দেশের যোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে নতুন এক মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, দ্বিতীয় যমুনা সেতু, ঢাকা-চট্টগ্রাম উড়াল মহাসড়ক, রাজধানীতে সাবওয়ে, নতুন এক্সপ্রেসওয়ে এবং রেলওয়ের একাধিক বড় প্রকল্পসহ প্রায় ২০টি মেগা প্রকল্পে চীনা অর্থায়ন নিশ্চিত করতে জোরালো কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরকে কেন্দ্র করে এসব প্রকল্পের অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই হতে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম দ্বিপক্ষীয় বিদেশ সফর। সরকারি সূত্র জানিয়েছে, আগামী ২১ ও ২২ জুন মালয়েশিয়া সফর শেষে তিনি চীন সফরে যাবেন। সফরকালে অবকাঠামো, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং যোগাযোগ খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা হবে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর মোট ব্যয় কয়েক লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। যদিও সব প্রকল্পে এক সঙ্গে অর্থায়ন পাওয়া বাস্তবসম্মত নয়, তবে সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকার ও জাতীয় অর্থনীতিতে প্রভাব বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
কেন্দ্রবিন্দুতে দ্বিতীয় পদ্মা ও দ্বিতীয় যমুনা সেতু : চীনা অর্থায়নের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণ প্রকল্প। উত্তরাঞ্চল ও রাজধানীর মধ্যে যোগাযোগ সহজ করা এবং ভবিষ্যৎ যানবাহনের চাপ মোকাবিলার লক্ষ্যে নতুন এই সেতুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ব্যবহৃত যমুনা সেতু দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২৩ হাজারের বেশি যানবাহন চলাচল করে। ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবের সময়ে এ সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়, ফলে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। দ্বিতীয় যমুনা সেতুর জন্য কয়েকটি সম্ভাব্য অ্যালাইনমেন্ট নিয়ে সমীক্ষা চলছে। এর মধ্যে গাইবান্ধার বালাসীঘাট থেকে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ পর্যন্ত রুটটি বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। এ ছাড়া বগুড়ার সারিয়াকান্দি ও জামালপুরের মাদারগঞ্জ সংযোগকারী পথও বিবেচনায় রয়েছে।
একই সঙ্গে আলোচনায় রয়েছে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণ। মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ও রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ার মধ্যে নতুন সেতু নির্মাণের প্রস্তাব দীর্ঘদিনের। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ আরও গতিশীল করতে এবং বিদ্যমান পদ্মা সেতুর ওপর ভবিষ্যতের চাপ কমাতে নতুন এই সেতু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডরে নতুন পরিকল্পনা : দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত সড়ক করিডর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নতুন যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। এই রুটে প্রতিদিন ৩০ হাজারের বেশি যানবাহন চলাচল করে। শিল্প, বাণিজ্য এবং দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে রাজধানীর সংযোগের কারণে মহাসড়কটির কৌশলগত গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।
সেতু বিভাগ ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যে একটি উড়াল মহাসড়ক নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যদিকে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর বিদ্যমান চার লেন মহাসড়ককে ১০ লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। সরকার এখন দুটি বিকল্পের অর্থনৈতিক ও কারিগরি সম্ভাব্যতা বিবেচনা করছে।
যানজট নিরসনে সাবওয়ে ও নতুন এক্সপ্রেসওয়ে : রাজধানী ঢাকার ক্রমবর্ধমান যানজট মোকাবিলায় পাতাল রেল বা সাবওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনাও চীনা বিনিয়োগের তালিকায় রয়েছে। প্রাথমিক সমীক্ষা অনুযায়ী, ঢাকার ১১টি রুটে প্রায় ২৩৮ কিলোমিটার সাবওয়ে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রথম ধাপে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ করিডরে নির্মাণকাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া হেমায়েতপুর থেকে কেরানীগঞ্জ হয়ে নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দ পর্যন্ত একটি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের উদ্যোগও আলোচনায় রয়েছে। প্রায় ৩৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে ঢাকা শহরের ওপর যানবাহনের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রেলওয়ের পাঁচ বড় প্রকল্প : বাংলাদেশ রেলওয়েও চীনা অর্থায়নের জন্য পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প প্রস্তাব করেছে। এর মধ্যে রয়েছে আখাউড়া-সিলেট রেলপথকে মিশ্র গেজে রূপান্তর, জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ-জামালপুর করিডরে নতুন রেললাইন নির্মাণ, ২০০ মিটারগেজ কোচ সংগ্রহ এবং আধুনিক রেল ওয়ার্কশপ স্থাপন। রেলওয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন কোচ ও ইঞ্জিন সংগ্রহ করা গেলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন ট্রেন চালু করা এবং বিদ্যমান সেবার মান বাড়ানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ রেল করিডরগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
আরও সেতু ও কারিগরি সহযোগিতা : চীনা সহায়তায় নতুন বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু নির্মাণের প্রস্তাবও রয়েছে। পটুয়াখালীর বাউফল ও দুমকির মধ্যে লোহালিয়া নদীর ওপর এই সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন বড় নদীর ওপর নতুন সেতু নির্মাণ এবং এক্সপ্রেসওয়ে সম্প্রসারণে কারিগরি সহযোগিতা চাওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা-আশুলিয়া উড়াল সড়ক এবং ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণ ইতোমধ্যে দুই দেশের অবকাঠামোগত সহযোগিতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এবার সেই সহযোগিতাকে আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্য নিয়েই নতুন প্রকল্প তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অগ্রাধিকার নয়, অর্থনৈতিক কার্যকারিতা, পরিবহন চাহিদা এবং সমন্বিত পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দিতে হবে। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে চীনা বিনিয়োগ দেশের যোগাযোগব্যবস্থায় এক নতুন যুগের সূচনা করতে পারে।

