× UCB Sticker Card
শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশিত: জুলাই ১৮, ২০২৬, ০৮:৪৬ পিএম

জুলাই শহীদ দিবস কি স্বাধীন বিবেকের পথ দেখিয়েছে?

আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশিত: জুলাই ১৮, ২০২৬, ০৮:৪৬ পিএম

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

ইতিহাসের চাকা যখন কোনো এক চোরাবালিতে এসে স্থবির হয়ে পড়ে, যখন ফ্যাসিবাদের নিকষ অন্ধকার একটা গোটা প্রজন্মের বুক চিরে ফুসফুসের শেষ বাতাসটুকুও কেড়ে নিতে চায়, ঠিক তখনই ইতিহাসের গর্ভ থেকে জন্ম নেয় এক রক্তক্ষয়ী বসন্ত। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বাংলাদেশ তেমনই এক মহাকাব্যিক দ্রোহের জলছবি।

তরুণেরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে যে নতুন ভোরের সূচনা করেছে, তা কেবল একটি স্বৈরাচারী শাসনের যবনিকাপাত ঘটায়নি, বরং দীর্ঘ দেড় দশকের জড়তা আর স্তব্ধতা ভেঙে বাঙালি জাতিকে এক ‘স্বাধীন বিবেকের’ মহিমান্বিত পথ দেখিয়েছে। এই রক্ত আমাদের মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে শিখিয়েছে; শিখিয়েছে কীভাবে ভয়ের অভেদ্য প্রাচীরকে এক লহমায় ধুলোয় মিশিয়ে দিতে হয়। কিন্তু অভ্যুত্থানের সেই রক্তাক্ত স্মৃতি, সেই কান্নার রোল পেরিয়ে আজ যখন আমরা এক নতুন মোহনায় দাঁড়িয়ে আছি, তখন বুক চিরে একটি প্রশ্নই বারবার জাগে—যে স্বপ্ন নিয়ে তরুণেরা বুলেটের সামনে নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছিল, আমরা কি সেই ত্যাগের মর্যাদা রাখতে পারছি?

জুলাই অভ্যুত্থান কোনো আকস্মিক উল্লাস বা হুট করে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা ছিল না। এটি ছিল দীর্ঘ দেড় দশক ধরে জমতে থাকা অপমান, বঞ্চনা আর তীব্র ক্ষোভের এক ঐতিহাসিক সুনামি। ২০০৯ সালে ক্ষমতার মসনদে আরোহণের পর থেকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্পন্দনকে সুকৌশলে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। তথাকথিত ‘উন্নয়নের’ চটকদার বিজ্ঞাপনের আড়ালে নির্বাসিত করা হয়েছিল মানুষের মৌলিক নাগরিক অধিকার।

২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের তিনটি প্রহসনমূলক নির্বাচন দেশের সাধারণ মানুষের ভোটাধিকারকে বুটের তলায় পিষ্ট করেছিল। বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে গণমাধ্যম—সবখানেই লেপ্টে দেওয়া হয়েছিল ভয়ের আঠা। মানুষের কথা বলার স্বাধীনতাকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো কালো আইনের শেকলে বেঁধে ফেলা হয়েছিল। দেশটা রূপান্তর হয়েছিল এমন এক অবরুদ্ধ কারাগারে, যেখানে নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্যও যেন সরকারের অনুমতির প্রয়োজন হতো।

এই স্বৈরশাসনের সবচেয়ে অন্ধকার ও নৃশংসতম অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চালানো গুম ও খুনের মধ্য দিয়ে। এটি কোনো রূপকথা নয়, বরং এ দেশের মাটি আর বাতাসের বুক চিরে উঠে আসা বাস্তব কান্না। রাতের অন্ধকারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে ঘরের দরজা ভেঙে তুলে নিয়ে যাওয়া সন্তানদের মায়েরা আজও পথ চেয়ে বসে আছেন। বহু সন্তান বাবার মুখ না দেখেই বড় হয়ে গেছে।

এই সীমাহীন ভীতি ও দমনের এক জীবন্ত কসাইখানা হয়ে উঠেছিল গোপন বন্দিশালা—যা এ দেশের মানুষের মনে ‘আয়নাঘর’ নামে এক যন্ত্রণাদায়ক ক্ষত হিসেবে খোদাই হয়ে আছে। এটি ছিল ফ্যাসিবাদের এক কুৎসিত রূপক। ভূগর্ভের সেই দমবন্ধ করা প্রকোষ্ঠে, যেখানে দিন আর রাতের তফাতটুকুও বোঝার উপায় ছিল না, বছরের পর বছর আটকে রাখা হয়েছিল স্বাধীনচেতা মানুষদের। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে সেখানে মানুষের মনুষ্যত্বকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হতো। এই বন্দিশালা প্রমাণ করেছিল—ভিন্নমত দমনের জন্য এই রাষ্ট্র কতটা পৈশাচিক রূপ ধারণ করতে পারে।

