প্রতিদিন সকালে দাঁত মাজা আমাদের স্বাভাবিক অভ্যাস। কিন্তু এই পরিচ্ছন্নতার অংশ হিসেবে ব্যবহৃত টুথপেস্টে যদি অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকে, তবে তা কতটা উদ্বেগের? বিশ্বজুড়ে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। গবেষণায় বাতাস, পানি, খাবার, সামুদ্রিক মাছ, লবণ এমনকি মানুষের রক্ত, ফুসফুস ও অন্যান্য টিস্যুতেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। ফলে টুথপেস্টসহ দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্যেও এসব কণার উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
তবে এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই; প্রয়োজন সচেতনতা। অনুমোদিত ও বিশ্বস্ত প্রস্তুতকারকের টুথপেস্ট ব্যবহার করুন, উপাদান তালিকা পড়–ন, নকল বা সন্দেহজনক পণ্য এড়িয়ে চলুন, অতিরিক্ত টুথপেস্ট ব্যবহার করবেন না এবং দাঁত মাজার পর ভালোভাবে কুলি করুন। শিশুদের টুথপেস্ট গিলে ফেলা ঠেকানোও জরুরি। এ ছাড়া কোনো পণ্য ‘মাইক্রোপ্লাস্টিকমুক্ত’ দাবি করলে তার বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ বা সার্টিফিকেশন যাচাই করা উচিত।
মাইক্রোপ্লাস্টিক বলতে সাধারণত ৫ মিলিমিটারের কম আকারের প্লাস্টিক কণা বোঝায়; এর চেয়েও ছোট কণাকে বলা হয় ন্যানোপ্লাস্টিক। বড় প্লাস্টিক ভেঙে বা শিল্পকারখানায় বিশেষ উদ্দেশ্যে এসব কণা তৈরি হতে পারে। পরে এগুলো পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে খাবার, পানি ও বাতাসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।
টুথপেস্টের ক্ষেত্রে দাঁত মাজার পর অধিকাংশ মানুষ তা ফেলে দেন, তাই এতে থাকা সব কণা শরীরে প্রবেশ করবেÑ এমনটা নয়। তবে অল্প পরিমাণ টুথপেস্ট অনিচ্ছাকৃতভাবে গিলে ফেলা হতে পারে, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে। মুখের টিস্যুর মাধ্যমে কোনো উপাদান শোষিত হয় কি না, তা নিয়েও গবেষণা চলছে। মূল প্রশ্ন হলো, দীর্ঘদিন নিয়মিত মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শে থাকলে মানবদেহে এর প্রকৃত প্রভাব কতটা।
বর্তমান গবেষণায় কয়েকটি সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। প্রাণী ও পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণায় প্রদাহ বৃদ্ধি, অন্ত্রের উপকারী জীবাণুর ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, রাসায়নিক পদার্থ বহনের ঝুঁকি, হরমোনের কার্যক্রমে বিঘœ, প্রজননস্বাস্থ্যে সম্ভাব্য প্রভাব, শ্বাসতন্ত্রের ঝুঁকি এবং হৃদরোগের সঙ্গে সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে মানুষের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে টুথপেস্টে থাকা সম্ভাব্য মাইক্রোপ্লাস্টিক থেকে এসব ক্ষতি সরাসরি হয়Ñ এমন নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো নেই। কারণ, ফল সম্পর্ক নির্ধারণে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, মানুষের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের স্বাস্থ্যপ্রভাব সম্পর্কে এখনো বড় ধরনের জ্ঞানঘাটতি রয়েছে। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) প্লাস্টিক দূষণকে বৈশ্বিক পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক আছে কি না, তা শুধু লেবেল দেখে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়; এ জন্য উন্নত ল্যাবরেটরি বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
বর্তমানে ধারণা করা হয়, মানুষের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের প্রধান উৎস হলো খাবার, পানি ও বাতাস। টুথপেস্ট অতিরিক্ত কোনো উৎস হলে তার ঝুঁকি নির্ভর করবে কতটা কণা গিলে ফেলা হচ্ছে, কণার আকার, রাসায়নিক গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের ওপর। তাই নিরাপদ ও কার্যকর টুথপেস্ট ব্যবহারই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
বাংলাদেশে বাজারে বিক্রি হওয়া টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে নিয়মিত ও স্বাধীন গবেষণা প্রয়োজন। বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে আধুনিক পরীক্ষাগারে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিক পরীক্ষা করা, পাশাপাশি পণ্যের লেবেলে ব্যবহৃত সিনথেটিক পলিমার ও অন্যান্য উপাদানের তথ্য আরও স্বচ্ছভাবে প্রকাশ নিশ্চিত করা জরুরি।
পরিস্থিতি বিচারে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি এবং মানবস্বাস্থ্যের ওপর তার প্রকৃত প্রভাবÑ এই দুটি বিষয় আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। পরিবেশে মাইক্রোপ্লাস্টিকের বিস্তার ও মানুষের শরীরে এর প্রবেশ নিয়ে বৈজ্ঞানিক উদ্বেগ বাস্তব হলেও, টুথপেস্ট থেকে কতটা মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে যাচ্ছে এবং তা দীর্ঘমেয়াদে কতটা ক্ষতি করছেÑ এ বিষয়ে এখনো নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্ত নেই। তাই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন স্বাধীন গবেষণা, বাজার নজরদারি, স্বচ্ছ তথ্য এবং সচেতন ভোক্তা আচরণ।
ডা. জাকিয়া ফেরদৌসী খান
কমিউনিটি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও প্রভাষক, গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ঢাকা

