স্বাস্থ্য খাতে অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতার খেসারত দিচ্ছে বিএনপি সরকার। শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ থাকায় বিএনপি সরকারকে দায়িত্ব নিয়েই তীব্র হাম সংক্রমণে বিপর্যস্ত পরিস্থিতি সামলাতে হচ্ছে। শুধু টিকাদানে গাফিলতির কারণে ৩ মাসের ব্যবধানে হামে আক্রান্তের সংখ্যা পৌঁছে গেছে লাখের ঘরে। মৃত্যুও ৭০০ ছুঁই ছুঁই। এমন পরিস্থিতিতে বর্ষা শুরু হওয়ায় বাড়ছে ডেঙ্গুর সংক্রমণও। চলতি বছরের ৬ মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৫ হাজারের বেশি। এখন যদিও সরকার হাম নিয়ন্ত্রণে টিকাদান কর্মসূচি চালাচ্ছে দেশজুড়ে, কিন্তু ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে মশা নিধনে নেই কার্যকর কোনো উদ্যোগ। তাই হাম এবং ডেঙ্গু মোকাবিলায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এর ব্যর্থতায় স্বাস্থ্য খাতকে সামনে আরও দুর্ভোগ পোহাতে হতে পারে বলে মনে করেন তারা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য মতে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে গতকাল সোমবার পর্যন্ত সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে মোট ৫৯০টি শিশুর। একই সময়ে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে ৯৩ শিশুর প্রাণ গেছে। অর্থাৎ নিশ্চিত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে এ পর্যন্ত মোট ৬৮৩টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। যা আর কয়েক দিনের মধ্যে ৭০০-এর ঘরে পৌঁছার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। মৃত্যুসংখ্যা ৭০০-এর ঘরে থাকলেও হামে আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে লাখের ঘর। মাত্র ৩ মাসের ব্যবধানে দেশজুড়ে নিশ্চিত এবং সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত হয়েছে এক লাখ ৪ হাজার ৯২৬ জন। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে মোট ৭৭ হাজার ৭৪৩ জন রোগী।
একই রকমভাবে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ছাড়িয়েছে ৫ হাজারের বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন পাঁচ হাজার ৩৯ জন রোগী। এদের মধ্যে মারা গেছেন ১০ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় যারা ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, তাদের মধ্যে বরিশাল বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৪৬ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ১৪ জন, ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ১২ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) ১৬ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) ২১ জন, খুলনা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ১৬ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) একজন, রাজশাহী বিভাগে ৯ জন, রংপুর বিভাগে একজন ও সিলেট বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) তিনজন রয়েছেন। অর্থাৎ ডেঙ্গুর সংক্রমণ এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। ভরা মৌসুম শুরু হবে আগামী জুলাই মাস থেকে। তাই ডেঙ্গুবাহী এডিস মশা নিধনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার।
ড. কবিরুল বাশার রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘বৃষ্টিপাত, আর্দ্রতা, এডিস মশার ঘনত্ব, তাপমাত্রা ও ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা এই তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে ফোরকাস্টিং মডেল তৈরি করা হয়। এখন ভরা বর্ষা শুরু হয়েছে। কখনো থেমে থেমে, আবার কখনো অঝোর ধারায় বৃষ্টি হচ্ছে। ফলে বৃষ্টির পানি জমে থাকছে বিভিন্ন এলাকায়। এই সময়টা এডিস মশা প্রজননের উপযুক্ত সময়। এডিস মশার ঘনত্বও এখন বেশি। চলতি বছর মে থেকে ডেঙ্গু রোগী বাড়ছিল, যেটি আমরা কমাতে পারিনি। চলতি বছর ৫৪টি জেলায় ডেঙ্গু ছড়িয়েছে। কিন্তু জেলা পর্যায়ে মশা নিয়ন্ত্রণের কোনো কার্যক্রম নেই, জনবলও নেই। ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত যেকোনো রোগ নিয়ন্ত্রণে ন্যাশনাল ভেক্টর কন্ট্রোল সেল গঠন করা প্রয়োজন। এ রকম জাতীয় প্রতিষ্ঠান যত দিন না হবে, তত দিন মশাবাহিত রোগ মোকাবিলা কঠিন হবে। তবে সবচেয়ে বেশি যেটা প্রয়োজন সেটা হচ্ছে মশা মারা। এডিস মশার প্রজননস্থল পুরোপুরি ধ্বংস করা না গেলে কোনোভাবেই ডেঙ্গুর সংক্রমণ কমানো যাবে না। এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনগুলো যেভাবে মশা নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তা একেবারেই অপ্রতুল। যদিও অভিজাত এলাকা বলে পরিচিত উত্তর সিটির কিছু কিছু এলাকায় মশা নিধনের তৎপরতা চোখে পড়লেও অন্য সব এলাকায় তা নগণ্য। ডেঙ্গু একসঙ্গে সব নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না। কিন্তু এডিস মশা এবং ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সারা বছরই কাজ করতে হবে। জমে থাকা পানি অপসারণ না করা হলে আবারও এডিস মশা জন্মাতে পারে।’ বছরব্যাপী মশক নিধন ব্যবস্থা চলমান না থাকলে মৌসুমে (জুন-সেপ্টেম্বর) পরিস্থিতি খারাপ হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এদিকে টিকা কার্যক্রম শুরুর তিন মাস পরও হামের সংক্রমণ এবং মৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে না। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞরাও। এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এম মুশতাক হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘এত দিনে সংক্রমণ কমে যাওয়ার কথা ছিল। কেন তা হচ্ছে না, বিষয়টি আরও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা দরকার। যারা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গেছে, তারা টিকা পেয়েছে। এখন ‘মাইক্রোপ্ল্যান’ করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে যেসব শিশু এখনো টিকা পায়নি, তাদের আওতায় আনতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘হাম নিয়ন্ত্রণে শুধু প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর নির্ভর করায় মৃত্যুহার কমছে না। আক্রান্ত শিশুদের শুরুতেই আইসোলেশনে রাখা, মাঝারি পর্যায়ে অক্সিজেনের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা এবং পুষ্টিসেবা জোরদার করা জরুরি। শুধু আইসিইউনির্ভর চিকিৎসা দিয়ে মৃত্যু কমানো যাবে না। রোগের শুরু থেকেই সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। আইসোলেশন, অক্সিজেন ও পুষ্টিÑ এই তিনটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যা সরকারের এখনই করতে হবে।’
তবে মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। হাম বা ডেঙ্গুর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে নেই সচেতনতামূলক কোনো কার্যক্রম। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘করোনার সময় আমরা মানুষের মধ্যে যতটা সচেতনতা দেখেছি হাম বা ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে তার সিকি ভাগও দেখছি না। কারো ঘরের মশা বা জমানো পানি তো সরকার শনাক্ত করে দিতে পারবে না বা কারো সন্তানের জ¦র উঠলে সে যদি চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়ে ঘরে অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলা করতে দেয়, তাহলে হামের সংক্রমণও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারকে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। টেলিভিশন, পত্র-পত্রিকা, লিফলেটের মাধ্যমে হাম এবং ডেঙ্গুর সংক্রমণ কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়, তা ব্যাপক প্রচার করা প্রয়োজন। ডেঙ্গুবাহী এডিস মশা নিধনে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে এটি নিধনে কাজে লাগাতে হবে।’
হামের সংক্রমণ এবং মৃত্যু ঠেকাতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা, রোগীদের সেবা নিশ্চিত করাসহ দালালের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। রুটিন ওয়ার্ক হিসেবে প্রতি সপ্তাহে বিভিন্ন হাসপাতাল পরিদর্শন করছি। হামের সঙ্গে ডেঙ্গু, নিউমোনিয়ার রোগীও পাচ্ছি। সরকার দ্রুত হামের টিকা দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে টিকার সুফল পেতে সময় লাগছে।
পরিস্থিতির অবনতি হলে বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘হাসপাতালের প্রয়োজনে যেকোনো যন্ত্রাংশ সরবরাহ করা হবে। যেসব হাসপাতালে ভেন্টিলেশন সংকট ছিল, সেই জায়গাগুলোতে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি।’
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হাম মোকাবিলার চেয়েও অধিক দক্ষতার সঙ্গে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে চায় সরকার। ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় সারা দেশে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, মশক নিধন কার্যক্রম এবং চিকিৎসাব্যবস্থার প্রস্তুতি জোরদার করা হচ্ছে। ডেঙ্গুরোগীদের চিকিৎসার জন্য বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে তাদের মোট শয্যার ১০ শতাংশ সংরক্ষণ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এসব রোগীর কাছ থেকে চিকিৎসকদের ভিজিট ফি নেওয়া হবে না। শুধু ওষুধ ও খাবারের খরচ বহন করতে হবে। এ ছাড়া ডেঙ্গুরোগীদের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পরীক্ষার ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।’
মন্ত্রী আরও জানান, সিটি করপোরেশনের প্রশাসকদের সঙ্গে বৈঠকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যাপক পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সারা দেশে সমন্বিত কার্যক্রম চালানো হবে। হাসপাতালগুলোকে পর্যাপ্ত ফ্লুইড ও স্যালাইন মজুত নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং তিন দিনের মধ্যে মজুত পরিস্থিতির হালনাগাদ তথ্য দিতে বলা হয়েছে। সরকার চেষ্টা করছে যেন ডেঙ্গু সংক্রমণ শূন্যের কোঠায় রাখা যায়।’

