতির সঙ্গে, যাদের উত্থানের গল্প যেকোনো রূপকথাকেও হার মানায়। এই তালিকায় বড় বিস্ময়ের নাম আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে ১০টি আগ্নেয় দ্বীপ নিয়ে গঠিত রাষ্ট্র কেপ ভার্দে। মাত্র ছয় লাখ জনসংখ্যার এই ক্ষুদ্র আফ্রিকান দেশটি ফুটবল বিশ্বে নিজেদের চেনা পরিচয়ের বাইরে গিয়ে নতুন সাম্রাজ্য গড়েছে। কঠোর অনুশাসন, গতিশীল ফুটবল ও প্রবাসে থাকা প্রতিভাদের এক সুতোয় বেঁধে তারা এবার বিশ্বমঞ্চের টিকিট কেটেছে। তাদের এই যাত্রা প্রমাণ করে, ফুটবলে বুকভরা স্বপ্ন আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা কোনো বাধা নয়। অনুরূপ এক জাদুকরী গল্প লিখেছে ক্যারিবীয় সাগরের বুকে অবস্থিত ডাচ উপনিবেশভুক্ত দ্বীপ কিউরাসাও। দেড় লাখেরও কম জনসংখ্যার এই দ্বীপরাষ্ট্রটি ফুটবলের মানচিত্রে এতদিন ছিল অদৃশ্য এক বিন্দু। কিন্তু ডাচ ফুটবল কাঠামোর আধুনিক ছোঁয়া, ট্যাকনিক্যাল শ্রেষ্ঠত্ব এবং ইউরোপীয় লিগে খেলা প্রবাসী ফুটবলারদের জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্ত করার নীতিকে কাজে লাগিয়ে তারা উত্তর আমেরিকার বাছাইপর্বে বড় বড় পরাশক্তিকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। কিউরাসাওয়ের বিশ্বমঞ্চে পা রাখা কেবল তাদের দেশের জন্য নয়, বরং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সমস্ত ছোট ছোট দ্বীপরাষ্ট্রের ফুটবলারদের জন্য এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক বিজয়।
মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার নতুন সূর্য
এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন থেকে দলসংখ্যা বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় সুফল পেয়েছে মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার দুই উদীয়মান শক্তি, উজবেকিস্তান এবং জর্ডান। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়া দেশগুলোর মধ্যে ফুটবলীয় ঐতিহ্যে উজবেকিস্তান সব সময়ই সমৃদ্ধ ছিল। কিন্তু বারবার বাছাইপর্বের শেষ মুহূর্তে গিয়ে প্লে-অফের গ্যাঁড়াকলে তাদের স্বপ্নভঙ্গ হতো। এবার আর কোনো ভুল করেনি তাসখন্দের হোয়াইট উলভসরা। শারীরিক ফুটবল, দুর্দান্ত ট্যাকটিক্যাল শৃঙ্খলা এবং নিখুঁত পাসিং গেমের ওপর ভর করে তারা প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করেছে। মধ্য এশিয়ার ফুটবলের প্রতিনিধি হিসেবে উজবেকিস্তানের এই আগমন ফুটবল ভূরাজনীতিতে এক নতুন শক্তির উত্থানের বার্তা দিচ্ছে।
অন্যদিকে, মরুভূমির বুকচিরে ফুটবলের নতুন সূর্যোদয় ঘটিয়েছে জর্ডান। সাম্প্রতিক এশিয়ান কাপে রানার্সআপ হয়ে তারা যে চমক দেখিয়েছিল, তাকে ভাগ্য বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই, সেটিই তারা প্রমাণ করল বিশ্বকাপের কঠিনতম বাছাইপর্ব পেরিয়ে। রক্ষণাত্মক দৃঢ়তা আর কাউন্টার অ্যাটাকের ধারাল কৌশলে জর্ডান এবার বিশ্বমঞ্চে আরব্য রজনীর নতুন গল্প লিখতে প্রস্তুত।
