ঢাকা মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬

বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা ম্যানিয়া

মো. আশিকুর রহমান
প্রকাশিত: জুন ১৬, ২০২৬, ০৬:১০ এএম

ঘড়ির কাঁটায় রাত ১টা কিংবা ভোর ৪টা। নাগরিক কোলাহল স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার এই সময়ে বাংলাদেশের অলিগলিতে আলো জ্বলে ওঠে। দূর থেকে ভেসে আসে পরিচিত উন্মাদনার শোরগোল। চায়ের কাপে চুমুক আর বড় পর্দার আলোয় মায়াবী হয়ে ওঠে ঢাকার কোনো এক মহল্লার মোড় কিংবা কোনো বাড়ির ছাদ। হাজার মাইল দূরে; লাতিন আমেরিকার এক দেশের ফুটবল দল যখন মাঠে নামে, তখন দূরের এই পলিমাটির দেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ আস্ত রাত জেগে থাকে। এটাই বাংলাদেশ; এখানে আর্জেন্টিনার ম্যাচ মানে কেবল ৯০ মিনিটের ফুটবল খেলা নয়, এটি একটি যাপিত উৎসব, এক আবেগের নাম। বিশ্বকাপ শুরু হতেই দেশজুড়ে আবার ফিরে এসেছে চেনা সেই দৃশ্যপট। এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচ হবে আলজেরিয়ার বিপক্ষে। আলবিসেলেস্তেদের ম্যাচের আগে বাঙালির আকাশি-সাদা উন্মাদনা যেন নতুন রূপ নিয়েছে। টাইম জোনের কারণে বেশির ভাগ ম্যাচই অনুষ্ঠিত হচ্ছে মাঝরাতে কিংবা সাতসকালে। কিন্তু সময় কি আর বাঙালির ফুটবল প্রেমকে দমাতে পেরেছে? মোটেও না।

ডিজিটাল স্ক্রিনের এই যুগেও বাংলাদেশে বিশ্বকাপ ফুটবলের আসল সৌন্দর্য সামষ্টিকতায়। আলজেরিয়া ম্যাচের আগে মহল্লার তরুণদের তোড়জোড় দেখার মতো। কোথাও বাঁশ খাটিয়ে খালাস করা হবে বিশাল সাদা পর্দা, কোথাও আবার ক্লাবের নিজস্ব প্রজেক্টরটি ঝাড়পোঁছ করে রেডি রাখা হচ্ছে। শুধু বড় বড় শহরেই নয়, মফস্বল কিংবা গ্রামের চায়ের দোকানেও এখন একই আলোচনা।

বিশ্বকাপ ফুটবলের গভীর রাতের ম্যাচগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে নৈশকালীন লাইফস্টাইল। কোথাও ম্যাচের কয়েকদিন আগে থেকেই শুরু হয় চাঁদা তোলা, ম্যাচের রাতে ডেকচিতে চড়ে ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ি কিংবা চায়ের আয়োজন। খেলা শুরুর আগের টানটান উত্তেজনা সামাল দিতে কাপের পর কাপ চায়ের ওড়াউড়ি আর প্রতিটি পাস, প্রতিটি ট্যাকেলে চারপাশের মানুষের সমস্বরে চিৎকার; এই যে আবহ, তা পৃথিবীর আর কোনো দেশে বোধহয় খুঁজে পাওয়া যায় না। বাঙালির আর্জেন্টিনা ম্যানিয়ার বড় একটা বিজ্ঞাপন প্রকাশ পায় বাড়ির ছাদে আর দেয়ালে। ম্যাচকে সামনে রেখে পাড়ার দেয়ালে দেয়ালে চুন ও নীল রং দিয়ে নিখুঁতভাবে আঁকা হচ্ছে আর্জেন্টিনার লোগো কিংবা প্রিয় তারকাদের অবয়ব। দর্জিপাড়ায় এখন দম ফেলার ফুসরত নেই। মাইলের পর মাইল লম্বা পতাকা বানানোর যে প্রতিযোগিতা, তা ডিজিটাল সময়েও সমান জনপ্রিয়। ভৌগোলিক সীমানা, ভাষা, কিংবা সংস্কৃতির কোনো মিল নেই। তবুও প্রতি চার বছর পর পর এবং এর মধ্যবর্তী সময়েও বাংলাদেশ এক টুকরো আর্জেন্টিনা হয়ে ওঠে। বুয়েনস আইরেসের মানুষ হয়তো জানেও না যে, তাদের জয়ে এই দূর প্রাচ্যের মানুষের রাতের ঘুম উড়ে হয়ে যায়, আবার তাদের পরাজয়ে কোনো কোনো বাঙালির মন ভেঙে যায়। খেলা শেষ হবে, কেউ হাসিমুখে ঘুমাতে যাবে, কেউ বা বুকভরা আফসোস নিয়ে বিছানায় ফিরবে। কিন্তু এই যে একসঙ্গে একটা রাত জাগা, একসঙ্গে একই রঙের জার্সিতে উল্লাস করা; এই সামাজিক মেলবন্ধনটুকুই ফুটবল আমাদের উপহার দেয়।