কর ফাঁকি মোট ৪৫০ কোটি টাকা। রাজস্ব ফাঁকির দুটি মামলাই আজ সোমবার গাজীপুরের আদালতে শুনানি হবে। তবে শুনানির আগেই রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একটি পক্ষের সঙ্গে ভার্গো টোব্যাকো লিমিটেড কর্তৃপক্ষের গোপন আঁতাত রয়েছে। যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে আগারগাঁওয়ের রাজস্ব ভবনে ৮ ফেব্রুয়ারি একটি পক্ষকে ডেকে ধমক দেন এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান।
এনবিআর জানায়, ভার্গো টোব্যাকো লিমিটেডের ৩৬৪ কোটি ৩৮ লাখ এবং ৮৫ কোটি টাকা কর ফাঁকির মামলা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কোম্পানিটি অপ্রদর্শিত তামাক ব্যবহারসহ নানা কৌশলে সিগারেট বিক্রি করত, যা ধরা পড়েছে এনবিআরের ভ্যাট গোয়েন্দাদের জালে। কোম্পানিটির উৎপাদিত সিগারেট ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যেÑ পার্টনার, দেশ গোল্ড এবং দেশ ব্ল্যাক উল্লেখযোগ্য।
কর ফাঁকির মামলা সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তরের ভ্যাট কমিশনার মো. সামছুল ইসলাম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘মামলা চলমান রয়েছে, গাজীপুরে এটা নিষ্পত্তি হবে। সেখানেই মামলার সব কাগজপত্র পাঠিয়েছি। কোম্পানির কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে জানানো হয়েছে।’
আজ সোমবার গাজীপুরের আদালতে দুটি মামলার শুনানি হবে বলে জানিয়েছেন ভার্গো টোব্যাকোর ডিএমডি অমল হালদার। কর ফাঁকির মামলা এবং শুনানি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে তথ্য গোপন করার অভিযোগ এটা, তবে তা প্রমাণিত নয়।’
‘মামলার ৮ জুন শুনানি হবে’ উল্লেখ করে ডিএমডি অমল হালদার বলেন, ‘আমরা যে ট্যোবাকো প্রতিবছরে কিনি, সেই টোব্যাকো কেনার ওপর ফারমার্স এবং ট্রেডারদের অ্যাডভান্স দেই। সেটা সিগারেটে কনভার্ট করে তার ওপরে ডিউটি বসিয়ে মামলা করছে।’ মামলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটা এটিআরে যুক্ত করেছে। দুটি মামলা শুনানিতে আমরা উপস্থিত থাকব।’ তবে কোম্পানির কারখানায় অভিযান চালিয়ে জাল ব্যান্ডরোল উদ্ধারের বিষয় এড়িয়ে যান অমল হালদার।
আরও তথ্য জানতে কোম্পানি ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নাফিস নজরুলকে হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার ফোন দেওয়া হয়েছে এবং তথ্য দিতে অনুরোধ জানানো হলেও তিনি তা করেননি।
এদিকে, কর ফাঁকির মামলা দায়ের করেন এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান। তাকে না জানিয়ে গোপনে মামলায় বিকল্পভাবে বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআর কমিটি করেছে ঢাকা উত্তর ভ্যাট কমিশনারেট। বিষয়টি জানাজানি হলে ৮ ফেব্রুয়ারি কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করে এনবিআর চেয়ারম্যান।
এই ঘটনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের শীর্ষ এক নেতার প্রতিষ্ঠান হওয়ায় দীর্ঘদিনেও ব্যবস্থা নিতে পারেনি এনবিআর। বিপরীতে কোম্পানির গাজীপুরের কারখানায় অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়ার বিভিন্ন অভিযোগ তুলে এনবিআরের সদস্য বেলাল চৌধুরীকে প্রথমে বদলি পরে ওএসডি করা হয়েছে। তবে তার বিরুদ্ধে অপ্রদর্শিত আয়ের একাধিক অভিযোগও রয়েছে।
এনবিআরের বিশেষ সূত্র জানিয়েছে, তামাকপণ্য বিক্রির তথ্য গোপন দলিলে সংরক্ষণ ও জাল ব্যান্ডরোল তৈরিসহ বিভিন্ন কৌশল নিত কোম্পানিটি। বিষয়টি টের পেয়ে ২০২১ সালের মে মাসে ভ্যাট গোয়েন্দারা কারখানায় অভিযান পরিচালনা করেন। কর ফাঁকি ধরা পড়ায় সে সময় মামলাও করে এনবিআর।
