ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত

হামলা-পাল্টা হামলায় বিপর্যস্ত মধ্যপ্রাচ্য

আরিয়ান স্ট্যালিন
প্রকাশিত: জুলাই ১৪, ২০২৬, ০৬:১৯ এএম

হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দীর্ঘদিনের উত্তেজনা নতুন করে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সাম্প্রতিক কয়েক দিনের পাল্টাপাল্টি সামরিক অভিযানে পুরো মধ্যপ্রাচ্য আবারও যুদ্ধের আশঙ্কায় কাঁপছে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা ইরানের উপকূলীয় সামরিক স্থাপনা, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন অবকাঠামোর ওপর ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে। অপরদিকে ইরান জানিয়েছে, এই হামলার জবাবে কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডানসহ উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।

হরমুজ ঘিরেই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু : বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি বর্তমানে এই সংঘাতের মূল কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে ইরান বারবার বাধা সৃষ্টি করছে এবং নৌপথকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। অন্যদিকে তেহরানের দাবি, তাদের জলসীমায় সন্দেহজনকভাবে চলাচলকারী জাহাজ আটকের ঘটনাকে অজুহাত বানিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সার্বভৌম ভূখ-ে হামলা চালিয়েছে। ফলে আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করেই পাল্টা সামরিক অভিযান শুরু করা হয়েছে।

উপসাগরীয় ঘাঁটিতে হামলার দাবি : ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, প্রথম ধাপে জর্ডানের প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটি, পরে বাহরাইনের শেখ ঈসা বিমানঘাঁটি এবং কুয়েতের আলি সালেম ও আহমাদ আল-জাবের ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, এসব অভিযানে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, জ্বালানি সংরক্ষণাগার, ড্রোন নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র, সামরিক অবকাঠামো ও গোলাবারুদের গুদাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমনকি কুয়েতে অবস্থিত একটি মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রঘাঁটিতে থাকা একাধিক আধুনিক রকেট উৎক্ষেপণব্যবস্থা ধ্বংস হওয়ারও দাবি করেছে তেহরান।

মার্কিন অভিযানের বিস্তার : যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, গত দুই দিনে ইরানের প্রায় ১৭০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। এসব অভিযানে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, উপকূলীয় রাডার, ড্রোন কেন্দ্র, ক্ষেপণাস্ত্রঘাঁটি, দ্রুতগতির নৌযান এবং সামরিক যোগাযোগব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, এর উদ্দেশ্য হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের নিরাপত্তা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা।

দাবি-প্রতিদাবির সত্যতা অনিশ্চিত : উভয় পক্ষ নিজেদের সামরিক সাফল্যের ব্যাপারে বড় বড় দাবি করলেও এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ইরান বহু মার্কিন স্থাপনা ধ্বংসের দাবি করলেও যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে সেই ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করেনি। একইভাবে মার্কিন হামলায় ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা বিধ্বস্ত হওয়ার দাবিও নিরপেক্ষভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে অধিকাংশ তথ্য সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

যুদ্ধবিরতি কার্যত ভঙ্গুর : দুই দেশের মধ্যে আগে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী সমঝোতা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করে, তবে তেহরানও আর কোনো সমঝোতা মেনে চলবে না। ইরানের ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতেও প্রতিপক্ষ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলে তারা একইভাবে নিজেদের অঙ্গীকার থেকে সরে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও সেই নীতি অনুসরণ করবে।

উপসাগরীয় অঞ্চলে বাড়ছে নিরাপত্তা উদ্বেগ : ইরানের পাল্টা হামলার পর কুয়েত, বাহরাইনসহ কয়েকটি দেশে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। কোথাও কোথাও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেলেও তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। বাহরাইনে সতর্কতামূলক সংকেত বাজানো এবং বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী : সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজারে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম চার শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। জ্বালানি বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হবে।

বিকল্প জ্বালানি পথের চিন্তা : এই সংকটের মধ্যেই হরমুজের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিকল্প জ্বালানি পরিবহনব্যবস্থা নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। ইরাক, সিরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র পুরোনো একটি তেল পাইপলাইন পুনরায় চালুর পরিকল্পনা করছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে হরমুজ এড়িয়ে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত তেল পরিবহনের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। যদিও এই প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় এবং বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন।

আঞ্চলিক সংঘাতের শঙ্কা : বর্তমান পরিস্থিতি শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। উপসাগরীয় দেশগুলো, আঞ্চলিক সামরিক ঘাঁটি, আন্তর্জাতিক নৌপথ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তাÑ সবই এখন এই সংঘাতের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে। সংঘর্ষ আরও বিস্তৃত হলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য নতুন এক বৃহৎ সামরিক সংকটে নিমজ্জিত হতে পারে। আন্তর্জাতিক মহল দ্রুত সংযম ও কূটনৈতিক আলোচনার আহ্বান জানালেও যুদ্ধের উত্তাপ এখনো প্রশমিত হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।