সরকারি নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজ জেলাতেই বহাল তবিয়তে পদায়ন নিয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী জাহানারা পারভীন। সরকারি বদলির আদেশ এবং প্রশাসনিক প্রজ্ঞাপনকে পাশ কাটিয়ে কীভাবে নিজ জেলায় পোস্টিং ধরে রাখা সম্ভব- তা নিয়ে প্রকৌশলী মহলে ও সাধারণ ঠিকাদারদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নানা গুঞ্জন। প্রশ্ন উঠেছে, এই কর্মকর্তার নেপথ্যে আসলে কার ইন্ধন রয়েছে। তার আসল খুঁটির জোর কোথায়?
অভিযোগ উঠেছে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে জাহানারা পারভীন এবং তার সিন্ডিকেটের দহরম মহরম সম্পর্ক রয়েছে। এ ছাড়া খোদ এলজিইডির চিফ ইঞ্জিনিয়ার নিজেই রূপালী বাংলাদেশের কাছে স্বীকার করেছেন এলজিআরডি মন্ত্রীর নির্দেশে তিনি জাহানারা পারভীনকে নিজ জেলা টাঙ্গাইলে বদলি করেছেন। এই খবর ছড়িয়ে পড়ায় সুশাসনের পক্ষের লোকজন বলছেন- এই বদলিতে খোদ মন্ত্রীর হাতেই রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষরিত মন্ত্রণালয় খুন হলো।
গত ২০ জুলাই দৈনিক রূপালী বাংলাদেশে ‘প্রজ্ঞাপন জারির দুই সপ্তাহেই প্রশ্নবিদ্ধ বদলি : এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী কীভাবে নিজের জেলায়’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ হয়। এরপর জাহানারা পারভীন বিভিন্ন মহলে দৌড়ঝাপ শুরু করেন। তিনি একটি নিউজ পোর্টালে প্রতিবাদ বিজ্ঞাপনের নামে নিজের সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জাহানারা পারভীন ও তার স্বামী মো. শামসুল বারী টাঙ্গাইলের মধুপুর জেলার রক্তিমপাড়া গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা। জাহানারা পারভীন গত বছরের ১৬ মে এলজিইডি টাঙ্গাইল জেলা কার্যালয়ে সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী পদে যোগদান করেন। সেই সময় তার স্বামী শামসুল বারী স্থানীয় বাসিন্দা হওয়ায় টাঙ্গাইলে নামে-বেনামে ঠিকাদারি ব্যবসা শুরু করেন। স্ত্রীর প্রভাব খাটিয়ে তিনি নানা সুযোগ-সুবিধা নেন বলে অভিযোগ আছে। এই সময় জাহানারা পারভীন ও তার স্বামীর সঙ্গে স্থানীয় একটি ঠিকাদার সিন্ডিকেটের দহরম মহরম সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ওই সময়ে জাহানারা পারভীনকে নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি হয়। পরবর্তীতে চলতি বছরের ১৪ মে সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে জাহানারা ঢাকায় এলজিইডি সদর দপ্তরে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসাবে যোগদান করেন। কিন্তু সেখানে দুই মাস পার হওয়ার আগেই তাকে নিজ জেলায় ফিরিয়ে নেওয়া হলো।
গত ২ জুলাই জারি করা স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, কোনো কর্মকর্তাকে নিজের কিংবা জীবনসঙ্গীর জেলায় পদায়ন করা যাবে না। উদ্দেশ্য একটাই, স্বজনপ্রীতি ও প্রভাবমুক্ত প্রশাসন নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই বিধিনিষেধ জারির দুই সপ্তাহ না পেরোতেই ১৬ জুলাই ব্যতিক্রমী এক পদায়ন ঘিরে তোলপাড় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। অভিযোগ উঠেছে, প্রভাবশালী মন্ত্রীর সুপারিশে নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) জাহানারা পারভীনকে তার নিজের এবং স্বামীর নিজ জেলা টাঙ্গাইলেই পদায়ন করা হয়েছে।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি প্রজ্ঞাপনের চেয়ে কি রাজনৈতিক প্রভাবই বেশি শক্তিশালী? এই পদায়ন নিয়ে বিতর্কের মধ্যে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন জানান, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের চেয়ে মন্ত্রীর সুপারিশের ভিত্তিতেই বদলির আদেশ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এলজিআরডি মন্ত্রীসহ দুই মন্ত্রীর সুপারিশ ছিল।