রাজনৈতিক স্বৈরাচারের সমান্তরালে চলেছে এই ভূখণ্ডের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক লুণ্ঠন। ‘উন্নয়নের’ স্লোগানকে ঢাল বানিয়ে ব্যাংকগুলোকে করা হয়েছিল রিক্ত, শূন্য। রাজনৈতিক মদদে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি এবং ব্যাংক দখলের মহোৎসব চলেছে দিনের পর দিন।

এ দেশের মেহনতি মানুষের রক্ত পানি করা টাকা দিয়ে লটেরা গোষ্ঠী কানাডার বেগম পাড়া, মালয়েশিয়া কিংবা লন্ডনে গড়ে তুলেছে সম্পদের পাহাড়। যখন সাধারণ মানুষ এক বেলা ডাল-ভাতের সংস্থান করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছিল, তখন শাসকের অনুগ্রহপুষ্ট একদল অলিগার্ক দেশের অর্থ বিদেশে পাচার করে উল্লাসে মেতেছিল। এই সীমাহীন লুণ্ঠন এ দেশের প্রতিটি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছিল।

কিন্তু পলিমাটির এই দেশে দীর্ঘকাল অন্যায় টিকতে পারে না। যখন অন্ধকার চরমে পৌঁছাল, তখনই রাজপথে নেমে এল এক অবিনাশী স্পৃহা—এ দেশের তরুণ প্রজন্ম। কোটা সংস্কারের একটি অতি সাধারণ ও ন্যায়সঙ্গত দাবি নিয়ে যে আন্দোলনের সূত্রপাত, সরকারের দম্ভ ও অহমিকার আঘাতে তা রূপ নিল এক সর্বব্যাপী মুক্তির লড়াইয়ে। ছাত্রদের ‘রাজাকার’ বলে কটাক্ষ করা এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বশক্তি দিয়ে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া ছিল স্বৈরাচারের কফিনে শেষ পেরেক।

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়া আবু সাঈদের সেই ছবি কেবল এক যুবকের দাঁড়িয়ে থাকা ছিল না; ওটা ছিল ভয়ের ওপর সাহসের এক মহাকাব্যিক বিজয়। এরপর পিচঢালা পথ রঞ্জিত হলো মীর মুগ্ধ, ওয়াসিম, ইয়ামিন ফারহান ফাইয়াজদের মতো শত শত লাল গোলাপের রক্তে।

আকাশে উড়ে যাওয়া হেলিকপ্টার থেকে ছোড়া গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড আর স্নাইপারের বুলেট দিয়েও যখন তরুণের স্রোতকে রুখে দেওয়া গেল না, তখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে শৃঙ্খল ভাঙার গান গীত হতে চলেছে। ৫ই আগস্টের সেই জনসমুদ্র প্রমাণ করেছিল—বুলেট দিয়ে মানুষের আত্মাকে কোনোদিন কেনা বা বন্দি করা যায় না। আর এভাবেই পতন ঘটল এক দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরাচারের।

এখানে আমি প্রশ্ন তুলতে চাই,জুলাই অভ্যুত্থানের মূল স্পিরিট বা চেতনা কী ছিল? তা কি কেবল ক্ষমতার হাতবদল? কিংবা কিছু মুখের পরিবর্তন? না, তা ছিল না। জুলাইয়ের মূল সুর ছিল ‘বৈষম্যহীনতা’। তরুণেরা এমন এক স্বদেশের স্বপ্ন বুনেছিল যেখানে মানুষের পরিচয়ের চেয়ে তার মেধার মূল্যায়ন বড় হবে। যেখানে ধর্মের কারণে, মতের কারণে বা বর্ণের কারণে কাউকে অবহেলিত হতে হবে না।

এই আন্দোলনের অন্তরে ছিল সামাজিক ন্যায়বিচার আর সাম্যের আকুতি। ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণ ভেঙে রাষ্ট্রকে এমন এক কল্যাণকামী সংস্থায় রূপান্তর করার স্বপ্ন তারা দেখেছিল, যা ভবিষ্যতে আর কোনো নতুন ফ্যাসিবাদের জন্ম দেবে না। সংক্ষেপে বলতে গেলে, জুলাইয়ের চেতনা ছিল এক মানবিক, স্বাবলম্বী এবং আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশের ইশতেহার।