এনবিআর সূত্র জানায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভার্গো টোব্যাকো মাসে চার কোটি টাকার বেশি ভ্যাট দিলেও হঠাৎ তা কমে দাঁড়ায় এক কোটি ৪০ লাখে। ২০২৫ সালে ভ্যাট জমা কমে গেলে সন্দেহ তৈরি হয় এনবিআরের। এরপরে ভার্গো টোব্যাকোর কারখানা ও বারিধারার অফিসে অভিযান চালানো হয়। বারিধারার মূল অফিসের কাছাকাছি আরেকটি অফিস থেকে বিভিন্ন দলিল উদ্ধার করা হয়।
দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ১১ লাখ কেজির বেশি তামাক কেনার তথ্য গোপন করেছে। এই কাঁচামাল দিয়ে অন্তত ১১২ কোটি ৩২ লাখ শলাকা সিগারেট উৎপাদন সম্ভব। এতে সম্ভাব্য সম্পূরক শুল্ক ফাঁকি ২৯৬ কোটি ১৭ লাখ টাকা এবং সম্ভাব্য ভ্যাট ফাঁকি ৬৮ কোটি ২০ লাখ টাকা। সুদ ছাড়াই নিট ভ্যাট ফাঁকির পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৬৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার বেশি।
বিষয়টি এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমানের নজরে আনেন রাজস্ব বোর্ডের সদস্য বেলাল হোসাইন চৌধুরী। চেয়ারম্যান মৌখিকভাবে অভিযানের অনুমতি দেন। এরপর ১৭ আগস্ট ২০২৫ গাজীপুরে ভার্গো টোব্যাকোর কারখানায় অভিযান চালায় এনবিআরের গোয়েন্দা দল। অভিযানে তারা দেখতে পান, প্রতিষ্ঠানটি ১১ দশমিক ২২ লাখ কেজি তামাক ক্রয়ের তথ্য গোপন রাখে। এই কাঁচামাল দিয়ে উৎপাদন সম্ভব অন্তত ১১২ কোটি ৩২ লাখ শলাকা সিগারেট।
অভিযানের পর, কর্মকর্তারা সম্ভাব্য সম্পূরক শুল্ক ফাঁকি ২৯৬ কোটি ১৭ লাখ টাকা এবং সম্ভাব্য ভ্যাট ফাঁকি ৬৮ কোটি ২০ লাখ টাকা নির্ধারণ করেন। সুদ ছাড়া মোট রাজস্ব ফাঁকি ৩৬৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। ভার্গো টোব্যাকোর বিরুদ্ধে ভ্যাট ফাঁকির মামলা (নম্বর- ০১, তারিখ ২৬ আগস্ট, ২০২৫) দায়ের করা হয়। দ্বিতীয় মামলা (নম্বর ০৪ এবং ১৪ অক্টোবর ২০২৫ সাল) করে এনবিআর।
অভিযানের প্রায় তিন মাস পর, ৬ নভেম্বর ২০২৫ কারণ দর্শাও নোটিশ জারি হয়। অভিযোগ আছে, এ সময় অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান অভিযান পরিচলানাকারী কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করার চেষ্টা করে। আইন অনুযায়ী, শোকজের জবাব দিতে হলে দাবিকৃত জরিমানার অন্তত ১০ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৩৬ কোটি টাকা প্রাথমিকভাবে জমা দিতে হয়। কিন্তু অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান শোকজের জবাব না দিয়ে সরাসরি এডিআরের আবেদন করে। অভিযোগ উঠেছে, ৩৬ কোটি টাকা জমা না দিতেই তারা কৌশল করেছে।
এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনি ডামাডোলের মধ্যে ভার্গো টোব্যাকো লিমিটেড ঘিরে এনবিআরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়েছিল। চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি রাজস্ব ভবনের বাইরে নীরবতা থাকলেও ভেতরে ছড়িয়েছিল উত্তাপ। মামলা নিষ্পত্তির কমিটি করায় রাজস্ব ভবনের ৫০১ নম্বর কক্ষে কর্মকর্তাদের ডেকে ধমক দেন এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান।
ভার্গো টোব্যাকোর বিরুদ্ধে আগেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ২০২১ সালেও গাজীপুরে তাদের কারখানায় অভিযান চালিয়ে এক লাখ ৯৯ হাজার শলাকা অবৈধ সিগারেট এবং এক লাখ ৫৬ হাজার পিস ব্যান্ডরোল জব্দ করে এনবিআর। তাদের বিরুদ্ধে রাতে ফ্যাক্টরি চালানো, কারখানায় উৎপাদনের সঠিক হিসাব রাখার অভিযোগও রয়েছে।
ভ্যাট ফাঁকির বিষয়ে বিশ্লেষক হিসেবে ভ্যাট কনসালট্যান্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হাসানুল ইসলাম টিপু বলেন, ‘তছরুপের যে কালচার, এটা আমাদের সবচেয়ে বড় ক্যানসার। এটাকে প্রতিহত করতে হবে।’

