ঢাকা শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬

গ্রাম-বাংলার আত্মার ভাষ্যকার

মিনহাজুর রহমান নয়ন
প্রকাশিত: জুলাই ২৪, ২০২৬, ০৭:৪৮ এএম

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কিছু নাম কেবল লেখক হিসেবে নয়, এক একটি যুগের প্রতিনিধি হয়ে বেঁচে থাকে। তাদের কলমে ধরা পড়ে সময়, সমাজ, মানুষ এবং সভ্যতার পরিবর্তনের দীর্ঘ কাহিনি। কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় সেই বিরল সাহিত্যিকদের একজন। তিনি শুধু উপন্যাস লেখেননি; বাংলার মাটি, মানুষের জীবন, লোকবিশ্বাস, প্রকৃতি, সংগ্রাম এবং সংস্কৃতিকে এমন শিল্পরূপ দিয়েছেন, যা বাংলা সাহিত্যের সম্পদ হয়ে আজও সমান দীপ্তিতে জ্বলছে। ১৮৯৮ সালের ২৩ জুলাই, বীরভূম জেলার লাভপুর গ্রামের লালমাটির বুকে জন্ম নিয়েছিলেন তিনি। তখনকার গ্রাম-বাংলা ছিল প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিবিড় সহাবস্থানের এক বিস্ময়কর পৃথিবী। মাঠে কৃষকের লাঙল, নদীর ঘাটে জেলের জাল, হাটের কোলাহল, মেলার বাউল, সাঁওতাল পল্লির নৃত্য, শ্মশানের নীরবতা, উৎসবের ঢাক আর বর্ষার কাদামাটি এই সবকিছুই তার শৈশবকে গড়ে তুলেছিল। পরে সেই অভিজ্ঞতাই তার সাহিত্যের সবচেয়ে বড় সম্পদে পরিণত হয়।

তারাশঙ্করের রচনায় গ্রাম কখনো নিছক পটভূমি নয়; গ্রাম নিজেই একটি জীবন্ত চরিত্র। তিনি জানতেন, বাংলার প্রকৃত ইতিহাস শুধু রাজপ্রাসাদে লেখা হয় না, লেখা হয় খেতের আইলে, কাঁচা রাস্তার ধুলোয়, নদীর ভাঙনে, মানুষের হাসি-কান্নায়। তাই তার সাহিত্য পড়তে বসলে মনে হয়, শব্দের ভেতর দিয়ে এক বিস্তৃত গ্রাম-বাংলা আমাদের সামনে হাঁটতে শুরু করেছে। কৈশোর ও যৌবনে তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তাল সময়ের সাক্ষী হন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং কারাবরণও করেন। রাজনৈতিক জীবনের সেই অভিজ্ঞতা তাকে মানুষের বাস্তব জীবনকে আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, সমাজকে বদলে দেওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে সাহিত্য। তাই রাজনীতির পথ ছেড়ে তিনি সম্পূর্ণভাবে কলমকেই নিজের জীবনের ব্রত করে নেন।

মানুষ ছিল তার সাহিত্যের কেন্দ্র

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল মানুষের ভেতরের মানুষটিকে চিনে নেওয়ার ক্ষমতা। তিনি কোনো কল্পনার রাজ্য নির্মাণ করেননি; তার সাহিত্য জন্ম নিয়েছে বাস্তব জীবন থেকে। কৃষক, জেলে, কামার, কুমোর, কবিয়াল, জমিদার, সাঁওতাল, বৈরাগী কিংবা সমাজের প্রান্তিক মানুষ সবাই তার রচনায় সমান গুরুত্ব পেয়েছে।

তার কলমে মানুষের আনন্দ যেমন আছে, তেমনি আছে ক্ষুধা, বঞ্চনা, প্রেম, ঈর্ষা, ধর্মবিশ্বাস, সামাজিক সংঘাত এবং সময়ের নির্মম পরিবর্তনের ইতিহাস। তিনি দেখিয়েছেন, সাধারণ মানুষের জীবনও অসাধারণ সাহিত্যের বিষয় হতে পারে।

