বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থীই শিক্ষকদের দ্বারা ফলাফল বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। শুধু তাই নয়, শিক্ষকের খারাপ আচরণের শিকার হতে হয়েছে ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থীকে। এর বাইরে ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে নানাভাবে বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের শিকার হতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় এবং চতুর্থ বর্ষে এসে তারা সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার হন, যা প্রায় ৪০ শতাংশ। বৈষম্যের এই প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও। প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী মানসিক প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হয়েছেন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আঁচল ফাউন্ডেশনের এক জরিপে উঠে এসেছে এসব চিত্র।
গতকাল শনিবার ভার্চুয়ালভাবে ‘বৈষম্যের শিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য’ শীর্ষক এই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদন প্রকাশের পর সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত বছর জুলাই আন্দোলনের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৈষম্যের সম্যক অবস্থা বুঝতে আঁচল ফাউন্ডেশন একটি জরিপ করে। ফাউন্ডেশনের রিসার্চ টিমের সদস্যরা গত মার্চ থেকে মে পর্যন্ত সারা দেশের ১ হাজার ১৭৩ জন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীর তথ্য নিয়ে জরিপটি করেন। জরিপে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫৬ শতাংশ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন ১৯ শতাংশ এবং ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়ছেন মেডিকেল কলেজে।
জরিপ অনুযায়ী, সহপাঠীরাই সবচেয়ে বেশি বৈষম্যমূলক আচরণ করেন, যা প্রায় ৫৮ শতাংশ। পরীক্ষায় ফলাফলের ক্ষেত্রে শিক্ষকের দ্বারা বৈষম্যের শিকার হয়েছেন প্রায় ৬০ শতাংশ। এ ছাড়া শিক্ষকের খারাপ আচরণের শিকার হতে হয়েছে ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থীকে। লিঙ্গভিত্তিক কারণে ৩০ শতাংশ এবং ধর্মীয় বৈষম্যের শিকার হয়েছেন ১৯ শতাংশ শিক্ষার্থী। শারীরিক অক্ষমতার কারণে ৭ শতাংশ এবং জাতিগত পার্থক্যের কারণে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী। এ ছাড়া অর্থনৈতিক কারণে প্রায় ২৩ শতাংশ, শারীরিক অবয়বের কারণে ২৯ শতাংশ এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে। বৈষম্যের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে দায়ী করেছেন ৩২ শতাংশ শিক্ষার্থী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের দায়ী করেছেন প্রায় ১৫ শতাংশ শিক্ষার্থী।
জরিপে আরও দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে, যা মোট হিসাবের ৬০ শতাংশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের হল বা ডরমিটরিতে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন ১৯ শতাংশ শিক্ষার্থী, ক্যাম্পাসের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ৩৭ শতাংশ এবং বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে আড্ডায় বৈষম্যের শিকার ৩৮ শতাংশ শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহনে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন প্রায় ১৮ শতাংশ শিক্ষার্থী। এর বাইরে লাইব্রেরি, ক্যাফে, পরীক্ষার হলেও বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে বিভিন্ন শিক্ষার্থীকে।
ক্যাম্পাসের বাইরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার ৩১ শতাংশ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে নারী শিক্ষার্থী ৪৮ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ এবং পুরুষ শিক্ষার্থী ৫০ দশমিক ৬৫ শতাংশ।
আঁচল ফাউন্ডেশন বলছে, বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হওয়ার পরে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব পড়েছে। বৈষম্যের শিকার শিক্ষার্থীদের ৯০ শতাংশই মানসিক প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হয়েছেন। তাদের মাঝে ৩৯ শতাংশ শিক্ষার্থী বলেছেন, এ ধরনের আচরণের প্রভাব তাদের ওপর গুরুতরভাবে পড়েছে, মোটামুটি প্রভাব পড়েছে বলে জানিয়েছেন ৫১ শতাংশ শিক্ষার্থী এবং ৬ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন কোনো প্রভাব পড়েনি।
শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, তাদের মাঝে মানসিক সমস্যার বিভিন্ন ধরনের লক্ষণ দেখা গেছে। ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থী বিষণœতার লক্ষণ অনুভব করছেন, উদ্বিগ্নতা অনুভব করেছেন ৪৯ শতাংশ, ঘুমের সমস্যা তৈরি হয়েছে ৩০ শতাংশের মাঝে। ২২ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেনÑ তাদের মধ্যে প্যানিক অ্যাটাকের তীব্রতা বেড়েছে, স্ট্রেস বা চাপ অনুভব করছেন ৪৭ শতাংশ। ৪৩ শতাংশ একাকিত্ব অনুভব করেছেন এবং ৪১ শতাংশ শিক্ষার্থী জানান, তারা হীনম্মন্যতায় ভুগছেন।
মানসিক সমস্যা তৈরি হওয়ার কারণে ক্লাস ও পড়াশোনার মনোযোগেও ব্যাঘাত ঘটছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। ২১ শতাংশ শিক্ষার্থী জানান, তারা ঠিকমতো ক্লাসে যোগ দিতে ব্যর্থ হন। ৫১ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, ক্লাসে অংশ নিতে পারলেও প্রায়ই পড়াশোনায় মনোযোগ থাকে না তাদের।
আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রস্তাব:
এই পরিপ্রেক্ষিতে সাতটি প্রস্তাবনা তুলে ধরেছে ফাউন্ডেশন। এগুলো হলোÑ শিক্ষার্থীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে মেন্টরিংয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করা, ছয় মাস পর পর শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং করা, বৈষম্য ও হয়রানি প্রতিরোধে মনিটরিং টিম গঠন ও কঠোর আইন প্রয়োগ, প্রতিটি বিভাগে অভিযোগ বাক্স রাখা ও নারী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা কমপ্লেইন সেল গঠন, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মাঝে সম্পর্ক তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা, উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থান দিকনির্দেশনায় ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং সেন্টার চালু এবং সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা।
সংবাদ সম্মেলনে ছিলেন বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক সাইকিয়াট্রিস্ট সায়েদুল ইসলাম সাঈদ, আইনজীবী হাবিবুর রহমান, আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তানসেন রোজ।