সিলেটের বেসরকারি চিকিৎসা খাতে বিরাজ করছে চরম নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা। সেখানে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর একটি বড় অংশ চলছে কোনো বৈধ লাইসেন্স ছাড়াই। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান সরকারের নিয়মনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বছরের পর বছর ধরে লাইসেন্স নবায়ন না করে সাধারণ রোগীদের পকেট কাটছে এবং তাদের জীবনকে ঠেলে দিচ্ছে চরম ঝুঁকিতে।
সিলেটের স্বাস্থ্য বিভাগ এবং জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য মতে, জেলা ও মহানগরজুড়ে অন্তত ৩৬টি বেসরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সে গুরুতর ত্রুটি রয়েছে এবং তাদের কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চিহ্নিত এই অবৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সিলেট মহানগরীর কেন্দ্রস্থলেই রয়েছে ১০টি প্রতিষ্ঠান। বাকি ২৬টি জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এর মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠানেরই লাইসেন্সের আবেদন নামঞ্জুর বা স্থগিত করা হয়েছে। এর বাইরেও গত মার্চের শেষ দিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেশব্যাপী বিশেষ তদারকি অভিযানে সিলেট বিভাগে আরও ৮টি সম্পূর্ণ অবৈধ ও অনুমোদনহীন স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানের খোঁজ মেলে, যা এই অঞ্চলের চিকিৎসাসেবার প্রকৃত ও উদ্বেগজনক চিত্রটি সামনে এনেছে।
সম্প্রতি সিভিল সার্জন কার্যালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যৌথ টাস্কফোর্স সিলেটের বেশ কিছু নামি ও সুপরিচিত স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে ঝটিকা অভিযান চালালে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসে। এই অভিযানে দীর্ঘদিন ধরে, অর্থাৎ ২০১৯ সাল থেকে দীর্ঘ ৭ বছর ধরে লাইসেন্স নবায়ন না থাকা এবং অত্যন্ত নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে নবাব রোডের ঐতিহ্যবাহী ‘নিরাময় পলি ক্লিনিক’-এর কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ ও সিলগালা করে দেওয়া হয়। তদন্তে দেখা গেছে, এই ক্লিনিকে চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত নিবন্ধিত চিকিৎসক বা ডিপ্লোমা নার্স ছিল না। এমনকি তাদের অপারেশন থিয়েটারটির (ওটি) পরিবেশও ছিল মান্ধাতা আমলের ও ঝুঁকিপূর্ণ। একই অভিযানে লাইসেন্সবিহীন ও নবায়নহীন অবস্থায় সম্পূর্ণ অবৈধভাবে প্যাথলজি ল্যাব পরিচালনা করায় রিকাবীবাজার স্টেডিয়াম মার্কেট এলাকার ৫টি বড় বড় ডায়াগনস্টিক সেন্টার যথাক্রমেÑ আল আমিন ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ল্যাব ডি নোভা, অ্যাপোলো ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ডক্টরস ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং পারফেক্ট ডিজিটাল ল্যাব সিলগালা ও বন্ধ করে দেয় প্রশাসন। তবে প্রশাসনের এই কঠোর অভিযানের খবর পেয়ে সে সময় ল্যাবের কাগজপত্র ও বৈধতা না থাকায় ‘দি মেডি হেলথ ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ ও ‘শাহজালাল প্যাথলজি সেন্টার’সহ বেশ কয়েকটি সেন্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তিরা মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে পালিয়ে যান, যাদের বর্তমানে স্বাস্থ্য বিভাগের বিশেষ নজরদারিতে আনা হয়েছে।
বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের এই নৈরাজ্য দমনে প্রশাসনের কঠোর অবস্থান ও নিয়মিত মোবাইল কোর্টের ধারাবাহিকতায় গত ৩ জুন সিলেট মহানগরীর দরগা মহল্লা ও মাজার সংলগ্ন এলাকায় সিভিল সার্জন অফিস এবং জেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে আরেকটি বড় ধরনের মোবাইল কোর্ট অভিযান পরিচালিত হয়। এ অভিযানে দরগা মহল্লা এলাকার ‘মহানগর হাসপাতাল’-এর সরকারি কোনো বৈধ লাইসেন্স পাওয়া যায়নি এবং হাসপাতালটিতে অত্যন্ত নিম্নমানের ও অনিরাপদ সেবা প্রদানসহ সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ মেলায় প্রতিষ্ঠানটিকে তাৎক্ষণিকভাবে ১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই অভিযানে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানাও করা হয়। এ ছাড়া পাইওনিয়ার হাসপাতাল ও কয়েকটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে ভবিষ্যতে শতভাগ বিধি-বিধান ও লাইসেন্সের শর্ত মেনে সেবা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানায়, সিলেটের এই অবৈধ ও ত্রুটিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত তিনভাবে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিল। প্রথমত, অনেক নামি হাসপাতাল ৫-৬ বছর ধরে লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই পার পেয়ে আসছিল; দ্বিতীয়ত, কোনো নিবন্ধিত বা গ্র্যাজুয়েট ডাক্তার ছাড়াই অদক্ষ ও অনভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান দিয়ে এক্স-রে কিংবা স্পর্শকাতর প্যাথলজি পরীক্ষা করানো হচ্ছিল, এতে ভুল রিপোর্টের কারণে ভুল চিকিৎসার শিকার হচ্ছেন রোগীরা; এবং তৃতীয়ত, তাদের অপারেশন থিয়েটারগুলোর (ওটি) পরিবেশ ছিল অত্যন্ত নোংরা এবং সেখানে জরুরি লাইফ সাপোর্ট বা অক্সিজেন ব্যাকআপের কোনো আধুনিক ব্যবস্থাই ছিল না।
সিলেটের সামগ্রিক চিকিৎসাসেবার এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি, ল্যাবগুলোর অনিয়ম এবং চলমান কঠোর আইনি পদক্ষেপ প্রসঙ্গে সিলেট জেলার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, কয়েকটি হাসপাতাল এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টার নিয়মনীতি অনুসরণ না করে সেবার নামে ব্যবসা করছে। আমরা সেগুলোকে একটি নিয়ম ও শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করছি। তিনি বলেন, জনস্বার্থে স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিতকরণ, চিকিৎসায় যেকোনো ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধ এবং নিরীহ মানুষের নিরাপদ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে আমাদের বিশেষ যৌথ অভিযান ও মোবাইল কোর্ট ভবিষ্যতেও কঠোরভাবে অব্যাহত থাকবে। সিলেটের মাটিতে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোকে অবশ্যই শতভাগ বিধি-বিধান মেনে, দক্ষ জনবল নিশ্চিত করে এবং বৈধ লাইসেন্স সচল রেখে চিকিৎসাসেবা দিতে হবে, মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য নিয়ে কাউকে বিন্দুমাত্র ছিনিমিনি খেলতে দেওয়া হবে না। তবে অভিযানের পর অনেক প্রতিষ্ঠান জরিমানা দিয়ে বা সরকারি শর্ত পূরণ করে পুনরায় লাইসেন্সের জন্য নতুনভাবে আবেদন করেন, ফলে এই কালো তালিকাটি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত ও হালনাগাদ হয়। চিকিৎসাপ্রত্যাশী সাধারণ মানুষের প্রতি আমাদের বিনীত অনুরোধ থাকবে, যেকোনো বেসরকারি হাসপাতালে ও ল্যাবে চিকিৎসা বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে যাওয়ার আগে সেটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) অনুমোদিত কি না, তা সচেতন নাগরিক হিসেবে নিজে থেকে যাচাই করে নিন।

