ঢাকা বুধবার, ০১ জুলাই, ২০২৬

বনানীতে চিরনিদ্রায় শায়িত শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুলাই ১, ২০২৬, ০৪:০৭ এএম

বাংলাদেশের পাপেট আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব ও একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য চারুশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বনানী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৩টায় এই সব্যসাচী শিল্পীর দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে সকালে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করা হয়।

দীর্ঘদিন নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগে গত সোমবার ৯১ বছর বয়সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি শিল্পী। তার প্রয়াণে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সংস্কৃতিজনরা তার দীর্ঘ কর্মজীবনকে বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাসে এক অনন্য ও চিরস্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে অভিহিত করেন।

শহিদ মিনার ছাড়াও মুস্তাফা মনোয়ারের স্মৃতিবিজড়িত বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) প্রাঙ্গণ, চ্যানেল আই প্রাঙ্গণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ এবং চারুকলা অনুষদে তার জানাজা ও শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। বিটিভি ও চারুকলার শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্টজনরা এই গুণী শিল্পীর কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শেষ বিদায় জানান।

খ্যাতনামা কবি গোলাম মোস্তফার সন্তান মুস্তাফা মনোয়ার ১৯৩৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্রজীবন থেকেই ভাষা আন্দোলনসহ বিভিন্ন প্রগতিশীল আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন তিনি। কলকাতায় চারুকলার পাঠ শেষ করে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আমন্ত্রণে তিনি ঢাকায় শিক্ষকতা শুরু করেন এবং পরে টেলিভিশনে যোগ দিয়ে বৈরী সময়েও বাঙালি সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যান। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে টেলিভিশনে পাকিস্তানি পতাকা না দেখানোর ঐতিহাসিক কৌশলটির পেছনেও অন্যতম প্রধান ভূমিকা ছিল তার।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইতিহাসে মুস্তাফা মনোয়ারের অবদান ছিল এককথায় অতুলনীয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ ও শেক্সপিয়ারের নাটক অবলম্বনে ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’-এর মতো কালজয়ী নাট্যরূপ দিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক প্রশংসা কুড়িয়েছেন। এ ছাড়া শিশুদের প্রতিভা বিকাশের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’ এবং দ্বিতীয় সাফ গেমসের মাস্কট ‘মিশুক’ তার অন্যতম অনবদ্য সৃষ্টি। কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের পেছনের লাল রঙের সূর্যের প্রতিরূপটিও তারই তৈরি। তবে বাংলাদেশে পাপেট শিল্পকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি বিশেষভাবে সমাদৃত। মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী শিবিরের শিশুদের মনে আনন্দ জোগাতে তিনি পাপেট শো’র আয়োজন করেছিলেন এবং তার বিখ্যাত পাপেট চরিত্র ‘পারুল’-এর অনুপ্রেরণাতেই পরে ইউনিসেফের বিশ্বখ্যাত অ্যানিমেশন চরিত্র ‘মীনা’র জন্ম হয়। শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে একুশে পদকসহ বর্ণিল কর্মজীবনে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন এই মহান রূপকার।