বিশ্বজুড়ে চলছে ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনা। আর বাঙালির কাছে ফুটবল এক বিশেষ আবেগের নাম। বিশ্বজুড়ে ফুটবল নিয়ে যে উন্মাদনা তা ফুটে উঠেছে একাধিক দেশি-বিদেশি সিনেমায়।
বাংলাদেশে ফুটবল নিয়ে নির্মিত প্রথম সিনেমা খিজির হায়াত খান পরিচালিত ‘জাগো’। এতে অভিনয় করেন ফেরদৌস আহমেদ, আরিফিন শুভ, শার্লিন ফারজানা, রওনক হাসানসহ একঝাঁক তারকা অভিনেতা। স্বাধীন বাংলা ফুটবল টিম ও তাদের কোচকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এর গল্প। একই প্রেক্ষাপটে রায়হান রাফি নির্মাণ করেন ‘দামাল’। যেখানে অভিনয় করেন বিদ্যা সিনহা মিম, শরিফুল রাজ, সিয়াম আহমেদ প্রমুখ।
কলকাতায় ২০২১ সালে মুক্তি পায় ধ্রুব ব্যানার্জি পরিচালিত ‘গোলন্দাজ’। ভারতীয় ফুটবলের আদিপুরুষ নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারীর জীবন অবলম্বনে এবং ব্রিটিশদের সঙ্গে ফুটবল রাজনীতি নিয়ে নির্মাণ হয়েছে সিনেমাটি। এ সিনেমার মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেন কলকাতার জনপ্রিয় অভিনেতা দেব। মতি নন্দীর উপন্যাস ‘স্ট্রাইকার’ অবলম্বনে একই নামের চলচ্চিত্র ১৯৭৮ সালে মুক্তি পায়। এ ছাড়া অরুণ রায় পরিচালিত ‘এগারো’ সিনেমাটিও ফুটবল নিয়েই।
বলিউডে ফুটবল নিয়ে সিনেমা নেই বললেই চলে। ‘ধান ধানা ধান গোল’ একমাত্র বলিউডি সিনেমা যেখানে ফুটবলকে কেন্দ্র করেই গল্প এগিয়েছে। এ ছাড়া ভারতীয় বংশোদ্ভূত পরিচালক গুরিন্দর চাঁদা নির্মাণ করেন ‘বেন্ড ইট লাইক বেকহ্যাম’। এতে বলিউড অভিনেতা অনুপম খেরসহ, হলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতারাও রয়েছেন।
জন হস্টনের পরিচালনায় ১৯৮১ সালে মুক্তি পায় ‘এস্কেপ টু ভিক্টোরি’। ফুটবল নিয়ে সর্বকালের সেরা সিনেমার তালিকায় রাখা হয় এটিকে। এ সিনেমায় অভিনয় করেছেন সিলভেস্টার স্ট্যালোন। আরও আছেন কিংবদন্তি ফুটবলার পেলে ও ববি মুর। ২০০৫ সালে মুক্তি পায় লেক্সি আলেকজান্ডার পরিচালিত ‘গ্রিন স্ট্রিট হুলিগান’। ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে শক্তিশালী হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে অপ্রত্যাশিতভাবে পশ্চিম জার্মানির জয়ের গল্প নিয়ে নির্মাণ হয়েছে ‘দ্য মিরাকেল অব বার্ন’।
১৯৫০-এর বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে আমেরিকার অপ্রত্যাশিতভাবে ১-০ গোলে হারানোর ঘটনা নিয়ে নির্মিত ‘দ্য গেমস অব দেয়ার লাইভস’। ফুটবলে যত ট্র্যাজেডি আছে তার মধ্যে অন্যতম কলম্বিয়ান ফুটবলার এস্কোবারের মৃত্যু। ২০১০ সালে মুক্তি পায় ‘দ্য টু এস্কোবারস’। সর্বকালের সেরা ফুটবলার পেলেকে নিয়ে ২০১৬ সালে তৈরি হয় ‘পেলে-বার্থ অব আ লিজেন্ড’। এ ছাড়া কাতার বিশ্বকাপের দুর্নীতি নিয়ে নির্মিত একটি তথ্যচিত্র নেটফ্লিক্সে মুক্তি পেয়েছে।
২০০৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘গোল! দ্য ড্রিম বিগিনস’ সিনেমাটিতে দেখানো হয়েছে একজন দরিদ্র কিশোরের স্বপ্ন। ২০০৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র সান্তিয়াগো মুনিয়েজ, যে দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসে ইংল্যান্ডের শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলে জায়গা করে নেওয়ার স্বপ্ন দেখে। বিশ্বকাপের সময় বিশ্বের নানা প্রান্তের লাখো তরুণ যে স্বপ্ন দেখে, এই সিনেমা যেন সেই স্বপ্নেরই প্রতিচ্ছবি। নিউক্যাসল ইউনাইটেডের বাস্তব খেলোয়াড়দের উপস্থিতি সিনেমাটিকে আরও বাস্তবধর্মী করে তুলেছে।
