ঢাকা শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬

তারপর আর কথা হয়নি কোনোদিন

মান্নান নূর
প্রকাশিত: জুলাই ২৪, ২০২৬, ০৭:৪৭ এএম

না, আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারি না তাই। আজ অনেক কষ্ট করে বলছি।

-মা আসছে, এতটুকুই কথা, ফোন কেটে গেল। আর কথা হলো না সেতুর সঙ্গে। -আমাকে সেতু বলে ডাকবেন না।

-কেন?

-সেতু নামের মানে ভালো না।

-সেতু তো চমৎকার নাম। এ নামের সমস্যা কোথা থেকে এলো আবার।

-সমস্যা নয়, এ নামের অর্থটা ভালো না। আমার খুব ভয় হয়, এ নামের অর্থ যদি আমার জীবনকে তছনছ করে দেয়?

-কিভাবে?

-সেতু অর্থ হলোÑ নদী বা খালের দুই পাড়কে সংযুক্ত করা, যদি কখনো ভেঙে যায়? তাহলে আমার ভালোবাসার কী হবে? আমাকে সেতু বলে ডাকবেন না।

-আমি তো সেতু নামের মেয়েকে ভালোবেসেছি, অন্য নামের নয়। এ নাম রাতদিন আমার মনে ঘুরপাক খায়। কারো মুখ থেকে এ নাম শুনলেও হৃদয় প্রশান্তিতে ভরে ওঠে। হৃদয়ের প্রতিটি পরতে পরতে এ নাম লিখা। অন্য নামে তৃপ্তি পাব কেমনে?

-না, আমাকে নুসরাত বলে ডাকবেন। আমি চাই আমাদের জীবনে এমন কিছু না ঘটুক যা জীবনকে বিষে পরিণত করবে।

সেতু এ কথাগুলো বলে বরাবরের মতোই আমার দিকে অপলক চেয়ে থাকল। সেতুর এ রকম চাওয়ায় প্রকৃতির সবুজ চোখও বড় বড় করে থাকিয়ে দেখে আমাকে। মনের সমস্ত ক্লান্তি, হতাশা মুহূর্তে বিলীন হয়ে যায়। প্রকৃতি ও সেতুর কাছে আমি অবুজ বালক হয়ে যাই।

প্রেমে সমস্যা বারবার উঁকি দেয়। ‘বিচ্ছেদ’ প্রেমেতে কোনো বিষয়ই না। আমাদেরকেও এ সমস্যাগুলো ছাড়লো না। এখন আর প্রতিদিন সাক্ষাৎ হবে না। পরিবার বিষয়টি জেনে গেছে। তাকে শহরের স্কুলে ভর্তি করাবে শুনলাম। প্রচ- রোদেও আমার চোখে অন্ধকার নেমে এলো। সামনের গাছপালা, ধানের খেত, বিদ্যুতের লম্বা খুঁটি, হেলে পড়া আধমরা জাম্বুরা গাছটাও আস্তে আস্তে চোখের সামনে থেকে অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। এখন কি করব? তার সঙ্গে কথা বলব কিভাবে? সেদিন সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত নিশাচর হলাম। মাঝরাতে কুয়াশার সঙ্গে অনেকক্ষণ কাঁদলাম। কেটে গেল বেশ কিছুদিন। হঠাৎ একটা চিঠি এলো। চিঠিতে লেখা- আপনাকে কতদিন দেখি না, কথা বলতে পারি না! বুকের ভেতর কত কথা যে জমে আছে সেগুলো আপনাকে বলব কিভাবে?, না আদো বলা হবে কি না, জানি না। রাস্তায় আপনাকে একটি বার দেখার জন্য এদিক ওদিক তাকাই। পাই না। কিছু লিখে জানাব সে লোকও পাই না। আজ সোনিয়া আমাদের বাড়িতে এলে সাহস করে বললাম, আমার এই চিঠিটা আপনাকে দিতে। সে দিবে এ আত্মবিশ^াসটুকু আমার ছিল। আমার মাকে তো আপনি ভালো করেই চিনেন। মোবাইলে কথা বলার সাহস আমার নেই। আগামীকাল সকাল সাতটা ত্রিশ মিনিটে রাস্তায় থাকবেন, এ সময় আমি স্কুলে যাই। কথা না হোক দেখতে তো পাব! ইতি-আপনার নুসরাত।

নুসরাত নামটা দেখে মনের ভেতর হুহু করে উঠলো। সেতু নয় সে, নুসরাত। আমার নুসরাত সেতু...

দূর থেকে দেখতে পেতাম শুধু। তাও আবার স্কুলে যাবার সময় কিংবা স্কুল থেকে ফেরার পথে। কতদিন যে এভাবে কেটেছে হিসাব করাটা কঠিন। বিরহের দিনগুলো খুব লম্বা হয়। সেদিন শবে বরাত। মাগরিবের নামাজের পর সোনিয়া মোবাইলে কল করে বলল, একটু পর সেতুর সঙ্গে কথা বলবেন। আমি ব্যবস্থা করছি। এই এতটুকু মাত্র কথা, আমি যেন আবার নতুন জীবন লাভ করলাম। আমি হাঁটব না বসে থাকব, কাঁদব না হাসব, ঘরে থাকব না বাহিরে যাব বুঝে উঠতে পারছি না। হঠাৎ সোনিয়ার ফোন এলো।

-এই নিন কথা বলেন আপনার প্রিয়ার সঙ্গে। আমি কোনো কথা বলতে পারলাম না। অপর প্রান্ত থেকে আমার প্রাণের কণ্ঠ ভেসে এলো-

-আসসালামু আলাইকুম, কেমন আছেন? চিকন কণ্ঠে আমার জীবনের চাওয়া কথা বলে উঠলো। এই মাত্র আমার জীবনের চাঁদ উদিত হয়েছে। আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম আজ সত্যিই শবেবরাত। আমি খোদার কাছে আজ কি চাইব? সেতুকে? সে তো চাওয়ার নয়, আমার প্রাণ। অনেক আগেই খোদার কাছে বলে রেখেছি। আজ সারারাত শুধু সেতুকেই চাইব, আর কিছু না। বললাম, ভালো আছি, তুমি? ভালো আজ পর্যন্ত না। শুনলাম তার বিয়ে হয়ে গেছে। আমার একটা শূন্য আকাশ মাথার ওপর ঝুলে আছে। সেতুর কথাই সত্য হলো। সেতুটা ভেঙে গেছে। আর মেরামত করা যাবে না।