একসময় রাজধানীর অলিগলি থেকে শুরু করে জেলা শহর পর্যন্ত আতঙ্ক ছড়াত কয়েকজন চিহ্নিত শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম। তাদের অবস্থান, সহযোগী, অস্ত্রভান্ডার এমনকি অর্থের উৎস সম্পর্কেও কমবেশি ধারণা ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। কোনো এলাকায় গুলির শব্দ শোনা গেলে কিংবা চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠলেই সন্দেহের তির যেত পরিচিত কয়েকটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর দিকে। কিন্তু সেই দৃশ্যপট এখন অনেকটাই বদলে গেছে।
অপরাধীরা এখন আর প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া দেয় না। নিজেদের পরিচয়ও সামনে আনে না। তারা ছায়ার আড়ালে থেকে গড়ে তুলছে নতুন নেটওয়ার্ক। পুরোনো সন্ত্রাসীদের জায়গা দখল করছে ছোট ছোট সংঘবদ্ধ চক্র, ভাসমান অপরাধী এবং প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ নেটওয়ার্ক। ফলে অপরাধ কমেনি, বরং বদলে গেছে তার ধরন, কৌশল ও বিস্তৃতি।
সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সারা দেশে চাঁদাবাজ ও অপরাধীদের একটি তালিকা তৈরি করে। ওই তালিকায় ৩ হাজার ৮৪৯ জন চাঁদাবাজের নাম উঠে আসে। এর মধ্যে শুধু রাজধানী ঢাকায় চাঁদাবাজের সংখ্যা ১ হাজার ২৫৪। সেই তালিকাসহ অন্যান্য অপরাধীর তালিকা ধরে গত ১ মে থেকে সারা দেশে শুরু হয়েছে পুলিশের বিশেষ অভিযান। এই অভিযানে গতকাল বুধবার পর্যন্ত সারা দেশে চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারী, ডাকাত, মাদক কারবারিসহ ১৮ হাজার ৩২৮ অপরাধীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, গ্রেপ্তার ১৮ হাজার ৩২৮ অপরাধীর মধ্যে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী, পরিকল্পনাকারী ও সহযোগী ১ হাজার ৯৫৮ জন, অবৈধ অস্ত্রধারী ৩৩১ জন, মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারি ১৩ হাজার ২০ জন, ছিনতাইকারী, দস্যু ও ডাকাত ২ হাজার ২১১ জন এবং ৮০৮ জন চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী রয়েছে।
এদিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) এন এম নাসিরুদ্দিন জানান, বিশেষ অভিযানে গতকাল বুধবার পর্যন্ত ডিএমপিতে ৩ হাজার ৩৫৭ জন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজ ২১৫ জন, তালিকাবহির্ভূত চাঁদাবাজ ৪৬৭ জন, সন্ত্রাসী, দস্যু, ছিনতাইকারী ও ডাকাত গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১ হাজার ১৪৮ জন। এ ছাড়া ১ হাজার ৫২৭ জন মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সদর দপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, এই বিশেষ অভিযান শুরুর পর থেকে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা লক্ষ করেন, অপরাধীদের তালিকার বাইরেও আরও বহু অপরাধী বিভিন্ন এলাকায় তৎপর রয়েছে। এরা দিনের পর দিন নানা অপরাধে জড়িত থাকলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তালিকায় তাদের নাম ওঠেনি। এসব বিষয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নজরে আসার পর তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও সংঘবদ্ধ অপরাধীদের নতুন তালিকা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গোপনীয়তার সঙ্গে সারা দেশে চলতি মাসের শুরু থেকে অপরাধীদের তালিকা প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। তিনি জানান, এই তালিকায় শুধু অপরাধী নয়, তাদের সহযোগী, অর্থদাতা, আশ্রয়দাতা এবং ঘনিষ্ঠ নেটওয়ার্ক সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অপরাধীদের জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক নজরদারি, আর্থিক লেনদেন পর্যবেক্ষণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত জোরদারের বিষয়েও আলোচনা চলছে।
