× UCB Sticker Card
সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

জুবায়ের দুখু

প্রকাশিত: জুলাই ১৯, ২০২৬, ০৪:৫০ পিএম

শান্তি কেন অধরা

জুবায়ের দুখু

প্রকাশিত: জুলাই ১৯, ২০২৬, ০৪:৫০ পিএম

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি— যা ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ নামে পরিচিত— স্থায়ী শান্তির যে ক্ষীণ আশা জাগিয়েছিল, তা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ভেঙে পড়েছে। যুদ্ধবিরতির সেই অঙ্গীকার এখন অতীত। দুই দেশ আবারও মুখোমুখি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। ফলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে টেকসই শান্তির সম্ভাবনা নিয়ে সবচেয়ে আশাবাদী পর্যবেক্ষকও এখন গভীর সংশয়ে।

এই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি— এটি বিশ্ব জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডর। মার্কিন বাহিনী বুশেহর ও বন্দর আব্বাসে হামলা চালিয়েছে এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর পুনরায় নৌ-অবরোধ আরোপের প্রস্তুতি নিয়েছে বা নিয়েছে। এর জবাবে ইরানও হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে নিজেদের কৌশলগত সক্ষমতার বার্তা দিয়েছে। উভয় পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ শুধু আঞ্চলিক উত্তেজনাই বাড়ায়নি, বরং বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকেও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে এবং ভারত মহাসাগরে প্রবেশের একমাত্র সমুদ্রপথ হিসেবে এর গুরুত্ব অপরিসীম। ইরান, ইরাক, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি এই জলপথের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই প্রণালী অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে। ফলে হরমুজে যে কোনো অস্থিরতা বিশ্ববাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে।

এই কারণেই বাহরাইনে অবস্থানরত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম ফ্লিট দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলে নৌ-নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করে আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাত দেখিয়ে দিয়েছে, বিপুল সামরিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালিকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা কোনো পক্ষের পক্ষেই সহজ নয়। বরং এই জলপথ এখন সামরিক শক্তির পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং কূটনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

বাস্তবতা হলো, ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর ভৌগোলিক সুবিধা ভোগ করলেও ওমান উপসাগর কিংবা আরব সাগরের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ নেই। এই সীমাবদ্ধতাকেই কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র পূর্বে আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইরানি জাহাজ চলাচলে বাধা দিয়েছিল। ওয়াশিংটনের যুক্তি ছিল- ইরান যদি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যাহত করে, তবে তার নিজের বাণিজ্যিক নৌপথও বাধাগ্রস্ত হবে। ফলে উভয় পক্ষই কার্যত একে অপরের অর্থনৈতিক শিরায় চাপ সৃষ্টি করার কৌশল গ্রহণ করে।

যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালি ছিল আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন দ্বারা পরিচালিত একটি উন্মুক্ত ও টোলমুক্ত নৌপথ। কিন্তু সংঘাতের ফলে পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। প্রণালিসংলগ্ন অধিকাংশ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে ইরান কার্যত প্রমাণ করে যে, প্রয়োজনে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের ওপর কার্যকর প্রভাব বিস্তার করার সক্ষমতা তাদের রয়েছে। এটাই ছিল শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের সবচেয়ে জটিল প্রশ্নগুলোর একটি।

সমঝোতা স্মারকে যুক্তরাষ্ট্র ৩০ দিনের মধ্যে নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের এবং ইরান ৬০ দিনের জন্য বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্ন রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক কাঠামো নির্ধারণের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ পুনরায় শুরু হওয়ায় সেই উদ্যোগও থমকে গেছে।

ইরানের জন্য হরমুজ প্রণালি কেবল একটি সামুদ্রিক পথ নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং আত্মমর্যাদার প্রতীক। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির অর্থনীতি কঠিন সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, বেকারত্ব এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। এই দীর্ঘমেয়াদি চাপ ইরানের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

২০১৫ সালের জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) ছিল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার এক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কিন্তু ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ানোর পর পরিস্থিতি আবারও অবনতির দিকে যায়। নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল হওয়ার ফলে ইরানের অর্থনীতি নতুন করে সংকটে পড়ে এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস আরও গভীর হয়।

অতীতে ইরান বহুবার হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার হুমকি দিলেও বাস্তবে তা কার্যকর করেনি। কিন্তু সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাত সেই অবস্থান পাল্টে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ইরান প্রথমবারের মতো কার্যকরভাবে প্রণালী অবরোধ করে। তাদের দৃষ্টিতে এটি ছিল কেবল সামরিক প্রতিরোধ নয়; বরং জাতীয় অস্তিত্ব ও মর্যাদা রক্ষার একটি রাজনৈতিক বার্তা। দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক অবরোধ, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং সামরিক চাপের মুখে থাকা একটি রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধের পথই বেছে নেবে— এতে বিস্ময়ের কিছু নেই।

ইরান এরই মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য ‘নিরাপদ যাতায়াতের অনুমতিপত্র’ ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্যে একটি পৃথক কর্তৃপক্ষ গঠন করেছে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত মিলছে। যদি এমন ব্যবস্থা কার্যকর হয়, তবে নির্দিষ্ট ফি দিয়ে অনুমতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক হতে পারে এবং রাজনৈতিক কারণে কোনো দেশের জাহাজের অনুমতিও স্থগিত করা সম্ভব হবে। এর ফলে নতুন করে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সবকিছু মিলিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট—ইরানের সঙ্গে সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র শুধু একটি আঞ্চলিক যুদ্ধই শুরু করেনি; বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিকে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। যুদ্ধ কখনো স্থায়ী সমাধান এনে দেয় না; বরং নতুন সংঘাত, নতুন অবিশ্বাস এবং নতুন সংকটের জন্ম দেয়। হরমুজ প্রণালীর বর্তমান পরিস্থিতি সেই কঠিন বাস্তবতারই আরেকটি স্মারক।

স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে সামরিক শক্তির প্রদর্শন নয়, প্রয়োজন পারস্পরিক আস্থা, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এবং কার্যকর কূটনৈতিক সংলাপ। অন্যথায় হরমুজ প্রণালী শুধু একটি সমুদ্রপথ নয়, বিশ্ব রাজনীতির অনন্ত সংঘাতের প্রতীকে পরিণত হবে—আর শান্তি অধরাই থেকে যাবে।

Link copied!