বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলাগুলোতে ধান চাষ এখন আর কেবল কৃষিকাজ নয়, এটি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে এক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। একদিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে লোনাপানির অনুপ্রবেশ, অন্যদিকে বসন্তের শেষভাগে তীব্র দাবদাহ বা ‘হিট স্ট্রেস’Ñ এই দুই সাঁড়াশি আক্রমণে বোরোর ফলন ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে এই অন্ধকার সময়ে আশার আলো দেখাচ্ছে দেশি ও বিদেশি গবেষকদের একটি যৌথ গবেষণা। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণার মূল প্রতিপাদ্য হলোÑ কেবল রোপণের সময় কিছুটা এগিয়ে আনলেই উপকূলের সব প্রতিকূলতা জয় করে বোরোর কাক্সিক্ষত ফলন পাওয়া সম্ভব।
সম্প্রতি বিশ^খ্যাত একাডেমিক প্রকাশনা সংস্থা এলসেভিয়ারের জার্নাল ‘ফিল্ড ক্রপস রিসার্চ’-এ এই গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণার শিরোনাম ছিলÑ ‘উপকূলীয় গঙ্গা ব-দ্বীপে উচ্চ তাপমাত্রা এবং লবণাক্ততা এড়ানোর মাধ্যমে বোরো ধানের ফলন এবং পানির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি।’
এই যুগান্তকারী গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিআরআরআই) সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা বিভাগের গবেষক প্রিয়া লাল চন্দ্র পাল। তার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার মারডক ইউনিভার্সিটি, সিএসআইআরও এবং ভারতের গবেষকদের একটি শক্তিশালী দল।
গবেষণার সারসংক্ষেপ : উপকূলীয় বোরো চাষের এই গবেষণাটি অস্ট্রেলিয়ার মারডক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক রিচার্ড ডব্লিউ বেলের তত্ত্বাবধানে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম লবণাক্ত এলাকা হিসেবে পরিচিত খুলনার দাকোপ উপজেলায় সরাসরি কৃষি খেতে (মাঠ গবেষণা) পরিচালিত হয়েছে। গবেষক দল টানা দুই বছর ধরে (২০২৩-২৪ এবং ২০২৪-২৫ বোরো মৌসুম) তথ্য সংগ্রহ করেছেন। গবেষকরা মূলত লবণাক্ততা ও তীব্র দাবদাহের সঙ্গে ধানের ফলনের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করার জন্য দীর্ঘ সময় ব্যয় করেছেন।
গবেষণায় আধুনিক ও নিয়ন্ত্রিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। এতে উপকূলের জন্য উপযোগী উচ্চ ফলনশীল ও লবণ-সহিষ্ণু জাত ‘ব্রি ধান-৬৭’ ব্যবহার করা হয়। গবেষণার মূল কৌশলী অংশটি ছিল রোপণের সময় বা ‘সোয়িং উইন্ডো’ নির্ধারণ। গবেষকরা ১৫ ডিসেম্বর থেকে শুরু করে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ছয়টি ভিন্ন সময়ে (১৫ ও ৩০ ডিসেম্বর, ১৪ ও ২৯ জানুয়ারি, এবং ১৩ ও ২৮ ফেব্রুয়ারি) ধান রোপণ করেন। লক্ষ্য ছিলÑ কোন সময়ে রোপণ করলে আবহাওয়া ধানের জন্য সবচেয়ে অনুকূল থাকে তা খুঁজে বের করা।
গবেষণার পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল একটি ‘সিপ্লট-প্লাট’ নকশার ওপর ভিত্তি করে। এতে নিয়মিত বিরতিতে খালের পানির লবণাক্ততা এবং মাটির লবণাক্ততা পরিমাপ করা হয়েছে। পাশাপাশি ধানের ফলন বৃদ্ধি, ধানের ছড়ার বন্ধ্যত্ব বা স্টেরিলিটি, এপ্রিল-মে মাসের উচ্চ তাপমাত্রার প্রভাব এবং পানির ব্যবহারÑ প্রতিটি সূক্ষ্ম বিষয় আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এই সমন্বিত ও বাস্তবধর্মী গবেষণাই উপকূলীয় কৃষির জন্য এক নতুন রোপণ ক্যালেন্ডারের দিকনির্দেশনা দিয়েছে।
গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ : গবেষণা প্রতিবেদনে উপকূলীয় বোরো চাষের প্রধান দুটি প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করা হয়েছে। তা হলোÑ লবণাক্ততা এবং হিট স্ট্রেস (উচ্চ তাপমাত্রা)।
গবেষকরা বলছেন, উপকূলে বোরো মৌসুমে যখন ধান পাকার সময় হয় (এপ্রিল ও মে মাস), তখন তাপমাত্রা দ্রুত বাড়তে থাকে। পারদ যখন ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের গ-ি ছাড়িয়ে যায়, তখন ধান গাছ থেকে চাল হওয়ার জৈবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। একেই বিজ্ঞানীরা বলছেন ‘হিট স্ট্রেস’। ঠিক একই সময়ে সেচের পানির প্রাপ্যতা কমে যায় এবং মাটিতে লবণের ঘনত্ব চরমে পৌঁছায়। এই দুই প্রতিকূলতার যুগল প্রভাবে ধানের শিষ বন্ধ্যা হয়ে যায়। ফলে বাইরে থেকে ধানের ছড়া দেখা গেলেও ভেতরে চাল হয় না, যা কৃষকের হেক্টরে কয়েক মণ ফলন কমিয়ে দেয়।
আগাম রোপণ (১৫-৩০ ডিসেম্বর) : এই সময়ে রোপণ করা ধান থেকে হেক্টরপ্রতি সর্বোচ্চ ৭.০ থেকে ৭.৬ টন ফলন পাওয়া গেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, উপকূলীয় এলাকায় সেচের পানির প্রাপ্যতা খুবই সীমিত। দেরিতে ধান রোপণ করলে মাটি ও পানিতে লবণের মাত্রা অত্যধিক বেড়ে যায়, যা ধুইয়ে ফেলার জন্য কৃষকরা বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত মিঠাপানি ব্যবহার করেন। কিন্তু আগাম রোপণের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, লবণের তীব্রতা কম থাকায় ২০ থেকে ২৩ শতাংশ কম পানি ব্যবহার করেও প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ফলন পাওয়া সম্ভব। পানির এই সাশ্রয় উপকূলীয় এলাকার জলবায়ু অভিযোজনে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিলম্বিত রোপণ (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি) : যারা জানুয়ারির শেষে বা ফেব্রুয়ারিতে রোপণ করেছেন, তাদের ফলন ১১ শতাংশ থেকে শুরু করে ক্ষেত্রবিশেষে ৬৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
এর মূল কারণ হলো, যারা ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে কাজ শুরু করেছিলেন, তাদের ধান লবণের তীব্রতা এবং এপ্রিলের দাবদাহ শুরু হওয়ার আগেই পেকে গেছে।
গবেষণায় যা পাওয়া গেল : গবেষণার চূড়ান্ত ফল থেকে চারটি প্রধান দিক উন্মোচিত হয়েছে। সেগুলো হলো-
জলবায়ু এড়ানো : আগাম রোপণ করা ধান যখন রেণু উৎপাদন ও চাল হওয়ার সংবেদনশীল পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন উপকূলের তাপমাত্রা ও লবণাক্ততা সহনীয় পর্যায়ে থাকে। ফলে এপ্রিল-মে মাসের তীব্র দাবদাহ ধানকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে না।
পানির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি : আগে রোপণ করলে সেচের পানির লবণাক্ততা কম থাকে। এতে ‘ওয়াটার প্রোডাক্টিভিটি’ বা পানির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায় এবং অল্প সেচেই ধান পুষ্ট হয়।
বন্ধ্যত্ব (চিটা) রোধ : গবেষণায় দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারিতে রোপণ করা ধানে ‘হিট স্ট্রেস’ ও লবণের কারণে ধানের ছড়া সাদা হয়ে যাওয়ার হার অনেক বেশি, যা আগাম রোপণে নেই বললেই চলে।
লবণ-সহিষ্ণু জাতের কার্যকারিতা : উপকূলীয় এলাকায় শুধু লবণাক্ততা সহনশীল জাত (যেমন: ব্রি ধান-৬৭, ব্রি ধান-৯৭, ব্রি ধান-১০৫) ব্যবহারই যথেষ্ট নয়, বরং সেগুলোর সঠিক সময় ব্যবস্থাপনা বা ‘সোয়িং উইন্ডো’ অনুসরণ করা অপরিহার্য।
গবেষক দলের প্রধান প্রিয়া লাল চন্দ্র পাল বলেন, ‘উপকূলীয় ব-দ্বীপ অঞ্চলে বোরো চাষকে টেকসই করতে হলে আমাদের সনাতন রোপণ পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হলে আমাদের ‘প্রকৃতির মেজাজ’ বুঝতে হবে। এই গবেষণা প্রমাণ করেছে যে, ডিসেম্বরের শেষার্ধই হলো উপকূলীয় বোরো চাষের জন্য গোল্ডেন টাইম।’
অস্ট্রেলিয়ার মারডক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক রিচার্ড ডব্লিউ বেল তার পর্যবেক্ষণে জানিয়েছেন, গঙ্গা ব-দ্বীপের এই মডেল শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের অন্যান্য উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষিতেও প্রয়োগ করা সম্ভব। তিনি আভাস দিয়েছেন যে, যদি এই রোপণ ক্যালেন্ডার দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তবে বাংলাদেশের চাল উৎপাদন বছরে কয়েক লাখ টন বৃদ্ধি পাবে।
গবেষকদের সুপারিশ ও প্রস্তাবনা : গবেষকরা উপকূলীয় বোরো চাষের সংকট নিরসনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছেন। তার মধ্যে উপকূলীয় কৃষকদের ১৫ থেকে ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে বোরো ধান রোপণ সম্পন্ন করার জন্য কৃষি বিভাগের মাধ্যমে সচেতন করতে হবে। সেচের জন্য রবি মৌসুমের শুরুতে মিঠা পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে সরকারি স্লুইসগেট ও খাল সংস্কার করা জরুরি। বর্ষার পানি সংরক্ষণের জন্য ‘খাস পুকুর’ খনন প্রকল্প জোরদার করতে হবে। ধান কাটার জন্য ‘কম্বাইন্ড হারভেস্টার’ এবং চারা তৈরির জন্য ‘পলিথিন শেড’ বা কোল্ড প্রোটেকশন প্রযুক্তি সরবরাহ করতে হবে যাতে শীতেও আগাম চারা প্রস্তুত করা যায়। এবং ব্রি ধান-৬৭-এর পাশাপাশি অতি-সম্প্রতি অবমুক্ত হওয়া ব্রি ধান-১০৫ ও ব্রি ধান-১০৭-এর মতো উন্নত ও পুষ্টিগুণসম্পন্ন জাতগুলো কৃষকের দ্বারে পৌঁছে দিতে হবে।