আরেক পুলিশ কর্মকর্তার ভাষ্য, এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ পুরোনো শীর্ষ সন্ত্রাসীরা নয়; বরং তালিকার বাইরে থাকা নতুন প্রজন্মের অপরাধীরা। তিনি বলেন, দুই দশক আগে রাজধানীর অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করত কয়েকটি আলোচিত সন্ত্রাসী গ্রুপ। ধারাবাহিক অভিযান, গ্রেপ্তার, বিচার এবং রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কারণে তাদের অনেকেই নিষ্ক্রিয়। কেউ কারাগারে, কেউ দেশছাড়া। তারা আগে যেসব এলাকা নিয়ন্ত্রণ করত, সেসব এলাকা এখন অপরাধশূন্য বলা যাবে না। অপরাধ জগতে কখনোই শূন্যস্থান থাকে না।
সাবেক এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, একজন সন্ত্রাসী হারিয়ে গেলে তার জায়গা নিতে অপেক্ষা করে আরও অনেকেই। এখন সেটাই ঘটছে। আগে অপরাধী চক্র ছিল ব্যক্তিনির্ভর। এখন তা নেটওয়ার্কনির্ভর। ফলে একজন গ্রেপ্তার হলেও পুরো চক্র ভেঙে পড়ে না।
মাঠ পর্যায়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমান সময়ে অপরাধী গোষ্ঠীগুলো অনেক বেশি বিচ্ছিন্ন ও বিকেন্দ্রীভূত। তারা প্রয়োজন অনুযায়ী ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে কাজ করে। কখনো কিশোর গ্যাং, কখনো মাদক সিন্ডিকেট, কখনো চাঁদাবাজ চক্র কিংবা জমি দখলকারী বাহিনী হিসেবে সক্রিয় হয়। তারা বলছেন, বর্তমানে নতুন অপরাধী তৈরির সবচেয়ে বড় চারটি উৎস হলোÑ কিশোর গ্যাং, মাদক ব্যবসা, স্থানীয় আধিপত্যের রাজনীতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক নেটওয়ার্ক।
সম্প্রতি মোহাম্মদপুরের পাটালী গ্রুপের সদস্য রফিক জানায়, চার-পাঁচ বছর আগে টিকটক করতে গিয়ে তারা প্রথমে তিনজনের একটি গ্রুপ তৈরি করে। এই গ্রুপে যুক্ত হয় আরও দুই বন্ধু। পাঁচজন মিলে তারা টিকটক ভিডিও করত। একপর্যায়ে পাটালী হাসানের সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়। এরপর প্রভাবের প্রলোভনে পড়ে তারা পাটালী গ্রুপে জড়িয়ে যায়।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে এবং গ্যাং সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কিশোর-তরুণেরা প্রথমে মোটরসাইকেল গ্রুপ, টিকটকভিত্তিক বন্ধুমহল কিংবা স্থানীয় প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে সংগঠিত হয়। পরে তারা গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে মাদক পরিবহন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি কিংবা ভাড়াটে সন্ত্রাসী কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়ে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক বছরে সংঘবদ্ধ অপরাধের যে নতুন ধারা তৈরি হয়েছে, তার বড় অংশের শিকড় কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির মধ্যে। অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, কিশোর গ্যাং এখন আর কেবল বখাটে তরুণদের আড্ডা নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি সংঘবদ্ধ অপরাধের প্রাথমিক প্রশিক্ষণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমান সময়ের সবচেয়ে জটিল চ্যালেঞ্জ হলো ভাসমান অপরাধী। এদের অনেকের কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই। আজ ঢাকায়, কাল গাজীপুরে, পরশু নারায়ণগঞ্জে কিংবা চট্টগ্রামে। অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত এলাকা পরিবর্তন করাই তাদের প্রধান কৌশল। এখনই এসব অপরাধীর লাগাম টানা না গেলে দিনে দিনে তারা আইনশৃঙ্খলার জন্য বিষফোঁড়ায় পরিণত হবে।
ডিএমপির মিরপুর জোনের মাঠ পর্যায়ের একজন পুলিশ কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, চিহ্নিত সন্ত্রাসীকে ট্র্যাক করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু ভাসমান অপরাধীকে শনাক্ত করা সবচেয়ে কঠিন। অনেকের নামে মামলা নেই, আবার কেউ ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে। কিছু বস্তি, কলোনি, নির্মাণশ্রমিক আবাসন এবং অস্থায়ী বসতিÑ এসব অপরাধীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বস্তি অপরাধের উৎস নয়। লাখ লাখ মানুষ সেখানে সৎভাবে জীবনযাপন করে। কিন্তু কিছু অপরাধী পরিচয় গোপন করার সুবিধা নিতে এসব এলাকাকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে।