কিন্তু আজ যখন আমরা ইতিহাসের এই নতুন বাঁকে দাঁড়িয়ে পেছনে তাকাই, বুকটা এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে। স্বৈরাচারের পতনের পর যে জাতীয় ঐক্যের প্লাবন সৃষ্টি হয়েছিল, তা আজ সংকীর্ণ দলাদলি আর ক্ষমতার কাড়াকাড়িতে স্তিমিত হয়ে আসছে। মুখের বদল হলেও ভেতরের ব্যবস্থার বদল ঘটেনি। যে পুলিশ বা আমলাতন্ত্র ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে কাজ করেছিল, তাদের সংস্কারের কাজ আজ থমকে আছে। একদল সুবিধাবাদীর বদলে আরেক দল সুবিধাবাদী মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।

আমরা বিচারের বদলে প্রতিহিংসার লালসা দেখতে পাচ্ছি। 'মব জাস্টিস' বা মব সংস্কৃতির বাড়বাড়ন্ত প্রায়ই আমাদের আইন ভাঙার এক আশঙ্কাজনক ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের আকাশছোঁয়া দাম সাধারণ মানুষের দম আটকে দিচ্ছে। লুণ্ঠিত অর্থ উদ্ধার আর পাচারকারীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর প্রতিশ্রুতিগুলো এখনো কাগুজে আশ্বাসের গণ্ডি পেরোতে পারেনি।

যদি আমরা শহীদদের রক্তের প্রতি বিন্দুমাত্র সৎ হতে চাই, তবে আমাদের সস্তা আবেগ ও রাজনৈতিক সংকীর্ণতার দেয়াল ভেঙে এক গভীর কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে পা বাড়াতে হবে।

সংবিধানের সেই সব ধারা সংশোধন করতে হবে যা একজন প্রধানমন্ত্রীকে একচ্ছত্র ও অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার অধিকারী করে তোলে। রাষ্ট্র পরিচালনায় ভারসাম্য আনতে হবে। দুই মেয়াদের বেশি কেউ সরকারপ্রধান হতে পারবেন না—এমন কঠোর নীতি প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।

‘আয়নাঘর’ বা রাষ্ট্রীয় নিগ্রহের মতো কোনো বর্বরতা যেন এ দেশের মাটিতে আর কোনোদিন মাথাচাড়া দিতে না পারে, তার স্থায়ী আইনি রক্ষাকবচ তৈরি করতে হবে। প্রতিটি গুম ও খুনের আন্তর্জাতিক মানের তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনে শিক্ষাব্যবস্থার খোলস বদলে ফেলতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে চাঙ্গা করা এবং ব্যাংকগুলোকে লুটেরাদের হাত থেকে মুক্ত করে সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গায় ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি।

নতুন বাংলাদেশের পরিচয় হতে হবে তার বহুত্ববাদে। ভিন্নমতকে দমনের হাতিয়ার না বানিয়ে তাকে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হিসেবে গ্রহণ করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

পরিশেষে বলতে চাই,২০২৪ সালের জুলাইয়ের সেই রক্তভেজা দিনগুলো বাংলাদেশের আত্মায় এক অবিনশ্বর অক্ষয় হয়ে খোদাই করা থাকবে। এ দেশের তরুণেরা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে আমাদের কলঙ্কিত ইতিহাসের পাতা ধুয়ে দিয়ে গেছে। তারা আমাদের শিখিয়েছে যে, মানুষের যখন স্বাধীন বিবেকের উদয় হয়, তখন কোনো দানবই তাকে আর শৃঙ্খলিত রাখতে পারে না।

কিন্তু স্বাধীনতার চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা যে ঢের বেশি কঠিন—এই সত্য আজ আমাদের সামনে প্রতিদিন নতুন করে উন্মোচিত হচ্ছে। আমরা যদি এই সুযোগ হাতছাড়া করি, যদি রক্তের ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে আবারও সংকীর্ণ স্বার্থের খেলায় মেতে উঠি, তবে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।

সুতরাং আসুন, শহীদদের সেই স্বাধীন বিবেকের পথ ধরে আমরা এমন এক বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করি, যেখানে প্রতিটি মানুষ বুক ফুলিয়ে বলতে পারবে— ‘আমি এই স্বাধীন দেশের একজন মুক্ত নাগরিক।’ শহীদদের রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না, এটাই হোক জুলাই শহীদ দিবসে আমাদের একমাত্র অঙ্গীকার।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Link copied!