ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬

খোলস ছেড়ে স্বরূপে স্পেন

গোল প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুন ২৩, ২০২৬, ০৮:১৭ এএম

বিশ্বকাপের মঞ্চে কিছু ম্যাচ কেবল স্কোর বোর্ডের ফলাফলের জন্য মনে থাকে না। কিছু ম্যাচ অমর হয়ে রয় ফুটবল ইতিহাসের বাঁকবদলের গল্প হিসেবে। আল-বাইত স্টেডিয়ামে সৌদি আরবের বিপক্ষে স্পেনের ৪-০ গোলের জয়টি তেমনই এক ঐতিহাসিক রাত। এটি কেবল এক ম্যাচের আধিপত্য ছিল না; এটি ছিল স্প্যানিশ ফুটবলের পুরোনো খোলস ভেঙে এক আধুনিক, গতিময় ও ভয়ংকর সুন্দর ‘নতুন স্পেনের’ আত্মপ্রকাশের ঘোষণা। আর সেই নতুন ভোরের মশাল হাতে যার উত্থান ঘটল, তার নাম  লামিনে ইয়ামাল।

১০ মিনিটের সেই জাদু আর মেসির ছায়া

ম্যাচ শুরুর বাঁশি বাজার পর থেকেই স্পেনের চেনা পাসিং ফুটবলের চাদর পাতা হচ্ছিল মাঠজুড়ে। কিন্তু স্পেনের এই রূপ চেনা হলেও, যা অচেনা ছিল তা হলো আক্রমণের চিতা বাঘের মতো গতি। ম্যাচের ঠিক ১০ মিনিটে ডান প্রান্ত দিয়ে বিদ্যুৎগতিতে ভেতরে ঢুকলেন লামিনে ইয়ামাল। সৌদি ডিফেন্ডারদের বোকা বানিয়ে চোখের পলকে বল জড়ালেন জালে।

গ্যালারি ফেটে পড়ার আগেই ফুটবল পরিসংখ্যানবিদরা মেতে উঠলেন ইতিহাস ঘাটায়। এই এক গোলেই ইয়ামাল ভেঙে দিলেন ইতিহাসের অজস্র রেকর্ড। বিশ্বকাপ মঞ্চে সবচেয়ে কম বয়সে গুরুত্বপূর্ণ গোল করার যে কীর্তি একদিন লিওনেল মেসির নামের পাশে শোভা পেত, তা আজ নিজের করে নিলেন এই স্প্যানিশ বিস্ময়বালক। এই গোল যেন কেবল স্পেনের লিড ছিল না, এটি ছিল বিশ্ব ফুটবলের সিংহাসনে নতুন এক রাজপুত্রের রাজ্যাভিষেকের ঘোষণা।

ওয়ারিয়াবালের যুগলবন্দি ও সৌদির অসহায়ত্ব : ইয়ামালের গোলের পর সৌদি আরব যখন একটু গুছিয়ে ওঠার চেষ্টা করছিল, তখনই স্পেনের আক্রমণের তোড়ে ভেসে যায় তাদের সব প্রতিরোধ। এবার মঞ্চে আবির্ভূত হলেন মিকেল ওয়ারিয়াবাল। তিকিতাকার ঐতিহ্যবাহী অলস পাসিংয়ের বদলে স্পেন এবার খেলল ‘ডিরেক্ট ফুটবল’।

ওয়ারিয়াবাল প্রথমার্ধেই করলেন জোড়া গোল। তার প্রথম গোলটি ছিল নিখুঁত পজিশনিংয়ের ফসল, আর দ্বিতীয়টি ঠান্ডা মাথায় ডিফেন্স চূর্ণ করা এক মাস্টারক্লাস ফিনিশিং। ৩-০ তে পিছিয়ে পড়া সৌদি আরব দ্বিতীয়ার্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর মরিয়া চেষ্টা করেও লাভ করতে পারেনি। স্পেনের হাই-প্রেসিংয়ের মুখে নিজেদের বক্সের ভেতর ডিফেনসিভ ভুল করে বসে তারা। একটি দুর্ভাগ্যজনক আত্মঘাতী গোলে সৌদি আরবের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে যায় (৪-০)।

তিকিতাকা থেকে ‘রকেট ফুটবল’ : দীর্ঘদিন ধরে স্পেনের ফুটবল মানেই ছিল হাজার পাসের একঘেয়েমি, যেখানে বলের দখল থাকত কিন্তু ধার থাকত না। কিন্তু এই ম্যাচে কোচ ডিয়েগো লোপেজের (কাল্পনিক নাম বা বর্তমান কোচের দর্শন অনুযায়ী) স্পেন দেখাল সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ। ‘আমরা শুধু বল ধরে রাখতে চাই না, আমরা প্রতিপক্ষের বক্সে আঘাত করতে চাই। আধুনিক ফুটবল গতির খেলা।’

রদ্রি এবং পেদ্রি মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে বলের গতিপথ বদলে দিয়েছেন মুহূর্তের মধ্যে।

ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামসের মতো তরুণরা উইং দিয়ে যে গতি তৈরি করছেন, তা যেকোনো রক্ষণভাগের জন্য দুঃস্বপ্ন।

লড়াকু কিন্তু অপ্রস্তুত সৌদি আরব : সৌদি আরব এই ম্যাচে কোনো অলৌকিক কিছু ঘটাতে পারেনি সত্য, তবে তাদের লড়াকু মানসিকতা প্রশংসার দাবি রাখে। ম্যাচের শুরু থেকেই তারা স্পেনের মানের সঙ্গে টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আধুনিক ফুটবলের দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং মাঝমাঠে বল ধরে রাখার দক্ষতার কাছে তারা মার খেয়ে গেছে। বিশ্বমঞ্চে টিকে থাকতে হলে এশিয়ার পরাশক্তিদের যে আরও আধুনিক ফুটবল খেলতে হবে, এই ম্যাচ ছিল তারই এক বড় শিক্ষা।

এক নতুন ভোরের ইশতেহার : ৪-০ গোলের এই জয় স্পেনের জন্য কেবল ৩টি পয়েন্ট নয়। এটি বিশ্ব ফুটবলের পরাশক্তিদের উদ্দেশ্যে এক খোলা চিঠি। স্পেন এখন আর কেবল পাসের জালে প্রতিপক্ষকে বন্দি করে না, তারা এখন প্রতিপক্ষকে ছিঁড়েখুঁড়ে খেতে জানে। পুরোনো ঐতিহ্য আর নতুন প্রজন্মের ক্ষিপ্র গতির এই মিশ্রণ স্পেনকে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় ফেভারিটে পরিণত করেছে। আর ফুটবল বিশ্ব অপলক চোখে তাকিয়ে দেখছে এক নতুন অধ্যায়ের শুরু যার নাম আধুনিক স্প্যানিশ ফুটবল।