পুলিশের গুলির সামনে দুই হাত উঁচু করে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকের নাম আবু সাঈদ। ২০২৪-এর বিপ্লবে যার আত্মদান কাঁপিয়েছিল নগর-বন্দর থেকে রাজপথ, দেশ থেকে বিদেশ। মাঠে নেমেছিল ছাত্র-জনতা। মাত্র ৩৬ দিনের কোটা সংস্কার আন্দোলনে ভেঙে চুরমার হয় ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের ক্ষমতা। শুরু হয় নতুন এক বাংলাদেশের যাত্রা। ইতিহাসের পাতার ভাঁজে যার নামে লেখা হয়েছে নতুন এক গল্প। সেই আবু সাঈদের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তার নামের কয়েকটি ফলক দেখা গেলেও কোনো স্মৃতিস্তম্ভ বা স্মৃতির মিনার এখনো স্থাপিত হয়নি।
আবু সাঈদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ৩৬ দিন পর যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন কর্তৃপক্ষ এলো, তখন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এক হাজার ৯০ কোটি টাকার মেগা উন্নয়ন প্রকল্পের। এ প্রকল্পের আওতায় তোরণ, জাদুঘর, স্মৃতিস্তম্ভ ও স্ট্রিট মেমোরি স্ট্যাম্প নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলেন তৎকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন কর্তৃপক্ষ। সঙ্গে নেওয়া হয়েছিল আবু সাঈদের বাবা-মাকে। কিন্তু সেসব পরিকল্পনার কিছুই এখনো দৃশ্যমান নয়। বিশ্বময় আলোচিত সেই ঐতিহাসিক ঘটনার দুই বছর পেরিয়েও স্মৃতি ভুলতে পারেনি সহপাঠী, সহযোদ্ধা আর দেশবাসী। অথচ তারই বিশ্ববিদ্যালয় আগলে রাখেনি তাকে। দায়-দোহাইয়ে কেটেছে সময়, বেড়েছে ক্ষুব্ধতা।
যে স্থানে পুলিশ দাঁড়িয়ে আবু সাঈদকে লক্ষ্য করে গুলি করেছে, সেখানে দাঁড়িয়ে কথা হয় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শামসুর রহমান সুমনের সঙ্গে। তিনি জানান, এখানে হবে শহিদ আবু সাঈদ তোরণ এবং পেছনে শহিদ আবু সাঈদ জাদুঘর। শিক্ষার্থীরা যে পার্কের মোড় এই জায়গাটিকে শহিদ আবু সাঈদ চত্বর ঘোষণা করেছিল, সেখানে তার স্মৃতিস্তম্ভ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেটি সরকার কর্তৃক অনুমোদিত হলেও এখন পর্যন্ত তার কোনো দৃশ্যমান কাজ শুরু হয়নি।
তিনি আরও বলেন, দুই বছর পার হয়ে গেছে। সুতরাং আমরা চাই তাকে স্মরণীয় করে রাখতে এ কাজগুলো দ্রুত শুরু করা হোক এবং শহিদ আবু সাঈদ মনুমেন্টটি হওয়ার কথা ছিল, সেটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা হোক। আমরা মনে করি, এর মধ্য দিয়ে শহিদ আবু সাঈদকে এই প্রজন্ম যেমন ধারণ করবে, পরবর্তী প্রজন্মও তাকে ধারণ করবে।
ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী আশিকুর রহমান বলেন, শহিদ আবু সাঈদ ছিলেন জুলাইয়ের অগ্রনায়ক। অথচ আবু সাঈদ শহিদ হওয়ার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও তার ক্যাম্পাসে তার কোনো স্মৃতিফলক নেই, এটা অনেক দুঃখের। শুধু গতানুগতিক ধারার মতো আশার বাণী শুনে গেছি, কিন্তু বাস্তবায়ন নেই। বর্তমান নির্বাচিত সরকারের প্রতি আমাদের একটাই দাবি, তারা যেন অনতিবিলম্বে এগুলো কার্যকর করে এবং এসবের মাধ্যমে শহিদ আবু সাঈদ বেঁচে থাকুক, জুলাই বেঁচে থাকুক। আবু সাঈদ কী অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছে? মুছে যাবে তার স্মৃতি? এত দিনেও তাকে ঘিরে, তারই বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন প্রাতিষ্ঠানিক কোনো স্মৃতিচিহ্ন নেই, এমন প্রশ্ন এখানে বেড়াতে আসা সাধারণ মানুষদের।
রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বাবনপুর এলাকার জাফরপাড়া গ্রামে শহিদ আবু সাঈদের কবরের পাশে কথা হয় তার বাবা মকবুল হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমার ব্যাটাক (ছেলে) যারা সবার সামনে গুলি করি হত্যা করল, তার যে রায় দিল সেটা যেন দ্রুত কার্যকর হয়। এ পর্যন্ত মেলা দিন চলি গেইছে, বিচারের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে পাচ্ছি না। সরকারের কাছে দাবি, জীবিত থাকা অবস্থায় যেন আমার ছেলের বিচারের রায়টা কার্যকর হয়। মকবুল হোসেন বলেন, সরকারে কাছে কিছু চাওয়া-পাওয়া নেই। শুধু বলেছিলাম, ছেলের নামে একটা মসজিদ যেন বানায়।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে শহিদ আবু সাঈদের বাবা বলেন, রংপুরের মানুষ অবহেলিত। রিকশা চালানো ও গার্মেন্টে কাজ করার জন্য ঢাকায় যেতে হয়। আমি চাই রংপুরের মানুষের জন্য বড় বড় কলকারখানা চাই।
শহিদ আবু সাঈদের বড় ভাই রমজান আলী বলেন, আমার ছোট ভাই শহিদ আবু সাঈদের নামে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো স্মৃতিস্তম্ভ দেখতে পাচ্ছি না। যেগুলো প্রজেক্ট হাতে নেওয়া হচ্ছে, সেগুলো যেন দ্রুত বাস্তবায়ন করে সরকার। তিনি আরও বলেন, আবু সাঈদ হত্যা মামলার যে রায় হয়েছে, সেটি যেন দ্রুত বাস্তবায়ন করা হয়। বাবার স্বপ্ন ছিল তিনি বেঁচে থাকা অবস্থায় তার ছেলে হত্যার রায় যেন দেখে যেতে পারেন। তাহলে তার আত্মাটা শান্তি পাবে।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) ড. ফেরদৌস রহমান বলেন, আবু সাঈদ যে গেটের সামনে শহিদ হয়েছেন, সেই গেটের নাম ‘আবু সাঈদ’ নামে করার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে, শুধু কাজ শুরু হওয়া বাকি আছে। তিনি আরও বলেন, এক হাজার কোটি টাকার যে প্রজেক্টটা, সেখানে চারটি হল হবে, এর মধ্যে একটি হল আবু সাঈদের নামে থাকবে। আবু সাঈদের যে স্মৃতিস্তম্ভ করার কথা, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী নিজেই এসে সেটির স্থান পরিদর্শন করবেন। যেখানে স্মৃতিস্তম্ভটি হবে, সেখানে কিছু স্থাপনা রয়েছে, সেগুলো সরাতে হবে। জুলাই বিপ্লবের প্রথম শহিদের স্মৃতি সংরক্ষণের প্রকল্প বাস্তব রূপ না নেওয়ায় হতাশায় রয়েছেন আবু সাঈদের সতীর্থরা। ইতিহাস ও আত্মত্যাগের প্রতি গেল সরকারের রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্নও সামনে এনেছেন তারা।