‘শাওলিন সকার’ সিনেমার শুরু হয় এক ব্যর্থ কিন্তু স্বপ্নবাজ মানুষ সিংকে দিয়ে। শৈশবে তিনি ছিলেন শাওলিন কুংফুর একজন প্রতিভাবান শিষ্য। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি হারিয়ে ফেলেন নিজের পরিচয়। একদিন তার দেখা হয় ফং নামের এক সাবেক ফুটবল খেলোয়াড়ের সঙ্গে। ফং প্রতিভাবান ছিলেন। দুর্নীতি ও বিশ্বাসঘাতকতার কারণে তার ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায়। সিংয়ের মাথায় তখন এক অদ্ভুত ধারণা আসে। যদি শাওলিন কুংফুর শক্তিকে ফুটবলের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে সাধারণ মানুষকে আবার সেই হারানো শক্তি ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব। এই চিন্তা থেকেই শুরু হয় এক অসম্ভব দল গঠনের গল্প। সিং একে একে তার পুরোনো শাওলিন ভাইদের খুঁজে বের করেন। কেউ রুটি বিক্রি করেন, কেউ ময়দানে শ্রমিক, কেউ বা সমাজে একেবারেই অদৃশ্য হয়ে গেছেন। কিন্তু প্রত্যেকের মধ্যেই লুকিয়ে আছে অসাধারণ কুংফু ক্ষমতা। এই সিনেমাটি তাদের জন্য যারা খেলা এবং অ্যাকশন সিনেমা পছন্দ করেন।
২০০২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘বেন্ড ইট লাইক বেকহাম’ সিনেমায় দেখানো হয়েছে ফুটবলকে কেন্দ্র করে একজন তরুণীর স্বপ্ন, পারিবারিক চাপ এবং সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র জেসমিন্ডার ‘জেস’ ভামরা একজন ব্রিটিশ-ভারতীয় মেয়ে, যার স্বপ্ন ফুটবলে পেশাদার হওয়া। জেস লুকিয়ে স্থানীয় একটি মেয়েদের ফুটবল দলে খেলতে শুরু করেন। সেখানে তার দেখা হয় জুলস নামের আরেক প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের সঙ্গে। ধীরে ধীরে তাদের বন্ধুত্ব ও দলগত উন্নতি এগোতে থাকে, আর জেসের প্রতিভা চোখে পড়ে কোচদেরও। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় যখন তার পরিবার জানতে পারে তিনি ফুটবল খেলছেন। ধর্ম, সংস্কৃতি এবং পারিবারিক প্রত্যাশার সঙ্গে নিজের স্বপ্নের সংঘর্ষ শুরু হয়।
‘দিয়েগো ম্যারাডোনা’ ডকুমেন্টারিটি নির্মাণ করেছেন আসিফ কাপাডিয়া, যিনি আর্কাইভ ফুটেজভিত্তিক বায়োপিক তৈরির জন্য পরিচিত। ফুটবল কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনার জীবনের সবচেয়ে নাটকীয় ও বিতর্কিত অধ্যায়কে কেন্দ্র করে এটি নির্মিত হয়েছে। ৫০০ ঘণ্টার বেশি আর্কাইভ ফুটেজ ব্যবহার করে এটি নির্মিত। এই সিনেমায় ম্যারাডোনাকে একজন দেবতুল্য ফুটবলারের পাশাপাশি ভাঙা একজন মানুষ হিসেবেও দেখানো হয়েছে।
‘মেসি’ সিনেমাটি প্রচলিত বায়োপিকের মতো শুধু গল্প বলার জন্য বানানো হয়নি; বরং এটি ডকুমেন্টারি, রি-এনেক্টমেন্ট এবং বিশ্লেষণমূলক সাক্ষাৎকারের মিশ্রণ। ফলে দর্শক একসঙ্গে বাস্তব ফুটেজ, নাট্যরূপ এবং বিশ্লেষণÑ তিনটি স্তরে মেসির জীবন তুলে ধরা হয়েছে।
ফুটবলের নেপথ্যের নাটকীয়তা বুঝতে চাইলে দেখা যেতে পারে ‘দ্য ড্যামড ইউনাইটেড’ সিনেমা। ইংল্যান্ডের বিখ্যাত কোচ ব্রায়ান ক্লাফের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় নিয়ে নির্মিত এ চলচ্চিত্রে ফুটবলের ক্ষমতার লড়াই, নেতৃত্ব এবং ব্যক্তিত্বের সংঘাত ফুটে উঠেছে। খেলোয়াড়দের বাইরেও যে কোচরা ফুটবলের ইতিহাস বদলে দেন, এই সিনেমা তার অনন্য এক উদাহরণ।
সব ফুটবল কাহিনি ট্রফি জয়ের নয়। কিছু গল্প আছে, যেখানে লড়াইটাই সবচেয়ে বড় অর্জন; ‘নেক্সট গোল উইন্স’ এমনই একটি গল্প। আমেরিকান সামোয়ার জাতীয় দল একসময় আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে হারের রেকর্ড গড়েছিল। কিন্তু সেই দলই কীভাবে নিজেদের সম্মান ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছে, সেই মানবিক গল্প তুলে ধরেছে এই ডকুমেন্টারি।
ষাটের দশকের জার্মান ফুটবল ইতিহাসের বাস্তব একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে ‘দ্য কিপার’ সিনেমা। এর মূল চরিত্র বার্ট ট্রাউটম্যান, তিনি ছিলেন সাবেক জার্মান সেনা সদস্য, পরবর্তীতে ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটির কিংবদন্তি গোলরক্ষক। যুদ্ধবন্দি জীবন থেকে শুরু করে শত্রু দেশ ইংল্যান্ডে গিয়ে ফুটবল খেলার সুযোগ পাওয়াÑ এই যাত্রা সহজ ছিল না। স্থানীয় দর্শকদের প্রতিবাদ, সামাজিক বিরোধিতা এবং ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির মধ্যেও ট্রাউটম্যান কীভাবে নিজেকে প্রমাণ করেন, সেটাই সিনেমাটির মূল গল্প।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন