ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

প্রজ্ঞাপনে ঝুলে আছে পুলিশ কমিশন

সাইফ বাবলু
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২৬, ০১:৫০ এএম

১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকারের নানা সংস্কার উদ্যোগের মধ্যে একটি ছিল পুলিশ বাহিনীর সংস্কার। দলীয়ভাবে পুলিশকে ব্যবহার প্রতিরোধের পাশাপাশি জনমুখী ও জবাবদিহিমূলক বাহিনী গঠনের লক্ষ্যে পুলিশ সংস্কারের নানা প্রস্তাবের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল পুলিশ কমিশন গঠন। নানা নাটকীয়তার পর গত বছরের ডিসেম্বরে পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ প্রজ্ঞাপন জারি হলেও এখনো আলোর মুখ দেখেনি কমিশনের কার্যক্রম। ইতোমধ্যে পার হয়ে গেছে আড়াই মাস। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। তবে পুলিশ কমিশনের কার্যক্রমের রূপরেখা বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগ এখনো শুরু হয়নি। এ অবস্থায় পুলিশ কমিশন বাস্তবায়ন নিয়ে মাঠ পর্যায়ে নানা শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন, অর্থ ও পুলিশ অধিশাখা) মো. আতাউর রহমান খান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘পুলিশ কমিশনের কমিটি তৈরির জন্য একটি সার্চ কমিটি গঠিত হবে। সার্চ কমিটির কাজ হলো কমিশনের চেয়ারম্যান, সদস্যসচিবসহ কমিটিতে কারা থাকবেন, তাদের নাম প্রস্তাব করা। এরপর কমিটি গঠন করা হবে। সবেচেয়ে বড় বিষয় হলো পুলিশ কমিশনের জন্য একটি স্থায়ী কার্যালয়, বাজেট, জনবল নিয়োগ, আসবাবাপত্র কেনাকাটা করা। সার্বিক বাজেটের বিষয়ে আগে সরকারের অনুমতি প্রয়োজন। এসব কাজ একটু সময় সাপেক্ষ। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে কমিশনের রূপরেখা ও কার্যক্রমের বিধিবিধান অনুমোদন করে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এর পরই জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচন শেষে মাত্রই নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। এখনো বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকার পুলিশ কমিশন গঠনে আন্তরিক। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়ও এই কমিশনের বিষয়ে অবগত রয়েছেন। সার্চ কমিটি গঠন করার পাশাপাশি কমিশনের অন্যান্য কার্যক্রম যেমনÑ কার্যালয়, জনবলসংক্রান্ত বাজেট তৈরি করে সেই বাজেটের অনুমোদন প্রয়োজন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছে।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশের প্রজ্ঞাপন হলেও সরকার যদি মনে করে এই কমিশনে আরও কিছু পরিবর্তন ও পরিমার্জন প্রয়োজন, সেটি করা যেতে পারে। কমিশনের রূপরেখায় সংযোজন বা বিয়োজনের প্রস্তাব থাকলে পুলিশ সদর দপ্তর সেটি করে দিতে পারে। সার্চ কমিটি গঠনের আগে বা পরে পুলিশ কমিশনেও প্রয়োজন হলে পরিবর্তন হতে পারে। তবে পরিবর্তন বা পরিমার্জন হলেও পুলিশ কমিশন যেটি হয়েছে, সেটি বাতিল হবে না। পুলিশ কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে সামনের দিনগুলোতে আইজিপি নিয়োগের সুপারিশ, পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধান, পদায়ন ও পদোন্নতিসহ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো আসতে পারে। এমন হলে পুলিশকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে না।

অন্যদিকে পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতায় আসার পর সংস্কার কমিশন নামে একটি কমিশন হয়। ওই সংস্কার কমিশন থেকে পুলিশ বাহিনীর সংস্কার নিয়ে কথা ওঠে। জনমত জরিপ করে সংস্কার কমিশন পুলিশের পেশাদারিত্ব ফেরাতে বেশ কিছু প্রস্তাব দেয়। এই প্রস্তাবেরই গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রস্তাব ছিল স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন। তখন পর্যন্ত কমিশন কীভাবে হবে, কার্যক্রম কী হবে, কারা কমিশনে থাকবেন, তার কোনো কিছুই ঠিক ছিল না। পরে ২০০৭ সালে প্রস্তাবিত পুলিশ কমিশনের রূপরেখার পাশাপাশি আরও দুটি রূপরেখা বিবেচনায় নিয়ে পুলিশ কমিশনের নাম, কার্যক্রম, কমিশনের পরিচালনা পর্ষদ, সার্চ কমিটি ইত্যাদি আলোচনা শেষ করে গত ডিসেম্বর মাসে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। কমিশনের আইন, বিধিবিধানের রূপরেখা চূড়ান্ত করা হলেও এখনো কমিশনের কার্যক্রম শুরু করা যায়নি। তবে তখন বিষয়টি নিয়ে এমন আলোচনা ছিলÑ নতুন সরকার এলে কমিশনের কার্যক্রম শুরু হবে। সরকার মাত্র ক্ষমতা নিয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ গঠন হয়েছে অল্প কয়েক দিন। হয়তো সরকার বুঝেশুনেই কমিশন গঠনের জন্য একটি সার্চ কমিটি করবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, পুলিশ কমিশন গঠনে যে অধ্যাদেশ জারি হয়েছে, সেই অধ্যাদেশে বলা আছে, পুলিশ কমিশনের চেয়ারম্যান, সদস্যসচিব এবং সদস্য নির্বাচনে যারা থাকবেন তাদের নাম বাছাই করে সুপারিশ করতে একটি বাছাই কমিটি গঠন করবে সরকার। ওই বাছাই কমিটিতে প্রধান বিচারপতি মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারপার্সন, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্য (মনোনীত), স্বরাষ্ট্রসচিব সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান থাকবেন। কমিটির কমপক্ষে পাঁচজন মিলে কোরাম কমিটি হবে, যারা পুলিশ কমিশনের চেয়ারপার্সন, সদস্যসচিবসহ অন্য সদস্যদের মনোনীত করবেন।

