জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রতীক হয়ে ওঠা বেগম রোকেয়া বিশ^বিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলার ৮০৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পেয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। অভিযোগের গুরুত্ব অনুযায়ী আনুপাতিক হারে সাজা দেওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম।
প্রধান কৌঁসুলি বলেছেন, পূর্ণাঙ্গ রায় আরও নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করে সাজা বৃদ্ধির প্রয়োজন হলে আপিল করা হবে। গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন কার্যালয়ে পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি পাওয়ার পর সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন আমিনুল।
রায়ের পর্যালোচনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা পূর্ণাঙ্গ জাজমেন্ট পেয়েছি ৮০৯ পৃষ্ঠার। সকাল থেকে যেটুকু সম্ভব হয়েছে, আমি এটা পড়েছি। প্রাথমিকভাবে আমার কাছে মনে হয়েছে অত্যন্ত জুডিসিয়াল মাইন্ড অ্যাপ্লাই করে ট্রাইব্যুনাল এই জাজমেন্টটা দিয়েছেন। ৩০ জন আসামি ছিল, ৩০ জনকেই তারা কনভিক্ট করেছেন, ৩০ জনকেই তারা সেন্টেন্স দিয়েছেন। আমাদের আইনে বলা আছে যে, মৃত্যুদ- অথবা অভিযোগের গুরুত্ব অনুযায়ী প্রোপোরশনেটলি তার শাস্তি হবে। আবু সাঈদ হত্যা মামলায় যাদের বিরুদ্ধে সরাসরি গুলির অভিযোগ ছিল, তাদের মৃত্যুদ- দিয়েছে এবং সেই গুলিতে যারা প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেছে, তাদের যাবজ্জীবন দিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যারা ইট-পাটকেল মেরেছে, লাঠিসোঁটা নিয়ে ধাওয়া করেছিল বা যাদের টোটাল পার্টিসিপেশন ছিল, অভিযোগের প্রোপোরশনেট হারে তাদেরও শাস্তি দিয়েছে। কেউ কিন্তু শাস্তির বাইরে যায় নাই।’
রায়ের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে এই মুহূর্তে দ্বিমতের সুযোগ দেখছেন না বলেও জানান প্রধান কৌঁসুলি। তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি যে এই জাজমেন্টটা সঠিক দিয়েছে এবং যেসব আলোচনা তারা করেছেন, আমরা সেই আলোচনার সঙ্গে এখন পর্যন্ত দ্বিমত পোষণ করার সুযোগ দেখছি না। তার পরেও আমরা দেখছি, আরও একটু মেটিকুলাসলি পর্যালোচনা করি। দেখার পরে কোনো কারণে কারো বিরুদ্ধে যদি আমাদের সাজা বাড়ানোর জন্য অথবা অন্য কোনো কারণে আমাদের আপিল করার প্রয়োজন হয়, তা হলে সাজা বৃদ্ধির জন্য আমরা আবেদন করব, আপিল করব। আর যদি প্রয়োজন না হয়, আপিল করার প্রয়োজন না থাকলে আপিল করব না।’
গত ৯ এপ্রিল আবু সাঈদ হত্যা মামলায় দুই পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদ- ও তিন কর্মকর্তাকে যাবজ্জীবন সাজা দেয় বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
রায়ে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত দুজন হলেনÑ এএসআই (সশস্ত্র) আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়।
যাবজ্জীবন সাজা পাওয়া তিনজন হলেনÑ তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, তাজহাট থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন ও এসআই বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধব। পৃথক ধারায় এ তিনজনের আরও ১০ বছরের সশ্রম কারাদ- হয়। বাকি ২৫ আসামির মধ্যে ৫ জনের ১০ বছরের সশ্রম কারাদ-, ৮ জনের পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদ- এবং ১১ জনের ৩ বছরের সাজা হয়। অপর একজনের হাজতবাসের সময়কে দ- হিসেবে গণ্য করা হয়। দ-িত ৩০ জনের মধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে ৬ জন কারাগারে আছেন, বাকি ২৪ জন পলাতক।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন বেরোবির ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। সেদিন দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা সাঈদকে পুলিশের গুলি করার ভিডিও সংবাদমাধ্যমে প্রচার হলে ছাত্র-জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এর ধারাবাহিকতায় ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান।
অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই অভ্যুত্থানে দমন-পীড়নের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করার উদ্যোগ নেওয়ার পর আবু সাঈদের মামলাটিও সেখানে আসে। তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ২৪ জুন ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলির কার্যালয়ে ৩০ জনের সম্পৃক্ততার প্রতিবেদন জমা দেন তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা। ওই বছরের ৬ আগস্ট ৩০ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এই মামলার বিচারকাজ শুরু করে ট্রাইব্যুনাল-২। প্রসিকিউশনের পক্ষে মোট ২৫ জনের জবানবন্দি এবং প্রত্যক্ষদর্শী বর্তমান সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে এই রায় দেওয়া হয়।