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে আরও বিস্ময়কর তথ্য। অভিযোগ রয়েছে, টাঙ্গাইলে দায়িত্ব পালনকালে জাহানারা পারভীনকে ঘিরে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী ঠিকাদার চক্র গড়ে ওঠে। সেই সময় তার স্বামী মো. শামসুল বারীও স্থানীয়ভাবে ঠিকাদারি কার্যক্রমে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার ও কাজের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতেই প্রভাব খাটিয়ে তাকে আবারও টাঙ্গাইলে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। জাহানারা পারভীন টাঙ্গাইলে সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে ঘুষ দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে।
টাঙ্গাইলে কর্মরত থাকাকালে জাহানারা পারভীনের স্বামী স্থানীয় ঠিকাদারি কার্যক্রমে যুক্ত হন। অভিযোগ রয়েছে, তার মাধ্যমে একটি প্রভাবশালী ঠিকাদার সিন্ডিকেটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। স্থানীয় ঠিকাদারদের আশঙ্কা, এই প্রভাব ভবিষ্যতে টেন্ডার প্রক্রিয়া, কাজ বণ্টন এবং তদারকিতে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এখনো সম্ভব হয়নি। গত বছরের ২০ জুলাই একজন ঠিকাদার চিফ ইঞ্জিনিয়ার বরাবরে অভিযোগ করেন। অভিযোগে উল্লেখ করেন জাহানারা পারভীন কৌশলে ঠিকাদারদের ফাইল আটকিয়ে রেখে হয়রানি এবং পরবর্তীতে টাকা দাবি করেন। এলটিএম টেন্ডারে কোন ঠিকাদার কাজ পেলে তাকে অফিস খরচ বাবদ কাজের চুক্তি মূল্যের ১ পার্সেন্ট টাকা দিতে বাধ্য করেন। অন্যথায় তিনি ঠিকাদারের ফাইল বাতিল কিংবা ফাইল তার রুমে আটকে রাখেন।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, জাহানারার ভাই, স্বামী, ভাগিনাসহ নিকটাত্মীয়রা বিভিন্ন ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দিতে টাঙ্গাইল জেলার বিভিন্ন ঠিকাদারদের প্রলোভন দেখান এবং মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন। এদিকে গত ১৬ জুলাই নির্বাহী প্রকৌশলী পদে জাহানারা পারভীন টাঙ্গাইলে বদলি হওয়ার পরই তার পারিবারিক চক্র আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে টাঙ্গাইলের এক ঠিকাদার স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, এই পদায়ন সরকারি নীতিমালার পরিপন্থি এবং ভবিষ্যতে উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও স্বার্থের সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে জাহানারা পারভীন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আপনি আমার টাঙ্গাইলের অফিসে আসেন, তবেই কথা বলব। নতুবা কোন বিষয়ে আমি কথা বলতে চাই না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলজিইডির সদর দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা আক্ষেপ করে বলেন, যদি এভাবেই বদলির প্রজ্ঞাপন অমান্য করে নিজ জেলায় কর্মকর্তা বহাল থাকেন। তবে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বলতে আর কিছু থাকে না। এটি বদলি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার ওপর বড় ধরনের একটি আঘাত। প্রশ্ন উঠেছে, একটি সরকারি প্রজ্ঞাপন অমান্য করার পরেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেন কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না? কার ছায়াতলে থেকে এমন নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ড দিনের পর দিন চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সচেতন মহল ও সাধারণ ঠিকাদাররা। উন্নয়ন খাতের দুর্নীতি ও অনিয়ম রোধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির সঙ্গে এই ধরনের ঘটনা সরাসরি সাংঘর্ষিক। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, এলজিইডির এই নির্বাহী প্রকৌশলী এবং তার পেছনের সিন্ডিকেট চক্রের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হওয়া জরুরি। তা না হলে সরকারি দপ্তরে প্রজ্ঞাপনের গুরুত্ব ও আইনের শাসন মুখ থুবড়ে পড়বে।