পুলিশ কমিশনের কার্যক্রম সম্পর্কে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক রূপালী বাংলাদেশকে জানান, মাঠ পুলিশের চাহিদার বিপরীতে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে পুলিশ কমিশনের অধ্যাদেশসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছিল। এরপর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসেছে। আমরা নতুন সরকারের কাছে আশা রাখছি তারা এই কমিশনকে গতিশীল করতে প্রয়োজনীয় কাজগুলো দ্রুত এগিয়ে নেবে। বিশেষ করে এখনো পুলিশ কমিশনে কারা থাকবেন, সেটি বাছাই করতে যে সার্চ কমিটি গঠনের কথা ছিল, সেটি এখনো করতে পারেনি নতুন সরকার।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, গত ৪ ডিসেম্বর পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর খসড়া অনুমোদন দেয় অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ। পাঁচ সদস্যের ওই কমিশনে চেয়ারপার্সন হবেন সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি। আর সদস্যসচিব হবেন অতিরিক্ত আইজিপি (গ্রেড-১) পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা। কমিটির সদস্য থাকবেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেসি কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন (গ্রেড-১) একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, বিশ^বিদ্যালয়ের একজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং ১৫ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন মানবাধিকারকর্মী।

পুলিশ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রূপালী বাংলাদেশকে জানান, পুলিশ কমিশন গঠনের জন্য পুলিশ সদস্যদের লড়াই দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে ওয়ান ইলেভেন (জরুরি সরকার) সরকারের সময়ে মূলত পুলিশ কমিশন গঠনের পক্রিয়া শুরু হয়। ওই সময় একটি রূপরেখা সরকারকে দেওয়া হলেও আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিষয়টি আলোর মুখ দেখেনি। বরং আওয়ামী লীগের ১৫ বছর পুলিশকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল, যার প্রভাব পড়েছে ২০২৪ সালে জুলাই-আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে। ওই অভ্যুত্থান দমনে পুলিশ সরাসরি রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হয়। ফলে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এর প্রভাব পড়ে পুলিশের ওপর। সাধারণ মানুষের সঙ্গে পুলিশের দূরত্ব তৈরি হয়।

পুলিশ সদর দপ্তরের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, ডিসেম্বর মাসে পুলিশ কমিশনের অধ্যাদেশসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার পর প্রায় আড়াই মাস পার হয়ে গেছে। ইতোমধ্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে সালাউদ্দিন আহমেদ দায়িত্ব পেয়েছেন। নয়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নির্বাচনের আগে সংস্কার কমিশনের একাধিক বৈঠকে কমিশনের রূপরেখা নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। পুলিশ আশা করছে, নতুন সরকার শিগগির সার্চ কমিটি গঠন করবে। সার্চ কমিটি গঠিত হলেই পুলিশ কমিশনের কাজে গতি আসবে।

পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, এই কমিশন গঠিত হলে অর্থাৎ, কমিটির চেয়ারপার্সন ও সদস্যসচিব এবং সদস্য নির্ধারণ হলে নাগরিকের অভিযোগ অনুসন্ধান-নিষ্পত্তি, পুলিশ সদস্যদের সংক্ষোভ নিরসন ইত্যাদি বিষয়ে সরকারের কাছে সুপারিশ করা সহজ হবে। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ক্ষতিগ্রস্ত পুলিশ বাহিনীকে পুরোপুরি পেশাদারিত্বে ফেরাতে কমিশনের অসম্পন্ন কাজগুলো দ্রুত নিষ্পন্ন হওয়া প্রয়োজন। কমিশনের কার্যক্রম দৃশ্যমান হলে পুলিশ বাহিনী জবাবদিহির মধ্যে ফিরবে।