× UCB Sticker Card
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশিত: জুলাই ২০, ২০২৬, ০৮:২৪ পিএম

ফুটবলেরই জয় হয়েছে শেষ পর্যন্ত!

আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশিত: জুলাই ২০, ২০২৬, ০৮:২৪ পিএম

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

ভূরাজনৈতিক চরম উত্তাপ, কৃত্রিম সীমান্ত, ক্ষমতার আসফালন আর বিশ্বজুড়ে মেরুকরণের এই দমবন্ধ করা সময়ে আবারও প্রমাণিত হলো এক চিরন্তন সত্য—ফুটবলের সামনে পৃথিবী হার মানতে বাধ্য। ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ কেবল একটি মেগা স্পোর্টস ইভেন্ট ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল আধুনিক রাজনৈতিক বিতর্ক, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা এবং ক্রীড়া সংস্কৃতির এক মহাকাব্যিক সংঘর্ষের ক্ষেত্র। যে বিশ্বকাপের আয়োজক রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রে এমন এক রাজনৈতিক প্রক্ষাপট তৈরি হয়েছিল যেখানে অংশ নেওয়া অনেক দেশের সঙ্গেই চরম বৈরিতা ও যুদ্ধাবস্থা বিদ্যমান, যেখানে ভিসা নীতি আর লাল কার্ড বাতিল নিয়ে শীর্ষ রাজনীতির নগ্ন হস্তক্ষেপ দেখা গেছে—সেখানে শেষ পর্যন্ত সব বিতর্ক ধূলিসাৎ করে দিয়ে জয় হলো কেবলই ফুটবলের।

বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই ফুটবলের সবুজ ঘাস ঢেকে গিয়েছিল ভূরাজনীতির বিষাক্ত ধোঁয়াশায়। আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বিতর্কিত ও বৈষম্যমূলক অভিবাসন নীতি আর চড়া ভিসা ফি টুর্নামেন্টের আবেগ ও সৌহার্দ্যের আমেজকে বারবার বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছে। সেনেগালের মতো আফ্রিকান দেশগুলোর ফিফা অনুমোদিত রেফারিকে ভিসা না দেওয়া কিংবা বহিষ্কার করার চেষ্টা আন্তর্জাতিক ক্রীড়ামহলে সমালোচনার ঝড় তোলে। কেপ ভার্দের মতো ছোট দেশের ফুটবলারদের পরিবার চড়া ফি-র কারণে খেলা দেখতে আসতে পারেনি, যার প্রতীকী রূপ ছিলেন গোলরক্ষক ভোজিনহা। কিন্তু ফুটবল মাঠের পারফরম্যান্সের জোরেই যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনকে পিছু হঠতে বাধ্য হতে হয় এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপে ভোজিনহার মাকে গ্যালারিতে আনার ব্যবস্থা করা হয়।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে সবচেয়ে কৃচ্ছ্রসাধন ও বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে ইরান ফুটবল দলকে। আয়োজক দেশের বৈরী মনোভাব ইরানের প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল স্পষ্ট। বিমানবন্দরে তেহরানের অধিনায়ককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ, মেক্সিকোর বেস ক্যাম্প থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ম্যাচ খেলতে আসার পথে কড়া নিরাপত্তা ও মানসিক চাপ—সবই ছিল তাদের বিরুদ্ধে এক প্রকার বিমাতা সুলভ আচরণ। এমনকি ম্যাচ শেষ হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই খেলোয়াড়দের গাড়িতে তুলে বিমানবন্দর নিয়ে যাওয়ার মতো অপমানজনক পরিস্থিতি তৈরি করা হয়।

কিন্তু রাজনীতির এই কদর্য রূপকে ফুটবলের নান্দনিকতা দিয়ে উত্তর দিয়েছেন ইরানের গোলরক্ষক আলিরেজা বেইরানবান্দ। শৈশবের চরম দারিদ্র্য ও ঘরছাড়া জীবনের বাধা পেরিয়ে আসা এই মানুষটি যখন বেলজিয়ামের মতো বিশ্বসেরা আক্রমণভাগের সামনে মানবপ্রাচীর হয়ে একের পর এক অবিশ্বাস্য সেভ করছিলেন, তখন ওই মার্কিন গ্যালারির দর্শকরাই বৈষম্য ভুলে দাঁড়িয়ে করতালি দিতে বাধ্য হয়েছিল। ভূরাজনীতির বিষাক্ততাকে হারিয়ে এটাই ছিল ফুটবলের প্রথম জয়।

টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই রেফারিং এবং ভিএআর (VAR) প্রযুক্তি নিয়ে যে বিতর্কের ঝড় উঠেছিল, তা এই বিশ্বকাপের প্রশাসনিক অপেশাদারত্বকেই নগ্ন করে দিয়েছিল। রেফারিদের সিদ্ধান্তের অসামঞ্জস্যতা এবং ভিএআর প্রযুক্তির সুবিধা নির্দিষ্ট কয়েকটি দলের দিকে হেলে পড়ার অভিযোগ ওঠে প্রথম থেকেই। আর্জেন্টিনাকে 'ফিফার প্রিয়পাত্র' আখ্যা দিয়ে প্রতিপক্ষদের মধ্যে অসন্তোষ যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই টুর্নামেন্টের মাঝে তৈরি হয় এক অদ্ভুত রাজনৈতিক নাটকীয়তা।

স্বাগতিক দেশের এক প্রভাবশালী ফুটবলারের লাল কার্ড পাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরাসরি ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক বক্তব্য ও প্রশাসনিক চাপ বিশ্ব ফুটবলে নজিরবিহীন তোলপাড় সৃষ্টি করে। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী খেলায় যেকোনো দেশের সরকারের হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ হলেও লাল কার্ড বাতিল করার ব্যাপারে যে ক্ষমতার মহড়া ও দরকষাকষি দেখা গেছে, তা আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ভূমিকা নিয়েও গ্যালারিতে উঠেছিল ব্যঙ্গাত্মক স্লোগান। রেফারিং বিতর্ক টুর্নামেন্টের মাঠের খেলা থেকে মানুষের নজর বারবার ঘুরিয়ে নিতে চেয়েছিল, মনে হচ্ছিল ফুটবল বোধহয় তার নিজস্ব পথ হারিয়ে রাজনীতির হাতের পুতুল হয়ে যাচ্ছে।

নিউইয়র্ক-নিউজার্সির ঐতিহ্যবাহী মেটলাইফ স্টেডিয়ামের মহাজাগতিক ফাইনালে যে নাটকীয়তা অপেক্ষা করছিল, তা হয়তো কেউ কল্পনাও করেনি। ফাইনালে একদিকে ছিল আর্জেন্টিনার অদম্য শারীরিক শক্তির প্রয়োগ, অন্যদিকে স্পেনের টিকিটাকা ও আধুনিক কৌশলী ফুটবল। কিন্তু আর্জেন্টিনার ট্র্যাজিক চিত্রনাট্য লেখা হয়েছিল তাদের ভুল কৌশলগত সিদ্ধান্তের কারণে।

শুরু থেকেই আলবিসেলেস্তেরা আক্রমণাত্মক ও শারীরিক লড়াই নির্ভর কঠোর কৌশল বেছে নেয়। মাঠের সৌন্দর্য আর কৌশলের বদলে তারা মন দিয়েছিল মেজাজ হারানো ও ফাউল করার ওপর। প্রথমার্ধের পরিসংখ্যানই তার প্রমাণ—প্রতিপক্ষের শেষ তৃতীয়াংশে আর্জেন্টিনা যেখানে মাত্র আটটি পাস দিতে পেরেছিল, সেখানে তারা ফাউল করেছিল নয়টি! দানি ওলমো কিংবা রদ্রিদের ওপর আর্জেন্টিনা খেলোয়াড়দের একের পর এক ক্ষতিকর ফাউল এবং রেফারি কর্তৃক নরম মনোভাব দেখানোর অভিযোগ গ্যালারিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।

বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে বিরল এক ঘটনা ঘটিয়ে আর্জেন্টিনা নির্ধারিত ৯০ মিনিটে একটিও শট অন টার্গেটে নিতে পারেনি। এনজো ফার্নান্দেজের অপ্রয়োজনীয় ও আক্রমণাত্মক আচরণের জন্য দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়া এবং শেষ দিকে ১০ জনের দলে পরিণত হওয়া তাদের হতাশার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। বদলি খেলোয়াড় লেয়ান্দ্রো পারেদেসের একাধিক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া কিংবা শেষ বাঁশির পর দু’দলের হাতাহাতি আর্জেন্টিনার শক্তির মহড়াকে এক মলিন রূপ দিয়েছিল। কৌশলগত দিক থেকে স্পেনের তরুণেরা লিওনেল মেসিকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল আর্জেন্টিনার পুরো দল থেকে।

অতিরিক্ত সময়ের ১১৭তম মিনিটে লিওনেল মেসির সেই শটটি যখন লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো, তখনই নির্ধারিত হয়ে যায় ইতিহাসের গতিপথ। স্পেনের দুর্দান্ত কৌশলগত ফুটবলের সামনে আর্জেন্টিনার প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। কিন্তু ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে মাঠের মধ্যকার সেই উত্তাপ, ক্ষোভ আর শারীরিক শক্তির মহড়া নিমেষেই উবে যায়।

মাঠে বসে থাকা ৩৯ বছর বয়সী কিংবদন্তি মেসির চোখের জল তখন হাজার কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয় স্পর্শ করছিল। ৩৪তম বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলে হয়তো নিজের শেষ অধ্যায়ের যবনিকা টানছিলেন তিনি। মেসিকে ঘিরে আর্জেন্টিনার কোচ স্কালোনির আবেগাপ্লুত হয়ে সংবাদ সম্মেলন ত্যাগ করা কিংবা মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের বিষাদগ্রস্ত গান—সবই তৈরি করেছিল এক মহাকাব্যিক পরিবেশ। কিন্তু এই চরম বিষাদের মাঝেই ফুটে ওঠে ফুটবলের আসল সৌন্দর্য।

মাঠে নামার আগের টানেলে মেসি নিজেই এগিয়ে গিয়ে স্পেনের তরুণদের সঙ্গে করমর্দন করেছিলেন। আর ম্যাচ শেষে ট্রফি উদযাপনের উন্মাদনা ছেড়ে স্পেনের ১৮ বছরের তরুণ বিস্ময় লামিন ইয়ামাল ছুটে যান বিষণ্ন মেসির কাছে। বার্সেলোনা সাম্রাজ্যের এক প্রাক্তন সম্রাটকে পরম শ্রদ্ধায় জড়িয়ে ধরেন সম্ভাব্য নতুন সম্রাট। ইয়ামালের সেই পিঠ চাপড়ে দেওয়া, সমবেদনা ও পরম শ্রদ্ধা জানানো মুহূর্তটি যেন টুর্নামেন্টের সমস্ত নেতিবাচকতা, বর্ণবাদ, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ আর রক্তচক্ষুকে মুহূর্তের মধ্যে দূর করে দিল।

পরিশেষে বলা যায়, বিশ্বকাপজুড়ে নানা বিতর্ক, বৈষম্যমূলক ভিসানীতি, ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের হস্তক্ষেপ, ইরানের প্রতি অন্যায্য আচরণ, কিংবা ফাইনালে আর্জেন্টিনার রুক্ষ ফুটবল—কোনো কিছুই ফুটবলের আসল মহিমাকে ছোট করতে পারেনি। কানাডার আলফনসো ডেভিসের মতো শরণার্থীর বিশ্বমঞ্চে বীর হয়ে ওঠা কিংবা মেসির শেষ কান্নার মাঝে ইয়ামালের শ্রদ্ধাশীল আলিঙ্গন—এগুলোই ফুটবল। ফুটবলকে অতিরিক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার ভারে বা ভূরাজনীতি দিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা বারবার ব্যর্থ হয়েছে। কারণ ফুটবল শেষ পর্যন্ত কেবল ১১ জন বনাম ১১ জনের একটি সরল সুন্দর খেলা, যা সীমানা ও রাজনীতির দেয়াল ভেঙে মানুষকে এক সুতোয় বাঁধে। ২০২৬ বিশ্বকাপ আমাদের আবার শিখিয়ে গেল—বিতর্ক যতই গভীর হোক, রাজনীতির খেলা যতই নোংরা হোক, দিনশেষে ফুটবলই জেতে, জিতেছে এবং জিতবে!

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Link copied!