একটি রাষ্ট্রের নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে চিকিৎসা সেবা অন্যতম প্রধান। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলেও সত্য যে, আমাদের দেশে আজও 'চিকিৎসা' কোনো নিরবচ্ছিন্ন নাগরিক অধিকার হিসেবে পূর্ণতা পায়নি; বরং তা বহুলাংশে এক ধরণের অনিশ্চয়তা, ভোগান্তি ও উৎকণ্ঠার নামান্তর হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেবার গুণগত মান, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং রোগীদের মানবাধিকার সুরক্ষার মতো মৌলিক ক্ষেত্রগুলোতে আমরা এখনো একটি কাঙ্ক্ষিত মানদণ্ড থেকে বহু যোজন দূরে অবস্থান করছি।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিগত আলোচনা স্বাস্থ্যখাতের জরাজীর্ণ ভাবমূর্তিকে আবারও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। সোমবার (২০ জুলাই) বিকালে সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে গিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠকে একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা আরও উন্নত ও সহজ করার তাগিদ দিয়ে তিনি পরিষ্কার ভাষায় জানিয়েছেন, সরকারি হাসপাতালে গিয়ে যেন কোনো ভোগান্তি ছাড়াই সাধারণ মানুষ চিকিৎসা সেবা পান এবং চিকিৎসার প্রয়োজনে তাদের যেন অন্য কোথাও বা দ্বারে দ্বারে ঘুরতে না হয়। একইসঙ্গে চিকিৎসাসেবা প্রদানে ডাক্তারদের আরও আন্তরিক ও মানবিক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
তবে কেবল শীর্ষপর্যায়ের সদিচ্ছা বা প্রশাসনিক নির্দেশনাই একটি ভেঙে পড়া ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য যথেষ্ট নয়; যতক্ষণ না পর্যন্ত মাঠপর্যায়ে বাস্তবমুখী রূপান্তর ঘটে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হাসপাতালগুলোর মূল সংকট কোথায় এবং কীভাবে একটি আন্তর্জাতিক মানের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব—তার একটি বস্তুনিষ্ঠ ও বিশ্লেষণাত্মক পর্যালোচনা প্রয়োজন।
আমাদের দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা মূলত ত্রি-স্তরবিশিষ্ট: প্রাথমিক (উপজেলা ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র), দ্বিতীয় (জেলা সদর হাসপাতাল) এবং তৃতীয় বা উচ্চতর স্তর (বিশেষায়িত ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল)। কাগজে-কলমে এই কাঠামোটি অত্যন্ত সুসংগঠিত মনে হলেও বাস্তবে প্রান্তিক স্তর থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নানামুখী সংকট বিদ্যমান।
সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন ধারণক্ষমতার চেয়ে তিন থেকে চারগুণ বেশি রোগী আগমন করে। ফলে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে মেঝেতে, বারান্দায় এমনকি সিড়ির নিচে শুয়েও রোগীদের চিকিৎসা নিতে দেখা যায়। পর্যাপ্ত বাজেটের অভাব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং সম্পদের অসম বণ্টনের কারণে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলো চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ন্যূনতম সক্ষমতা হারাচ্ছে। ফলে পুরো দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অতিরিক্ত চাপ গিয়ে পড়ছে রাজধানী ঢাকা ও বড় বড় শহরগুলোর বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোর ওপর।
অন্যদিকে, বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা ব্যাপক হারে প্রসারিত হলেও তা মূলধনমুখী বা বাণিজ্যিক রূপ ধারণ করেছে। নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার যথাযথ নজরদারির অভাবে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে মানহীন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার, যেখানে সেবার চেয়ে লাভের অংকই মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
একটি হাসপাতালের প্রধান শর্ত হলো তার স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও উচ্চমাত্রার পরিচ্ছন্নতা। অথচ বাংলাদেশের অধিকাংশ সরকারি হাসপাতালের পরিবেশ দেখলে মনে হয় তা নিজেই এক বড় ব্যাধির উৎস। হাসপাতালের শৌচাগারগুলোর অবস্থা এতটাই শোচনীয় যে, একজন সুস্থ মানুষও সেখানে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন। অপরিস্কার মেঝেনোংরা বিছানার চাদর এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চরম উদাসীনতা সরকারি হাসপাতালগুলোর নিত্যদিনের দৃশ্য।
আন্তর্জাতিক নিয়মানুযায়ী হাসপাতালে 'হসপিটাল-অ্যাকোয়ার্ড ইনফেকশন' (Hospital-Acquired Infection) বা হাসপাতালভিত্তিক সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য কঠোর জীবাণুমুক্তকরণ প্রোটোকল মানা বাধ্যতামূলক। কিন্তু আমাদের দেশের হাসপাতালগুলোতে জীবাণুমুক্তকরণ ব্যবস্থা এতটাই ঢিলেঢালা যে, সাধারণ রোগ নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগী প্রায়শই জটিল কোনো দ্বিতীয় কোনো সংক্রমণে আক্রান্ত হন।
ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, ব্যান্ডেজ, রক্তমাখা তুলা এবং ক্ষতিকর রাসায়নিক বর্জ্য যেখানে-সেখানে ফেলে রাখা হয়, যা কেবল হাসপাতালের অভ্যন্তরেই নয়, বরং চারপাশের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি সৃষ্টি করে।
চিকিৎসাসেবার গুণগত মান ধরে রাখতে একটি দক্ষ ও গতিশীল প্রশাসনিক কাঠামো অপরিহার্য। কিন্তু আমাদের হাসপাতালগুলোর প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা মারাত্মকভাবে স্থবির ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে ৫১ শয্যা থেকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার সরকারি উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয়। গণপূর্ত বিভাগের প্রকৌশলীরা ইতিমধ্যেই নকশাসহ অবকাঠামোগত বিভিন্ন বিষয় উপস্থাপন করেছেন। তবে শুধু ভবনের আয়তন বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না; ১০১ শয্যার উপযোগী পর্যাপ্ত জনবল, অ্যানেস্থেটিস্ট, সার্জন, টেকনিশিয়ান এবং নার্স নিয়োগ না দিলে বিশাল ভবন কেবল একটি বালুকাময় কাঠামো হিসেবেই রয়ে যাবে।
হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় কোটি কোটি টাকার আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনা হলেও তদারকির অভাবে তা প্যাকেটবন্দী হয়ে নষ্ট হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সরকারি হাসপাতালের মূল্যবান ইসিজি, এক্স-রে বা আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন 'নষ্ট' বানিয়ে রাখা হয়, যাতে রোগীদের বাধ্য হয়ে বাইরের নির্দিষ্ট প্রাইভেট ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানো যায়। এই সিন্ডিকেট ও কমিশন বাণিজ্যের শিকড় অত্যন্ত গভীরে প্রোথিত।
মফস্বল বা উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের নিয়মিত উপস্থিতি না থাকা এক দীর্ঘদিনের ব্যাধি। সরকারি পদে বহাল থেকে প্রাইভেট প্র্যাকটিস বা বড় বড় শহরে অবস্থান করার প্রবণতা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা পাওয়ার অধিকারকে মারাত্মকভাবে খর্ব করে।
দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত রোগীদের প্রতি অনেক চিকিৎসকের মনোভাব একেবারেই সহানুভূতিশীল নয়। রোগীদের কথা শোনার জন্য পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া, তাদের সাথে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা, ধমক দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় তথ্য গোপন রাখার মতো বিষয়গুলো প্রতিনিয়ত ঘটছে।
একই চিকিৎসক যখন তার ব্যক্তিগত চেম্বারে বা নামী প্রাইভেট হাসপাতালে বসেন, তখন তার আচরণ হয় অত্যন্ত বিনম্র ও দায়িত্বশীল। কিন্তু সরকারি হাসপাতালে এসে তিনি চরম উদাসীনতার পরিচয় দেন। এটি একটি নৈতিক বিপর্যয় এবং চিকিৎসা পেশার পবিত্রতার চরম লঙ্ঘন।
সচিবালয়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসকদের দায়িত্বে অবহেলার ঘটনা বরদাশত করা হবে না। একইসঙ্গে এ ব্যাপারে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং শাস্তির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
বর্তমানে বাংলাদেশে অসংক্রামক ব্যাধি, বিশেষ করে কিডনি রোগের বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। একজন কিডনি রোগীর নিয়মিত ডায়ালাইসিস অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও মানসিকভাবে ক্লান্তিকর একটি প্রক্রিয়া। মফস্বলের একজন দরিদ্র রোগীর পক্ষে বারবার ঢাকায় বা জেলা শহরে এসে হাজার হাজার টাকা খরচ করে ডায়ালাইসিস করানো প্রায় অসম্ভব।
এই প্রেক্ষাপটে সরকারের ঘোষিত নতুন উদ্যোগটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক:
জেলা পর্যায়ে বর্তমানে বিদ্যমান ১০ শয্যার ডায়ালিসিস সেন্টারগুলোকে ৫০ শয্যায় সম্প্রসারণ করা এবং আগামী ৩ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে সারাদেশের উপজেলা পর্যায়ে ডায়ালিসিস সেন্টার স্থাপন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তা কেবল দরিদ্র কিডনি রোগীদের দুর্ভোগ ও আর্থিক সংকটই কমাবে না, বরং বাংলাদেশের প্রান্তিক স্বাস্থ্যসেবায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে। তবে এর সাথে সাথে দক্ষ টেকনিশিয়ান, নেফ্রোলজিস্ট এবং প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সাপোর্ট নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
একটি আন্তর্জাতিক মানের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে বাংলাদেশকে কতগুলো মৌলিক জায়গায় সংস্কার আনতে হবে:
১. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, একটি দেশের জিডিপির অন্তত ৫% স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ হওয়া উচিত। আমাদের দেশে এই বরাদ্দ এখনও ১%-এর নিচে। বাজেটের সঠিক ব্যবহার ও বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি ছাড়া উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
২. ডিজিটালাইজেশন ও সেন্ট্রাল মনিটরিং: সরকারি প্রতিটি হাসপাতালে বায়োমেট্রিক হাজিরা, ই-হেলথ কার্ড এবং ডিজিটাল পেশেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করতে হবে। কোন চিকিৎসক কতক্ষণ হাসপাতালে অবস্থান করছেন এবং দিনে কতজন রোগী দেখছেন তা কেন্দ্র থেকে মনিটর করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
৩. যেসব চিকিৎসক নিষ্ঠার সাথে গ্রামগঞ্জে সেবা দেবেন, তাদের জন্য দ্রুত পদোন্নতি, উচ্চশিক্ষা ও বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যদিকে, যারা দায়িত্বে অবহেলা করবেন, সরকারি কর্মস্থল ফাঁকি দেবেন—তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
৪. প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে একটি স্বাধীন 'অভিযোগ সেল' এবং আন্তর্জাতিক মানের 'Patient Code of Ethics' বাধ্যতামূলক করা উচিত, যেন সাধারণ মানুষ কোনো বৈষম্য বা অবহেলার শিকার হলে তাৎক্ষণিক প্রতিকার পেতে পারে।
৫. প্রতি মাসে স্বাধীন থার্ড-পার্টি টিম দিয়ে প্রতিটি হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জীবাণুমুক্তকরণ ব্যবস্থা অডিট বা মূল্যায়ন করতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়,স্বাস্থ্যসেবা কোনো করুণা বা দয়া নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার। বিগত দিনগুলোতে অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে আমাদের স্বাস্থ্য খাত যে খাদের কিনারে গিয়ে পৌঁছেছিল, তা থেকে উত্তরণের জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া কোনো গতি নেই। প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক সম্প্রতি দেওয়া নির্দেশনাগুলো—যেমন সরকারি হাসপাতালে ভোগান্তি হ্রাস, চিকিৎসকদের আন্তরিকতা বৃদ্ধি, ডায়ালাইসিস সেন্টারের শয্যা বৃদ্ধি এবং ১০১ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল অবকাঠামো নির্মাণ—নিশ্চয়ই সময়োপযোগী ও আশাব্যঞ্জক।
তবে ইতিহাস সাক্ষী, কেবল পরিকল্পনা গ্রহণ বা সুন্দর প্রতিশ্রুতি দিয়েই কোনো খাতের আমূল পরিবর্তন ঘটেনি। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আমলাতান্ত্রিক মানসিকতার পরিবর্তন এবং মাঠপর্যায়ে কঠোর তদারকি। ডাক্তারদের মনে রাখা উচিত, চিকিৎসাসেবা কেবল একটি পেশা নয়, এটি পরম মানবসেবার ব্রত। সরকারের গৃহীত এই সংস্কারমূলক পদক্ষেপগুলো যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং সর্বস্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়, তবেই বাংলাদেশ একটি কল্যাণমুখী, বৈষম্যহীন এবং আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। সুতরাং হাসপাতালগুলোর সেবার মান উন্নয়নের বিকল্প নেই।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন