জাতীয় বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের একটি হিসাব নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন-দর্শন, অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রতিফলন। একটি পরিবারের বার্ষিক বাজেট যেমন সেই পরিবারের স্বপ্ন, সামর্থ্য ও সীমাবদ্ধতার পরিচয় বহন করে, তেমনি রাষ্ট্রের বাজেটও নাগরিকদের প্রত্যাশা ও সরকারের নীতিগত অবস্থান তুলে ধরে। এবারের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড়। দীর্ঘ সময় পর ক্ষমতায় ফিরে বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে এটি স্বাভাবিকভাবেই বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। এখন প্রশ্ন বাজেটের সুফল কতটা সাধারণ মানুষের জীবনে পৌঁছাবে।
বাজেটের ইতিবাচক দিকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অগ্রাধিকার। সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রতি সরকারের গুরুত্বের ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে কিডনি ডায়ালাইসিস যন্ত্র, হার্টের রিং, চোখের লেন্স এবং ক্যানসারের ওষুধের ওপর শুল্ক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত চিকিৎসা ব্যয় কমাতে সহায়ক হতে পারে। জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসাসামগ্রীর দাম কমলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর আর্থিক চাপও কিছুটা লাঘব হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে উৎসাহিত করাও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। সোলার প্যানেল, ব্যাটারি ও চার্জিং অবকাঠামোয় শুল্ক সুবিধা এবং জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর যানবাহনের ওপর কর বাড়ানো পরিবেশবান্ধব অর্থনীতির পথে ইতিবাচক পদক্ষেপ। একইভাবে ফ্রিল্যান্সার, কনটেন্ট নির্মাতা ও স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের কর-সুবিধা তরুণদের ডিজিটাল অর্থনীতিতে আরও সক্রিয় অংশগ্রহণে উৎসাহিত করতে পারে। চালের ওপর উৎসে কর কমানোর সিদ্ধান্তও মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা পরিবারগুলোর জন্য স্বস্তির বার্তা।
তবে আশার পাশাপাশি কিছু বড় প্রশ্নও সামনে আসে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা উচ্চাভিলাষী হলেও বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সে লক্ষ্যের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, বৈদেশিক বাণিজ্যের চাপ এবং অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নিলে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন সহজ হবে না। একইভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যও বাস্তবতার কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে।
ব্যাংক খাতের দুর্বলতা আরও বড় উদ্বেগের বিষয়। খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং আর্থিক খাতের কাঠামোগত সমস্যার সমাধান ছাড়া বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ানো কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকিং খাতের ওপর অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও বেশ উচ্চ। অতীতের আদায় পরিস্থিতি বিবেচনায় এ লক্ষ্য অর্জনে কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি, কর ফাঁকি রোধ এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার কার্যকর প্রয়োগ অপরিহার্য।
শুধু সমস্যার কথা বললেই চলবে না, সমাধানের পথও খুঁজতে হবে। ডিজিটাল অর্থনীতি, তথ্যপ্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন, মোবাইল উৎপাদন, পর্যটন এবং রপ্তানির বহুমুখীকরণ ভবিষ্যতে রাজস্ব ও কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে অ-কর রাজস্ব আদায়, বন্ড মার্কেটের উন্নয়ন এবং পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করা গেলে অর্থনীতির ওপর ব্যাংকনির্ভরতা কমবে।
সাধারণ মানুষের কাছে বাজেটের সফলতা পরিমাপের একটাই মানদণ্ড—জীবনযাত্রার ব্যয় কমছে কি না এবং আয় বাড়ছে কি না। নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, কৃষি উপকরণে কর-সুবিধা, স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় হ্রাস এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বরাদ্দ বৃদ্ধি বাস্তবায়িত হলে তার ইতিবাচক প্রভাব গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য দ্রুত লাইসেন্স প্রদানের উদ্যোগও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
অভিজ্ঞতা বলে, বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রণয়ন নয়, বাস্তবায়ন। সুন্দর পরিকল্পনা তখনই সফল হয়, যখন তা দক্ষ প্রশাসন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে কার্যকর হয়। দুর্নীতি, অপচয় ও প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা না গেলে ভালো নীতির সুফলও জনগণের কাছে পৌঁছায় না। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো, ব্যাংক খাতে সংস্কার, রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং নিয়মিত অগ্রগতি মূল্যায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে বাজেট ২০২৬-২৭ একদিকে সম্ভাবনার বার্তা দেয়, অন্যদিকে বাস্তবতার কঠিন প্রশ্নও সামনে আনে। মানবসম্পদ উন্নয়ন, স্বাস্থ্য, ডিজিটাল অর্থনীতি ও পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগে ইতিবাচক দিক থাকলেও রাজস্ব আদায়, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতা হবে এর সাফল্যের প্রকৃত পরীক্ষার ক্ষেত্র। শেষ পর্যন্ত বাজেটের মূল্যায়ন হবে সংখ্যার ভিত্তিতে নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনমান কতটা উন্নত হলো, কর্মসংস্থান কতটা বাড়ল এবং অর্থনীতির ভিত্তি কতটা শক্তিশালী হলো—তার ওপরই।ড. মোহাম্মদ রাশেদ হাসান পলাশ
অর্থনীতি ও উন্নয়ন-নীতি বিশ্লেষক
সহকারী অধ্যাপক, স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআরআই)
এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি অ্যান্ড ইনোভেশন (এপিইউ), কুয়ালালামপুর, মালয়েশিয়া

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন