ঢাকা সোমবার, ০৮ জুন, ২০২৬

ঢাকা ও লন্ডন রুটের বিমানভাড়া

সিলেটের আকাশপথে বৈষম্যের দীর্ঘ ছায়া

সালমান ফরিদ, সিলেট
প্রকাশিত: জুন ৮, ২০২৬, ০৫:৪৩ এএম

দেশের অন্যতম ব্যস্ত এবং অর্থনৈতিক ও রেমিট্যান্সের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ আকাশপথ সিলেট। তবুও ‘সিলেট-ঢাকা’ ও ‘সিলেট-লন্ডন’ বিমানপথ বছরের পর বছর ধরে অবজ্ঞা, অবহেলা এবং রাষ্ট্রীয় অনাচারের শিকার। এই দুই রুটে যাতায়াতকারী যাত্রীদের প্রধান ক্ষোভের কারণ টিকিটের চরম মূল্য বৈষম্য ও কৃত্রিম সংকট। দূরত্ব ও সময়ের বিচারে দেশের অন্যান্য অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটের তুলনায় সিলেটের যাত্রীদের গুনতে হয় অতিরিক্ত টাকা। এ নিয়ে অতীতে দফায় দফায় গণআন্দোলন, স্মারকলিপি প্রদান ও নানা প্রতিশ্রুতির পরও ভাড়া নিয়ে অস্থিরতা এবং সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কমেনি। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বঞ্চনার বিষয়টি শুধু একক কোনো রুটের সমস্যা নয়, বরং ভৌগোলিক অবস্থান, প্রবাসীদের নির্ভরতা ও এভিয়েশন খাতের সিন্ডিকেটের এক জটিল সমীকরণ।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আকাশপথের দূরত্ব, জ্বালানি খরচ এবং উড্ডয়ন সময়ের দিক থেকে ঢাকা-সিলেট রুটের সঙ্গে ঢাকা-চট্টগ্রাম বা ঢাকা-যশোর রুটের খুব বেশি তফাত নেই। ঢাকা থেকে সিলেটের আকাশপথের দূরত্ব যেখানে প্রায় ১৯৫ কিলোমিটার এবং গড় উড্ডয়ন সময় ৪৫ থেকে ৫০ মিনিট, সেখানে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের দূরত্ব আরও বেশি, প্রায় ২৩০ কিলোমিটার। অথচ ভাড়ার ক্ষেত্রে চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো।

সাধারণ সময়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে সর্বনিম্ন ভাড়া সাড়ে তিন হাজার থেকে সাড়ে চার হাজার টাকা এবং ঢাকা-যশোর রুটে তিন হাজার ২০০ থেকে চার হাজার টাকার মধ্যে। পিক-সিজনেও এসব রুটে ভাড়া ছয় থেকে সাড়ে সাত হাজার টাকার ওপরে খুব একটা ওঠে না। এর মূল কারণ, ওই সব রুটে একাধিক বেসরকারি বিমান সংস্থা এবং রাষ্ট্রীয় বিমান প্রতিযোগিতামূলকভাবে ফ্লাইট পরিচালনা করে থাকে।

বিপরীতে, সিলেট-ঢাকা রুটে সাধারণ সময়ের সর্বনিম্ন ভাড়াই চার থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা। আর যখন সিলেটে কোনো উৎসব বা যুক্তরাজ্য প্রবাসীদের আসার মৌসুম শুরু হয়, তখন কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এই রুটের ওয়ানওয়ে টিকিট আট থেকে ১২ হাজার টাকা বা এর চেয়েও বেশি দামে বিক্রি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, সড়ক ও রেলযোগাযোগের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে একটি সিন্ডিকেট এভাবে ভাড়া বাড়িয়ে থাকে।

সবচেয়ে বড় বৈষম্য হয় আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে, যখন একই বিমানের টিকিটের দাম ঢাকা ও সিলেটের যাত্রীদের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যায়। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের লন্ডন ফ্লাইটের প্রায় ৮০ শতাংশ যাত্রীই সিলেট অঞ্চলের। অথচ ঢাকা থেকে একজন যাত্রী যেখানে অফ-পিক সিজনে রাউন্ড ট্রিপ টিকিট ৭০০ থেকে ৮৫০ পাউন্ডে কিনতে পারেন, সিলেটের যাত্রীকে ঠিক একই টিকিটের জন্য গুনতে হয় ৮৫০ থেকে এক হাজার পাউন্ড।

পিক-সিজনে এই ব্যবধান বহুগুণ বেড়ে যায়। ঢাকার যাত্রীদের জন্য টিকিট যখন এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ পাউন্ডের মধ্যে থাকে, তখন সিলেটের প্রবাসীদের কাছ থেকে এক হাজার ৪০০ থেকে দুই হাজার পাউন্ড বা তারও বেশি হাতিয়ে নেওয়া হয়। এমনকি বহুদূরের পথ ঢাকা-টরন্টো রুটের ভাড়ার অনুপাতের চেয়েও সিলেটের যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া নেওয়া হয়।

সূত্রমতে, বৈষম্য তৈরি করা হয় টিকিটের কৃত্রিম সংকট ও ট্রাভেল এজেন্সি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের লন্ডন ফ্লাইটের প্রায় ৮০ শতাংশ যাত্রীই সিলেট অঞ্চলের। অথচ অভিযোগ রয়েছে, বিমানের বুকিং সিস্টেমে টিকিট ব্লক করে রাখা হয় এবং পরে তা সিলেটের কিছু নির্দিষ্ট ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে চড়া দামে বিক্রি করা হয়। ঢাকা থেকে কোনো যাত্রী যে টিকিট ৮০ হাজার টাকায় কিনতে পারেন, সিলেটের যাত্রীকে একই টিকিটের জন্য গুনতে হয় এক লাখ ২০ হাজার বা তারও বেশি টাকা।

সবচেয়ে বড় ফাঁদ ডমেস্টিক কানেক্টিং ফ্লাইটে। অনেক সময় সিলেটের যাত্রীদের সরাসরি হিথ্রোর টিকিট না দিয়ে ‘সিলেট-ঢাকা-লন্ডন’ রুটের টিকিট দেওয়া হয়। এতে অভ্যন্তরীণ রুটের অতিরিক্ত ভাড়া আন্তর্জাতিক টিকিটের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। একই বিমানে ভ্রমণ করা সত্ত্বেও শুধু সিলেট থেকে যাত্রা করার কারণে একজন যাত্রীকে ঢাকার যাত্রীর চেয়ে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি ভাড়া দিতে হয়।

এভিয়েশন সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে ও রিফুয়েলিং সীমাবদ্ধতার কারণে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ বা অন্যান্য বড় গ্লোবাল এয়ারলাইন্স সরাসরি সিলেটে নামতে পারে না। ফলে বিমান বাংলাদেশ এই রুটে একচেটিয়া ব্যবসা করে যাচ্ছে। প্রতিযোগিতার অভাবই এই ভাড়া বৈষম্যকে টিকিয়ে রেখেছে।

সিলেট-ঢাকা রুটে নিয়মিত চলাচলকারী এবং হলি গ্রুপের চেয়ারম্যান সাহেদ আহমদ বলেন, অন্য রুটে সময় ও দূরত্ব বেশি হলেও ভাড়া কম; কিন্তু সিলেট রুটে সময় ও দূরত্ব কম হওয়ার পরও ভাড়া বেশি নেওয়ার অর্থ হলো, সিলটিদের পকেট কাটার ধান্ধা। সংশ্লিষ্টদের বিমাতাসুলভ ও অনৈতিক এই পন্থা থেকে সরে আসতে হবে।

রাজনৈতিক সূত্র জানায়, সিলেট-১ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য এবং সরকারের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির এই ভাড়া বৈষম্য নিয়ে অতীতে বেশ সোচ্চার ছিলেন। বিরোধী দলে থাকাকালে এবং পরে বিভিন্ন গণসংযোগ ও নাগরিক সংলাপে তিনি সিলেটের প্রবাসীদের স্বার্থরক্ষা ও আকাশপথের সিন্ডিকেট ভাঙার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বিমানের টিকিট কারসাজি এবং ডমেস্টিক রুটে বড় বোয়িং বিমান চালু না করে ছোট ড্যাশ-৮ বিমান দিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরির বিরুদ্ধে তিনি সিলেটবাসীর পক্ষে অবস্থান নেওয়ারও আশ্বাস দেন। বর্তমানে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিত্ব পাওয়ার পর সিলেটের নাগরিক সমাজের প্রত্যাশাÑ তিনি অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে বিমানের নতুন ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে কথা বলে সিলেটবাসীর এই দীর্ঘস্থায়ী বঞ্চনার স্থায়ী অবসান ঘটাবেন।