বাংলা কথাসাহিত্যে তার অবদান বিস্ময়কর। দুই শতাধিক গ্রন্থের রচয়িতা তারাশঙ্কর উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক ও প্রবন্ধ সব ক্ষেত্রেই নিজস্ব স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তার ‘গণদেবতা’ বাংলা উপন্যাসের এক অনন্য মাইলফলক, যেখানে গ্রামীণ সমাজের পরিবর্তন মহাকাব্যের বিস্তারে ফুটে উঠেছে। ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’-তে তিনি আঞ্চলিক জীবনের গভীর বাস্তবতা ও লোকসংস্কৃতিকে এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যা বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ‘কবি’, ‘আরোগ্য নিকেতন’, ‘ধাত্রীদেবতা’, ‘কালিন্দী’, ‘পঞ্চগ্রাম’সহ অসংখ্য রচনায় মানুষের অন্তর্জগৎ, সমাজের বিবর্তন এবং লোকজ ঐতিহ্যের অসাধারণ শিল্পরূপ দেখা যায়।

তার ভাষার বিশেষত্ব ছিল এর স্বাভাবিকতা। আঞ্চলিক শব্দ, লোকভাষা এবং কথ্য রীতিকে তিনি সাহিত্যের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ফলে তার রচনা পড়লে মনে হয়, চরিত্রগুলো যেন বইয়ের পাতা ছেড়ে আমাদের সামনে কথা বলছে। ভাষা তার কাছে কেবল প্রকাশের মাধ্যম ছিল না; ছিল মানুষের আত্মপরিচয়ের অংশ।

উত্তরাধিকার

সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান জ্ঞানপীঠ পুরস্কার লাভ করেন। এ ছাড়া তিনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, রবীন্দ্র পুরস্কার এবং ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান পদ্মভূষণ-এ ভূষিত হন। কিন্তু পুরস্কারের চেয়েও বড় ছিল পাঠকের ভালোবাসা। কারণ তিনি এমন মানুষের গল্প লিখেছিলেন, যাদের কথা সাহিত্য দীর্ঘদিন উপেক্ষা করেছিল।

১৯৭১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর তার জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু একজন সত্যিকারের সাহিত্যিকের মৃত্যু কেবল শরীরের; তার সৃষ্টি সময়ের সীমানা অতিক্রম করে বেঁচে থাকে। আজও যখন বাংলা সাহিত্যে গ্রাম, লোকজ সংস্কৃতি কিংবা মানুষের অন্তর্লোক নিয়ে আলোচনা হয়, তখন প্রথম সারিতেই উচ্চারিত হয় তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম।

তার জন্মের এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরে দাঁড়িয়েও তার সাহিত্য নতুন প্রজন্মকে আকর্ষণ করে। কারণ তিনি মানুষের চিরন্তন সত্যকে ধারণ করেছিলেন। প্রযুক্তি বদলেছে, সমাজ বদলেছে, জীবনযাত্রা বদলেছে; কিন্তু মানুষের ভালোবাসা, লোভ, স্বপ্ন, বেদনা, সংগ্রাম এবং শিকড়ের টান বদলায়নি। সেই চিরন্তন মানবজীবনের শিল্পরূপই তার সাহিত্যকে অমর করে রেখেছে। তার জন্মদিনে তাকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন ঔপন্যাসিককে শ্রদ্ধা জানানো নয়; বরং বাংলার মাটি, মানুষ, লোকঐতিহ্য ও মানবজীবনের সেই অনিঃশেষ কাব্যকে স্মরণ করা, যা তার কলমে নতুন জীবন পেয়েছিল। যতদিন বাংলা ভাষা থাকবে, যতদিন বাংলার মানুষ নিজেদের শিকড়ের গল্প শুনতে চাইবে, ততদিন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের সাহিত্যের আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে পথ দেখাবেন।