ঢাকা বুধবার, ০১ জুলাই, ২০২৬

বিদায় জার্মানি

মির্জা হাসান মাহমুদ
প্রকাশিত: জুলাই ১, ২০২৬, ০৪:১৮ এএম

পেনাল্টি শুটআউট মানেই জার্মানির জয়Ñ বিশ্বফুটবলের এই অমোঘ নিয়মটি মঙ্গলবার রাতে বোস্টন স্টেডিয়ামে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। বল দখল, নিখুঁত আক্রমণ আর মুহুর্মুহু সুযোগ তৈরির দিক থেকে পুরো ম্যাচজুড়ে আধিপত্য বজায় রেখেও, দিনশেষে এক রাশ হতাশা আর বিষাদ নিয়ে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হলো জুলিয়ান নাগেলসম্যানের দলকে। ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ের ১০ নম্বর দলটির এভাবে ৪১তম স্থানে থাকা প্যারাগুয়ের রক্ষণব্যুহের কাছে আত্মসমর্পণ ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় ট্র্যাজিক অঘটনের দলিল হয়ে রইল।

ম্যাচের শুরু থেকেই জার্মানি তাদের চেনা আক্রমণাত্মক রূপ প্রদর্শন করে। শুরুর ধাক্কা সামলে দ্রুত ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগের দখল নিজেদের করে নেন কাই হাভার্টজ ও ফ্লোরিয়ান ভির্টজরা। প্রথমার্ধে প্রায় ৭৮ শতাংশ সময় বল নিজেদের পায়ে রেখে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে কোণঠাসা করে ফেলেছিল নাগেলসম্যানের শিষ্যরা। ডেনিজ উনদাভের চিপ কিংবা ভির্টজের দূরপাল্লার শটগুলো বারবার প্যারাগুয়ের রক্ষণভাগে কাঁপন ধরালেও, কাঙ্ক্ষিত গোলের দেখা মিলছিল না। তবে ধারার বিপরীতে ৪২ মিনিটে গোল খেয়ে পিছিয়ে পড়ার পরও দমে যায়নি চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। দ্বিতীয়ার্ধের ৫৪ মিনিটে বক্সের ভেতর ভেসে আসা নিখুঁত ক্রস থেকে কাই হাভার্টজের দর্শনীয় ও শক্তিশালী হেড যখন জাল স্পর্শ করে, তখন মনে হয়েছিল জার্মানি হয়তো তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পটি আবারও লিখতে চলেছে।

সমতায় ফেরার পর জার্মানির আক্রমণের ধার আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। লিওন গোরেৎসকার নিশ্চিত গোল যখন হুয়ান কানালের ব্লকে আটকে যায়, কিংবা কাই হাভার্টজের বুলেট গতির হেড প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিল অতিমানবীয় দক্ষতায় ফিরিয়ে দেন, তখনই যেন ভাগ্যদেবীর অলক্ষ্য ইঙ্গিত স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল। নির্ধারিত সময়ের পর অতিরিক্ত সময়েও জার্মানির আক্রমণভাগ একের পর এক ঢেউ আছড়ে ফেলেছে লাতিন আমেরিকার দলটির বক্সে। ম্যাচের ১০২ মিনিটে জোনাথন তাহের হেড থেকে আসা গোলটি জার্মানিকে উল্লাসে ভাসালেও, ভিএআরের সূক্ষ্ম ব্যবচ্ছেদ জার্মান শিবিরে বজ্রাঘাতের মতো আঘাত হানে। গোলরক্ষকের ওপর ভালদেমার আন্তনের ফাউলের কারণে গোলটি বাতিল হওয়া মানসিকভাবে জার্মানিকে পিছিয়ে দেয়। এমনকি ১১৯ মিনিটে আন্তনের ক্লোজ-রেঞ্জ হেডও গোললাইন থেকে ফিরে আসে। স্কোরলাইনের ১-১ সমতা ভাঙার সব পথ রুদ্ধ হয়ে যায়।

যার ফলে যে পেনাল্টি শুটআউটকে জার্মানি তাদের চিরন্তন শক্তির জায়গা ভাবত, সেটিই তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। স্নায়ুচাপের চূড়ান্ত পরীক্ষায় প্রথম শটেই কাই হাভার্টজের ব্যর্থতা পুরো দলের আত্মবিশ্বাসে বড় ধাক্কা দেয়। যদিও কিমিখ, জামাল মুসিয়ালা ও নাদিয়েম আমিরি সফলভাবে বল জালে জড়িয়ে লড়াই টিকিয়ে রেখেছিলেন, কিন্তু নিক ভল্টেমাডের শট মিস এবং সাডেন ডেথে খোদ জোনাথন তাহের শট বারের ওপর দিয়ে চলে যাওয়া ছিল জার্মান ফুটবলের ইতিহাসে নজিরবিহীন দৃশ্য।

বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে জার্মানি এর আগে কখনো টাইব্রেকারে ম্যাচ হারেনি। বোস্টনের এই রাত তাই কেবল জার্মানির বিদায়ের রাত নয়, বরং তাদের অপরাজেয় মানসিকতার মিথ ভেঙে চুরমার হওয়ার রাত। মাঠের পরিসংখ্যানে শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখেও সুযোগ কাজে লাগাতে না পারার চড়া মূল্য দিতে হলো ইউরোপিয়ান এই পরাশক্তিকে। প্যারাগুয়ের রূপকথার জয়ের বিপরীতে জার্মানির এই বিদায়গাথা ফুটবল বিশ্বের টাইমলাইনে দীর্ঘকাল বিষাদময় অধ্যায় হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।