সন্ত্রাস দমন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং মাদকের বিষবাষ্প রোধে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষ সাঁড়াশি অভিযান চলছে। গত ১ মে থেকে ১২ জুলাইÑ টানা ৭২ দিনের এই ব্যাপক অভিযানে ১ লাখ ১৭ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, সমাজে অস্থিরতা তৈরিকারীদের দমন করতে এই অভিযান এক বড় মাইলফলক। তবে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল গ্রেপ্তারই কি দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ফেরাতে যথেষ্ট, নাকি এর পেছনে আরও গভীরে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে?
গতকাল সোমবার গণমাধ্যমে পাঠানো পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৭২ দিনের এই অভিযানে গ্রেপ্তারের সংখ্যাটি বেশ চাঞ্চল্যকর। এর মধ্যে বিশেষ অভিযানেই ধরা পড়েছে ৩২ হাজার ৯০৮ জন। পাশাপাশি সাধারণ ও নিয়মিত মামলার আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার হয়েছেন আরও ৮৩ হাজার ৮১৭ জন। অর্থাৎ, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ হাজার ৬২৫ জন অপরাধী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জালে ধরা পড়েছেন।
অভিযানের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারকে। এই অল্প সময়ে উদ্ধার করা হয়েছে ২৪৩টি আগ্নেয়াস্ত্র। এর মধ্যে পিস্তল, রিভলবার থেকে শুরু করে এসএমজি এবং রাইফেল পর্যন্ত রয়েছে। এ ছাড়া ১০ হাজার চকোলেট বাজি ও ৪৩টি ককটেলসহ বিপুল বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে বড় কোনো নাশকতার ছক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নস্যাৎ করেছে।
মাদক কারবারিদের নেটওয়ার্ক ভাঙতে পুলিশ এখন পর্যন্ত ১৪ হাজার ১৫৭টি মামলা করেছে এবং শুধু মাদক-সংক্রান্ত অপরাধেই গ্রেপ্তার করেছে ২০ হাজার ৪৩৯ জনকে। উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় ৭৬ লাখ ইয়াবা বড়ি, আট হাজার পুরিয়া হেরোইন এবং কয়েক হাজার বোতল ফেনসিডিল ও বিদেশি মদ। বিপুল পরিমাণ এই মাদকদ্রব্য প্রমাণ করে যে, সমাজে মাদকের বিস্তার কতটা গভীরে প্রোথিত।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই ব্যাপক তৎপরতাকে সাধুবাদ জানালেও, অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করছেন অভিযানের স্থায়ী প্রভাব নিয়ে। অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, পুলিশের অভিযানে অপরাধ কমছে ঠিকই, কিন্তু অপরাধের উৎসগুলো কি নির্মূল হয়েছে? যখন এত বড় পরিসরে গ্রেপ্তার করা হয়, তখন কারাগারের ওপর চাপ বাড়ে এবং বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় অনেক সময় আইনি প্রক্রিয়ার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা বেরিয়ে আসে। ফলে অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে, সাধারণ মানুষ স্বস্তি প্রকাশ করলেও তাদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্কও কাজ করছে। মিরপুরের এক বাসিন্দা বলেন, আমরা শান্তিতে বসবাস করতে চাই। পুলিশের এই অ্যাকশন যদি এলাকাগুলোতে অপরাধী সিন্ডিকেটগুলোর মেরুদ- ভেঙে দিতে পারে, তবেই এর সুফল সাধারণ মানুষ পাবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই অভিযান কোনো নির্দিষ্ট সময়কালের জন্য নয়, বরং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের এই তৎপরতা চলমান থাকবে। বিশেষ করে অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশের গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। অপরাধীদের রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে আইন প্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