অন্যদিকে সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এবং বর্তমান সরকারের অন্যতম নীতিনির্ধারক আরিফুল হক চৌধুরী সিলেট-ঢাকা রুটের বিমান ভাড়া বৈষম্য এবং ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অবহেলার বিরুদ্ধে শুরু থেকেই রাজপথে সোচ্চার ছিলেন। অতীতে বিভিন্ন ফোরামে ও মেয়র থাকাকালে তিনি সরাসরি অভিযোগ করেছিলেন, বিমানের টিকিট ব্যবস্থাপনায় সিলেট অঞ্চলের যাত্রীদের সঙ্গে সৎমায়ের মতো আচরণ করা হয়। লন্ডন বা মধ্যপ্রাচ্যের আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সিংহভাগ যাত্রী সিলেটের হওয়া সত্ত্বেও তাদের ঢাকায় নামিয়ে অভ্যন্তরীণ কানেক্টিং ফ্লাইটের নামে যে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও ভোগান্তি দেওয়া হয়, তার কড়া সমালোচনাও করেছিলেন তিনি। বর্তমান সরকারের মেয়াদে এই ভাড়া বৈষম্য যাতে চিরতরে দূর হয়, সে ব্যাপারে তার পূর্বের অনড় অবস্থান বাস্তবায়ন প্রত্যাশা করছেন সিলেটের সাধারণ মানুষ।

এদিকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা বর্তমানে লন্ডন সফরে রয়েছেন। গত ২ জুন তিনি লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর পরিদর্শন এবং সেখানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নিজস্ব শাখা কার্যালয় ও মেনজিস এভিয়েশনের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রম সরেজমিনে মূল্যায়ন করেন।

লন্ডনে অবস্থানরত প্রবাসী সিলেটিদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এবং হাইকমিশনের সৌজন্য সাক্ষাতে বিমানমন্ত্রী স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, উভয় রুটের ভাড়া বৈষম্য দূর করবে সরকার। তিনি জানান, দেশের বিমানবন্দরগুলোর সেবার মান বৈশ্বিক পর্যায়ে উন্নীত করার পাশাপাশি টিকিট ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি স্বচ্ছ ও অনলাইননির্ভর করার কাজ চলছে। যুক্তরাজ্য প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য ঢাকা-সিলেট রুটের ট্রানজিট কানেক্টিভিটি সহজ করা এবং ভাড়ার যৌক্তিক ও টেকসই সমাধান নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয় কাজ করছে। তবে দেশের অভ্যন্তরীণ রুটেও যাতে সিন্ডিকেট বা যান্ত্রিক সংকটের কারণে কোনো যাত্রী অতিরিক্ত ভাড়া বা টিকিট সংকটের শিকার না হন, সে বিষয়ে তিনি কঠোর নির্দেশনা দেন।

সিলেটের ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও যুক্তরাজ্য প্রবাসীদের দাবি, শুধু বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ভাড়া কমানোর সাময়িক ঘোষণা দিলেই হবে না, সিলেটের বর্তমান দুই হেভিওয়েট মন্ত্রী যদি বেসামরিক বিমান পরিবহনমন্ত্রীর সঙ্গে যৌথভাবে বসেন এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেন, তা হলেই দৃশ্যমান উন্নতি হয়তো আসতে পারে।

অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (আটাব) সিলেট অঞ্চলের সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান রুশো চৌধুরী বলেন, ভাড়া বৈষম্য দূর এবং সিলেটের বিমানপথে সুষম শৃঙ্খলা আনতে সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত সিলেট-লন্ডন রুটে থার্ড কান্ট্রি এয়ারলাইন্সের এক্সেস বাড়ানো। এ ছাড়া ঢাকা ও সিলেটের জন্য বিমানের টিকিটের বেইজ ফেয়ার অভিন্ন করতে হবে। অনলাইন বুকিং সিস্টেমে ট্রাভেল এজেন্সির কৃত্রিম সংকট বন্ধে স্থায়ী ও কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে পারলেই দীর্ঘদিনের এই ‘ভাড়া বৈষম্য’ দূর করা সম্ভব।

ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার-সিলেট রুটে বাংলাদেশ বিমান ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট সচল রাখা এবং প্রবাসীদের বিভিন্ন নাগরিক স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে এই প্ল্যাটফর্ম থেকে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন ও নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন প্রবাসী জুনেদ আহমদ। যিনি যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রবাসীদের সংগঠন ‘ইউকে এনআরবি সোসাইটি’র পরিচালক। তিনি টেলিফোনে দৈনিক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, শুধু প্রতিশ্রুতির মধ্যে আটকে থাকলে হবে না। অতীতেও এ রকম হয়েছে। ফল ছিল শূন্য। আজকে যারা সরকারে, তাদের একাধিক মন্ত্রী, উপদেষ্টা আমাদের আন্দোলনের সহযাত্রী ছিলেন। তাদের কাছে আমাদের সর্বোচ্চ প্রত্যাশা। সেখানে বিমুখ হলে যাওয়ার জায়গা থাকবে না। তাদের আমাদের দুঃখের সহযাত্রী হয়েই থাকতে হবে। সিলেটের সঙ্গে হওয়া দৃশ্যমান অন্যায়, অবিচার দূর করতে হবে।