চেক প্রজাতন্ত্রের ফেরা
নতুনেরা যখন উৎসবের আমেজে ভাসছে, তখন ইউরোপের এক সময়ের ত্রাস চেক প্রজাতন্ত্র ফিরছে তাদের হারানো সিংহাসন ফিরে পেতে। ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপের পর থেকে পাভেল নেদভেদ, মিলান বারোশ কিংবা পেত্র চেকের উত্তরসূরিরা বৈশ্বিক মঞ্চে কেবলই দর্শক হয়ে ছিলেন। দীর্ঘ ২০ বছরের এই খরা কাটানো মোটেও সহজ ছিল না।
চেক ফুটবলের পুনর্জন্ম হয়েছে তাদের ঘরোয়া লিগের আধুনিকায়ন এবং তরুণ প্রতিভাদের সঠিক বিকাশের মাধ্যমে। দীর্ঘদেহী ডিফেন্ডারদের আকাশছোঁয়া প্রাচীর আর কাউন্টার অ্যাটাকের চিরাচরিত পাওয়ার ফুটবল দিয়ে তারা ইউরোপীয় বাছাইপর্বের বৈতরণী পার হয়েছে। ২০ বছর পর তাদের এই ফিরে আসা প্রমাণ করে যে, রক্তে যাদের ফুটবলের ঐতিহ্য রয়েছে, তারা সাময়িকভাবে হারিয়ে যেতে পারে, কিন্তু চিরতরে মুছে যায় না।
নরওয়ে, স্কটল্যান্ড ও অস্ট্রিয়ার পুনরুত্থান
এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে রোমান্টিক অধ্যায়টি বোধহয় ১৯৯৮ সালের বৃত্তপূরণ। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত সেই ঐতিহাসিক বিশ্বকাপের পর দীর্ঘ ২৮ বছর কেটে গেছে, কিন্তু নরওয়ে, স্কটল্যান্ড এবং অস্ট্রিয়ার মতো ঐতিহ্যবাহী দলগুলো বিশ্বকাপের মূলমঞ্চে উঠতে পারেনি। এই দীর্ঘ আড়াই দশকের নির্বাসন যেন তাদের ফুটবলের আত্মাকেই কাঁপিয়ে দিয়েছিল। স্কটল্যান্ড তাদের ব্রিটিশ ঘরানার ফুটবল আর গ্যালারিতে টার্টান আর্মির অবিস্মরণীয় উন্মাদনা নিয়ে ফিরছে, যা বিশ্বকাপের রঙকে আরও রঙিন করবে। অন্যদিকে, আধুনিক হাই-প্রেসিং ফুটবলের মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে অস্ট্রিয়া ইউরোপের সবচেয়ে বিপজ্জনক দলগুলোর একটি হিসেবে নিজেদের পুনরুত্থান ঘটিয়েছে।
অবশেষে বিশ্বমঞ্চে গোলমেশিন
তবে এই সমস্ত প্রত্যাবর্তনকারীদের গল্পের মাঝে যে নামটি ফুটবলপ্রেমীদের বুক দুলিয়ে দিচ্ছে, তিনি নরওয়ের আর্লিং ব্রট হালান্ড। ক্লাব ফুটবলে ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে রেকর্ডের পর রেকর্ড ভাঙা এই গোলমেশিনকে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে দেখতে না পারার একটা বড় আক্ষেপ ছিল কোটি ভক্তের। মার্টিন ওডেগার্ডের নিখুঁত পাসিং আর হালান্ডের অতিমানবীয় ফিনিশিংয়ের ওপর ভর করে ১৯৯৮ সালের পর নরওয়ে অবশেষে বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে।
হালান্ডকে বিশ্বকাপে দেখার রোমাঞ্চ কেবল নরওয়ের মানুষের নয়, বরং গোটা ফুটবল বিশ্বের। কিলিয়ান এমবাপ্পে, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র কিংবা জুড বেলিংহামদের মতো সমসাময়িক তারকাদের পাশে এবার যখন এই নরওয়েজিয়ান ভাইকিং মাঠে নামবেন, তখন বিশ্বকাপের পারদ যে আকাশ ছোঁবে, তা বলাইবাহুল্য।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন