ঢাকা মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬

লাতিন বনাম আফ্রিকান ফুটবলের লড়াই

গোল প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুন ১৬, ২০২৬, ০৬:১২ এএম

২০২৬ বিশ্বকাপে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে আর্জেন্টিনার প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর এখন কোটি ফুটবলপ্রেমীর তীক্ষè নজর। আলবিসেলেস্তেরা কেবল তাদের ঐতিহ্যের ভারে নয়, বরং মাঠে আধুনিক ফুটবলের নিখুঁত শৈলী প্রদর্শনের মাধ্যমে আরও একটি মহাকাব্যিক অধ্যায় রচনার প্রত্যয়ে এগিয়ে চলেছে। আগামীকাল মাঠে নামার আগে রণকৌশলের খাতায় যে আলোচনাটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, তা হলো আর্জেন্টিনার মাঝমাঠের আধিপত্য এবং সৃষ্টিশীলতা। লিজেন্ডারি লিওনেল মেসির জাদুকরী উপস্থিতির সমান্তরালে বর্তমান আলবিসেলেস্তেদের আসল  চালিকাশক্তি হলো তাদের মিডফিল্ড ট্রায়ো- এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও রদ্রিগো ডি পল। আলজেরিয়ার চেনা ফিজিক্যাল ও হাইপার-প্রেসিং ফুটবলের কাউন্টার-ট্যাকটিক্স হিসেবে লিওনেল স্কালোনির এই ত্রয়ীর মগজ ও পায়ের যুগলবন্দিই হতে যাচ্ছে ম্যাচের ভাগ্যনির্ধারক।

মাঝমাঠের ত্রয়ী

কাতার বিশ্বকাপের মধ্যগগন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার ফুটবলের যে জয়যাত্রার পুনরুত্থান, তার পেছনে আসল কারিগর এই মাঝমাঠের তিন সেনা। এই তিন মিডফিল্ডারের রসায়ন এতটাই নিখুঁত যে, তারা মাঠের পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজেদের মুঠোয় রাখতে পারেন। এদের মধ্যে রদ্রিগো ডি পল হলেন দলের ইঞ্জিন। মাঠে তার কাজ হলো প্রতিপক্ষের আক্রমণ মাঝপথেই ধ্বংস করা এবং বল কেড়ে নিয়ে দ্রুত আক্রমণে রূপান্তর করা। ডিল পলের অতিমানবীয় শারীরিক সক্ষমতা এবং প্রেসিং ক্ষমতা রক্ষণভাগকে যেমন স্বস্তি দেয়, তেমনই আক্রমণভাগকে জোগায় বাড়তি অক্সিজেন।

মাঝমাঠের গভীর থেকে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্বটি তরুণ মাস্টারমাইন্ড এনজো ফার্নান্দেজের। ডিফেন্সিভ থার্ড থেকে নিখুঁত এবং দূরপাল্লার পাসে উইঙ্গারদের সচল রাখা কিংবা বলের পজেশন ধরে রাখায় এনজো বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা। আর এই ত্রয়ীর সবচেয়ে সৃষ্টিশীল ও শৈল্পিক অংশটি হলেনÑ অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। প্রতিপক্ষের ডিফেন্সিভ লাইনের ঠিক সামনে যে ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়, সেখানে ম্যাক অ্যালিস্টারের ওয়ান-টাচ নিখুঁত পাসিং এবং থ্রু-বল দেওয়ার ক্ষমতা প্রতিপক্ষের যেকোনো রক্ষণব্যূহ ভেদ করতে পারে। এই তিনজনের ভিন্ন ভিন্ন গুণের নিখুঁত ভারসাম্যই আর্জেন্টিনার ক্রিয়েটিভিটির মূল উৎস।

ফিজিক্যাল ফুটবল বনাম ওয়ান-টাচ পাসিং

আগামীকালের ম্যাচে আর্জেন্টিনার এই তাত্ত্বিক মাঝমাঠের সামনে বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে আলজেরিয়ার আফ্রিকান ঘরানার ফিজিক্যাল ও হাইপার-প্রেসিং ফুটবল। আলজেরিয়া সাধারণত মাঠে অত্যন্ত কমপ্যাক্ট বা সুসংহত থাকে এবং প্রতিপক্ষের পায়ে বল থাকা মাত্রই তারা জোরালো ফিজিক্যাল ট্যাকেলের মাধ্যমে ম্যাচ জমিয়ে তোলে। মাঝমাঠে স্পেস সংকুচিত করে প্রতিপক্ষের প্লে-মেকারদের বোকা বানানোই তাদের প্রধান শক্তি। তবে আর্জেন্টিনার মাঝমাঠ আলজেরিয়ার ফিজিক্যাল প্রেসিংকে প্রতিহত করার জন্য প্রস্তুত তাদের নিজস্ব ধারার ওয়ান-টাচ ফ্লুইড পাসিং দিয়ে, যা আধুনিক টিকিটাকা শৈলীর অনন্য সংস্করণ। আলজেরিয়ার খেলোয়াড়েরা যখনই ফিজিক্যাল ট্যাকেলের জন্য তেড়ে আসবে, এনজো এবং ম্যাক অ্যালিস্টারদের ওয়ান-টাচ কুইক পাসিং কৌশল তাদের সেই প্রেসিংকে ফাঁকি দিয়ে ফাঁকা জায়গা তৈরি করবে। বল হোল্ড না করে দ্রুত এক পা থেকে অন্য পায়ে স্থানান্তরের জ্যামিতিক নকশাই আলজেরিয়ার রক্ষণাত্মক শক্তিকে ক্লান্ত ও বিভ্রান্ত করে দেবে।

