সমাজকল্যাণের নামে দুর্নীতির অভিযোগে প্রশ্নের মুখে বরগুনা জেলা সমাজসেবা অফিস। সরকারি অনুদান, রোগীদের সহায়তা ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে ঘুষবাণিজ্য ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে জেলা সমাজসেবা অফিসের শীর্ষ দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
বরগুনা জেলা সমাজসেবা অফিসের উপপরিচালক (ডিডি) মো. শহিদুল ইসলাম এবং সহকারী পরিচালক মো. ইউসুফ আলীর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ এনে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন বরগুনা সদর উপজেলার বাসিন্দা মো. সাইফুর রহমান।
অনুমোদনের নামে ঘুষ অভিযোগপত্রে বলা হয়, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও বেসরকারি এতিমখানার দুই বছর মেয়াদি কমিটি অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবে ঘুষ দাবি করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, কমিটি অনুমোদনের জন্য প্রতিষ্ঠান ভেদে ১০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে বাধ্য করা হয়।
অনুসন্ধানে কথা হয় একাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও এতিমখানার প্রতিনিধিদের সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানান, ঘুষ না দিলে ফাইল আটকে রাখা হয়। বারবার অফিসে ঘুরতে হয়। শেষ পর্যন্ত টাকা না দিলে অনুমোদন মেলে না।
রোগীর অনুদানেও কাটছাঁটের অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, কিডনি, ক্যানসার, লিভার সিরোসিসসহ জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি আর্থিক সহায়তা থেকেও ঘুষ নেওয়া হয়। প্রত্যেক রোগীর কাছ থেকে পাঁচ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
একজন ভুক্তভোগীর স্বজন বলেন, ‘রোগী বাঁচার জন্য অনুদান পেতে এসেছিল, সেখানে টাকা ছাড়া ফাইল নড়েনি। এটা অমানবিক।’
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো, নামে-বেনামে ভুয়া স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও অস্তিত্বহীন ব্যক্তির নামে সরকারি বরাদ্দ দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ। অভিযোগকারীর দাবি, এভাবে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি অর্থ লোপাট করা হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কিছু সংগঠনের অস্তিত্ব কাগজে থাকলেও বাস্তবে কোনো কার্যক্রম নেই। তবুও এসব প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ দেখানো হচ্ছে। আমতলী পৌরসভায় অবস্থিত একটি মাদ্রাসার কমিটির সাধারণ সম্পাদক জানান, কমিটি অনুমোদন নিতে গেলে খামে ভরে টাকা দিতে হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা খাম খুলে টাকা গুনে নেন। নির্ধারিত টাকা কম হলে কমিটির অনুমোদন মেলে না।
অভিযোগের বিষয়ে বরগুনা সদর উপজেলা সমাজসেবা অফিসার মো. হেমায়েত উদ্দিন ও আমতলী উপজেলা সমাজসেবা অফিসার মো. মানঞ্জুরুল হক কাওসারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। স্থানীয়দের প্রশ্ন, যেখানে অভিযোগ এত গুরুতর, সেখানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নীরবতা কি আরও সন্দেহ বাড়াচ্ছে না?
অভিযোগকারী ও ভুক্তভোগীরা জেলা প্রশাসকের কাছে নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের দ্রুত বদলি এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। সচেতন মহলের মতে, সমাজসেবার মতো একটি মানবিক দপ্তরে যদি দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়, তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় অসহায় মানুষ, রোগী, এতিম ও দরিদ্ররা।
এ বিষয়ে জেলা সমাজসেবা উপপরিচালক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। অভিযোগদাতা নাম-পরিচয় গোপন রেখে অভিযোগ দায়ের করেছেন। এই অভিযোগের সঙ্গে আমাদের কোনো কর্মকর্তা পিছন থেকে কলকাঠি নাড়ছে, তাদের বিরুদ্ধে যাতে আমি সামনে অগ্রসর না হই। তিনি আরও বলেন, সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে বরগুনা জেলা সমাজসেবা কার্যালয় থেকে আমরা কার্যক্রম পরিচালনা করছি।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত শুরু করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে বলে প্রত্যাশা স্থানীয়দের।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন