ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬

দুই কোটি টাকা চাঁদা চেয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা

চট্টগ্রাম ব্যুরো
প্রকাশিত: জুলাই ১৪, ২০২৬, ০৬:১৮ এএম

চট্টগ্রাম নগরীতে চাঁদা চেয়ে ফোনে হুমকির পর একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। সে-সময় প্রতিষ্ঠান থেকে ৩৫ লাখ টাকা লুট করা হয় বলে দবি করেছেন প্রতিষ্ঠান-সংশ্লিষ্টরা। বিদেশি একটি নম্বর থেকে ফোন করে ‘ডেভিড ইমন’ পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানটির কাছে এককালীন দুই কোটি টাকা এবং পরবর্তী সময়ে প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা দিতে হবে বলে হুমকি দেন।

প্রাথমিক তদন্তে ঘটনাটির সঙ্গে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারীদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি কলরেকর্ড ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে নিজেদের পরিচয় দেওয়া ব্যক্তি চাঁদা না দিলে ব্যবসা করতে না দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন।

গতকাল সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নগরীর চকবাজার থানার চন্দনপুরা-বাকলিয়া এক্সেস সড়কে অবস্থিত ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ডট নেটের (ডিডিএন) কার্যালয়ে সশস্ত্র হামলা, ভাঙচুর ও নগদ অর্থ লুটের ঘটনা ঘটে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, হামলার আগে তাদের কাছে এককালীন দুই কোটি টাকা, পরবর্তী সময়ে মাসে ১০ লাখ টাকা করে চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করার পরই হামলার ঘটনা ঘটে।

ডিডিএনের মালিক আদিল বিন মামুন বলেন, ‘ঘটনার দুই দিন আগে বিদেশি একটি নম্বর থেকে ফোন করে নিজেকে ‘ডেভিড ইমন’ পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি তার সঙ্গে কথা বলেন। ফোনে ওই ব্যক্তি ব্যবসা পরিচালনা করতে হলে এককালীন দুই কোটি টাকা এবং পরবর্তী সময়ে প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা দিতে হবে বলে হুমকি দেন। তাদের প্রতিষ্ঠান এখন থেকে ওই চক্রের নিয়ন্ত্রণে চলবে বলেও জানানো হয়।’ চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পরই কার্যালয়ে হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ফোনে ওই ব্যক্তি নিজেকে এলাকায় পরিচিত একজন হিসেবে দাবি করেন এবং পুলিশ কমিশনারকে ছবি দেখালেই তাকে চিনতে পারবেন বলেও মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে নগরের কয়েকটি আলোচিত চাঁদাবাজি ও হামলার ঘটনারও উল্লেখ করে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয় বলে তিনি জানান।

প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক রিদোয়ানুল কবির বলেন, ‘অফিস চলাকালে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হঠাৎ কার্যালয়ে ঢুকে পড়ে। তারা কর্মীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অফিসের বিভিন্ন কক্ষ তছনছ করে। হামলাকারীরা কম্পিউটার, সার্ভার পরিচালনার সরঞ্জাম, মোবাইল ফোন, আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন মূল্যবান যন্ত্রপাতি ভাঙচুর করে।’ তার দাবি, কর্মচারীদের বেতন পরিশোধের জন্য অফিসে রাখা প্রায় ৩৫ লাখ টাকা হামলাকারীরা নিয়ে যায়। ভাঙচুরে আরও কয়েক লাখ টাকার যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও জানান তিনি।

ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, কয়েক ব্যক্তি হাতে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে অফিসে প্রবেশ করে একের পর এক কম্পিউটার, মনিটর ও অন্যান্য সরঞ্জাম ভাঙচুর করছেন। একজনকে কুড়ালসদৃশ অস্ত্র দিয়ে যন্ত্রপাতিতে আঘাত করতে দেখা যায়। পুরো ঘটনার সময় কর্মীদের আতঙ্কিত অবস্থায় অফিসের ভেতরে অবস্থান করতে দেখা যায়।

খবর পেয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুর হোসেন মামুন বলেন, ‘ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তে কাজ চলছে। সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।’

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, প্রাথমিক তদন্তে ঘটনার সঙ্গে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারীদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে রাজি হয়নি পুলিশ। পুলিশের তথ্যমতে, চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা দাবির একাধিক অভিযোগ এসেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, এসব ঘটনায় জড়িত সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে ডিডিএন কর্তৃপক্ষ। হামলার প্রকৃত কারণ, লুট হওয়া অর্থের পরিমাণ এবং জড়িতদের পরিচয় নিশ্চিত করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

ভাইরাল কলরেকর্ডে চাঁদার আলটিমেটাম : এদিকে ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ৭ মিনিট ৪০ সেকেন্ডের কলরেকর্ড ছড়িয়ে পড়ে। +৯৭১৫৬৮৬৩৮৩৮৫ নম্বর থেকে আসা ওই কলে ‘ডেভিড ইমন’ পরিচয় দেওয়া একজন ডিডিএনের মালিক আদিল বিন মামুনকে বলতে শোনা যায়, ‘এককালীন ২ কোটি টাকা দেবেন। আর প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা করে দেবেন। না হলে এখন থেকে আমার ছেলেরা ব্যবসা করবে।’

একই কলরেকর্ডে তিনি আরও বলেন, ‘আপনি আমার ডিটেইলস পুলিশ কমিশনার থেকে জিজ্ঞেস কইরেন। পুলিশ কমিশনারকে আমার নম্বরটা দেখাইয়েন, আপনি না চিনলে। ব্যবসা এখন থেকে আমরা করব। আপনারা করিয়েন না। স্মার্ট গ্রুপের মুজিপ্যার (মুজিবের) ঘরে তো কী হইছে এটা তো দেখছেন। মুজিপ্যা থেকে গিয়ে আমার কথা জিজ্ঞেস কইরেন।’

ফোনে ওই সন্ত্রাসী আরও বলেন, ‘সবাই আমাদের সঙ্গে সমন্বয় করে বিজনেস করতেছে। অক্সিজেন বলেন, হাটহাজারী বলেন, বায়েজিদ বলেন, মুরাদপুর বলেন, দুই নম্বর গেট বলেন সবাই আমাদের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবসা করতেছে।’ পাশাপাশি ডিডিএন মালিককে দুই দিনের সময় বেঁধে দিয়ে বলা হয়, ‘দুই দিনের মধ্যে ব্যবসাবাণিজ্য গোছায় ফেলবেন।’ কলরেকর্ডের শেষ দিকে ওই ব্যক্তি বলেন, ‘ব্যবসা যদি করতে চান, তা হলে ২ কোটি টাকা রেডি রাখবেন। আর প্রতি মাসে ১০ লাখ করে দিবেন। তা হলে চট্টগ্রাম শহরে ব্যবসা করতে পারবেন, নাইলে পারবেন না। আপনার বায়োডাটা সবকিছু আমার জানা আছে। দুই দিন পরে দেখবেন কী হয়।’

ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে সাত মামলা : পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ডেভিড ইমন ওরফে মোবারক হোসেন ইমন বাকলিয়া এলাকার আলোচিত জোড়া খুন ও ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলাসহ মোট সাতটি মামলার আসামি। ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর থেকে বড় সাজ্জাদের হয়ে চট্টগ্রামের অপরাধজগতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ডেভিড ইমন ও রাউজানের রায়হান।