অপরাধ বিশ্লেষকেরা বলছেন, অপরাধের চরিত্রে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে প্রযুক্তির ব্যবহারে। আগে চাঁদাবাজি বা হুমকি-ধমকি সরাসরি দেওয়া হতো। এখন অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ ও ভার্চুয়াল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে অপরাধ পরিচালিত হচ্ছে। অনলাইন ব্ল্যাকমেইল, ফেসবুকভিত্তিক চাঁদাবাজি, মোবাইল ব্যাংকিং জালিয়াতি এবং ডিজিটাল প্রতারণার ঘটনা দ্রুত বাড়ছে।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, অপরাধী হয়তো রাজধানীতে নেই। কিন্তু দেশের অন্য প্রান্তে বসে পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে। ফলে অপরাধ দমনের প্রচলিত পদ্ধতি অনেক ক্ষেত্রে কার্যকারিতা হারাচ্ছে। তিনি বলেন, আধুনিক অপরাধ দমনে শুধু অস্ত্র উদ্ধার যথেষ্ট নয়। অপরাধীর আর্থিক নেটওয়ার্ক, ব্যাংক হিসাব, মোবাইল সিম, সম্পদ ও যোগাযোগব্যবস্থা নজরদারিতে আনতে হবে।
জানা গেছে, শুধু রাজধানী কিংবা শহরকেন্দ্রিক নয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এখন সীমান্তবর্তী জেলা এবং নদীপথেও। মাদক, অস্ত্র, মানব পাচার ও চোরাচালানকে কেন্দ্র করে সীমান্ত এলাকায় নতুন অপরাধী চক্র গড়ে উঠছে। এসব চক্রের সঙ্গে স্থানীয় সন্ত্রাসী, মাদক কারবারি ও চোরাকারবারিদের যোগসূত্রও তৈরি হচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধ এখন আর শুধু একটি থানার সমস্যা নয়; এটি আন্তঃজেলা, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে আন্তঃসীমান্ত নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
অপরাধ সমাজতত্ত্ববিদেরা বলছেন, শুধু অভিযান, গ্রেপ্তার কিংবা বন্দুকযুদ্ধ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বেকারত্ব, মাদকাসক্তি, শিক্ষাবিচ্ছিন্নতা, নগর দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার মতো কারণগুলো নতুন অপরাধী তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাদের মতে, কিশোর গ্যাং সদস্যদের জন্য কর্মসংস্থান, খেলাধুলা, শিক্ষা ও পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি না হলে নতুন অপরাধী তৈরি হওয়ার ধারা থামবে না। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দিনের লড়াই শুধু অস্ত্রের বিরুদ্ধে নয়; তথ্য, প্রযুক্তি ও অর্থপ্রবাহের বিরুদ্ধে।
জানা গেছে, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের নতুন তালিকা, আর্থিক নেটওয়ার্ক পর্যবেক্ষণ, এনআইডিভিত্তিক নজরদারি এবং প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তব্যবস্থার মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নতুন কৌশল গ্রহণ করছে সরকার। তবে বিশেষজ্ঞদের অভিমত, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে স্থায়ী সাফল্য আসবে না।
কারণ আজকের কিশোর গ্যাং সদস্যই আগামী দিনের সন্ত্রাসী হতে পারে। আজকের ভাসমান অপরাধীই আগামী দিনের সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের নেতা হয়ে উঠতে পারে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, অপরাধীদের গ্রেপ্তারে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপরাধীদের অপরাধী হিসেবে দেখেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অপরাধের সঙ্গে যুক্ত কেউই পার পাবে না।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, অপরাধ দমনে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করছে। অপরাধী যে-ই হোক, তার কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় বিবেচনা করা হবে না।