বক্সের ভেতরের শিকারি

মাঝমাঠ যতই নিখুঁত পাসিংয়ের জাল বুনুক না কেন, শেষ পর্যন্ত গোলপোস্টের সামনে সেই সৃষ্টিশীলতাকে পূর্ণতা দিতে হয় স্ট্রাইকারদের। এই জায়গাতেই স্কালোনির হাতে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম সেরা দুই ঘাতকÑ হুলিয়ান আলভারেজ এবং লাউতারো মার্টিনেস। আলজেরিয়ার বিপক্ষে আগামীকাল এই দুজনের বক্সের ভেতরের পজিশনিং এবং অফ-দ্য-বল মুভমেন্টই ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিতে পারে।

হুলিয়ান আলভারেজের সবচেয়ে বড় গুণ হলোÑ তার অক্লান্ত দৌড়ানোর ক্ষমতা। তিনি অনবরত প্রতিপক্ষের সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারদের তাড়া করে বেড়ান এবং তাদের পজিশন ছেড়ে বেরিয়ে আসতে বাধ্য করেন। আলভারেজ যখন নিজের পজিশন ছেড়ে ডানে বা বাঁয়ে সরে যান, তখন আলজেরিয়ার রক্ষণভাগে যে শূন্যতার সৃষ্টি হবে, সেই ফাঁকা জায়গায় বল পায়ে ঢুকে পড়বেন ম্যাক অ্যালিস্টার কিংবা মেসি। অন্যদিকে, লাউতারো মার্টিনেস হলেন একজন বক্স শিকারি। বক্সের ভেতর বলের লাইনে থাকা এবং অতি ক্ষুদ্র সুযোগেও শরীর ঘুরিয়ে ফিনিশ করায় তিনি ওস্তাদ। আলজেরিয়ার ডিফেন্ডারদের সামান্যতম অসচেতনতার সুযোগ নিয়ে লাউতারোর পজিশনিং আগামীকাল ম্যাচের স্কোরবোর্ড বদলে দিতে পারে।

ডাগআউটের সমীকরণ

ফুটবলীয় ব্যাকরণ বলে, যে দল মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে, ম্যাচের লাগাম শেষ পর্যন্ত তাদের হাতেই থাকে। আলজেরিয়ার কোচ অবশ্যই চাইবেন আর্জেন্টিনার এনজো-ম্যাক অ্যালিস্টার জুটিকে বল রিসিভ করার মতো পর্যাপ্ত সময় ও জায়গা না দিতে। এই মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক যুদ্ধে আর্জেন্টিনার শক্তির জায়গা হলোÑ তাদের ট্যাকটিক্যাল নমনীয়তা। প্রয়োজনে ডি পল নিচে নেমে এসে ডিফেন্সকে পাঁচজনের দেওয়ালে রূপান্তর করতে পারেন, আবার আক্রমণে ওঠার সময় উইঙ্গারদের জন্য করিডর ফাঁকা করে দিতে পারেন। ভারি ট্যাকটিক্সের এই খেলায় আর্জেন্টিনার ওয়ান-টাচ ফুটবলের নান্দনিকতা বনাম আলজেরিয়ার ইস্পাতকঠিন ফিজিক্যাল ডিফেন্সের লড়াইটি দেখতে মুখিয়ে আছে ফুটবল বিশ্ব। স্কালোনির মিডফিল্ড ট্রায়ো যদি তাদের চেনা ছন্দে মাঝমাঠে ক্রিয়েটিভিটির রাজত্ব কায়েম করতে পারে, তবে আলজেরিয়ার রক্ষণভাগ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে বাধ্য। শেষ পর্যন্ত ডাগআউটের এই চাল এবং মাঝমাঠের জাদুকররা মাঠে কতটা নিখুঁতভাবে নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেন, তার ওপরই নির্ভর করছে বিশ্বজয়ের মঞ্চে আর্জেন্টিনার পরবর্তী ধাপের ভাগ্য।