বিদেশের মাটিতে একটি দেশের দূতাবাস রাষ্ট্রের মুখ। একজন প্রবাসী যখন বিপদে পড়েন, পাসপোর্ট হারান, আইনি জটিলতায় পড়েন কিংবা কোনো তথ্য জানতে চান, তখন তার প্রথম আশ্রয় হওয়ার কথা নিজের দেশের দূতাবাস। কিন্তু স্পেনে বসবাসরত হাজারো বাংলাদেশির কাছে সেই আশ্রয়স্থল যেন দিন দিন একটি নীরব ভবনে পরিণত হয়েছে—যেখানে ফোন আছে, কিন্তু সাড়া নেই।
মাদ্রিদে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের অফিসিয়াল টেলিফোন নম্বরে দিনের পর দিন ফোন করেও কোনো সাড়া না পাওয়ার অভিযোগ এখন আর নতুন নয়। প্রবাসীদের ভাষ্য, ফোন বাজে, কল সংযুক্ত হয়, কিন্তু ওপাশে কেউ সাড়া দেন না। অনেকে টানা কয়েক দিন, এমনকি কয়েক সপ্তাহ ধরে অফিস চলাকালে ফোন করেও ব্যর্থ হয়েছেন। ডিজিটাল যুগে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করতে না পারা শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতার পরিচয় নয়; এটি নাগরিক সেবার মান নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
একসময় অন্তত দূতাবাসের ফোনে সাড়া মিলত। ২০১৬ সালে একই বিষয়ে লেখার সময় একজন স্প্যানিশ কর্মচারী ফোন রিসিভ করে জানিয়েছিলেন, বাংলা ভাষাভাষী কর্মকর্তা নাস্তার জন্য বাইরে আছেন। অর্থাৎ তখন অন্তত ফোনটি কেউ ধরতেন। কিন্তু আজ পরিস্থিতি আরও হতাশাজনক। এখন অনেকের অভিযোগ, ফোন ধরার মতো কাউকেই পাওয়া যায় না। এমন বাস্তবতায় প্রবাসীদের প্রশ্ন, দূতাবাসের টেলিফোন নম্বরটি কি কেবল প্রদর্শনের জন্য?
এই ভোগান্তির একটি বাস্তব উদাহরণ বার্সেলোনায় বসবাসরত জসিম উদ্দিনের ঘটনা। তিনি জানান, পাসপোর্টে একটি সংযুক্তি করতে কী কী কাগজপত্র প্রয়োজন, তা জানার জন্য প্রায় এক মাস ধরে মাদ্রিদে বাংলাদেশ দূতাবাসের অফিসিয়াল নম্বরে অসংখ্যবার ফোন করেছেন। কিন্তু কোনো সাড়া না পেয়ে শেষ পর্যন্ত শুধু তথ্য সংগ্রহের জন্যই তাকে মাদ্রিদে যেতে হয়। এখন প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করে একই কাজ সম্পন্ন করতে তাঁকে আবারও মাদ্রিদে যেতে হবে।
জসিম উদ্দিনের ঘটনাটি ব্যতিক্রম নয়; বরং স্পেনে বসবাসরত বহু বাংলাদেশির নিত্যদিনের বাস্তবতা। দূতাবাসে একটি ফোনকলের উত্তর না পাওয়ায় অনেক প্রবাসীকে প্রয়োজনীয় তথ্য জানতেই শত শত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। এর আর্থিক প্রভাবও কম নয়। বার্সেলোনা, ভ্যালেন্সিয়া, মালাগা, সেভিয়া কিংবা স্পেনের অন্যান্য শহর থেকে মাদ্রিদে যাতায়াত, খাবার এবং কর্মঘণ্টার ক্ষতি মিলিয়ে একজন সেবাগ্রহীতার গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ ইউরো পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় হয়।
রক্ষণশীল হিসাবেও ধরা হলে, মাদ্রিদের বাইরের শহরগুলো থেকে যদি প্রতি মাসে মাত্র ৩০ জন প্রবাসী শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের জন্য এমন অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত করতে বাধ্য হন, তাহলে বছরে অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৯৯ হাজার ইউরো। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী যার মূল্য প্রায় ১ কোটি ৪৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
প্রশ্ন হলো, একটি ফোনকল রিসিভ করে প্রয়োজনীয় তথ্য জানিয়ে দেওয়া গেলে যে অতিরিক্ত ব্যয় এড়ানো সম্ভব, সেই ব্যয়ের বোঝা কেন সাধারণ নাগরিককেই বহন করতে হবে? এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রদূত মাসুদুর রহমানের কাছে প্রশ্ন করা হলে তিনি জনবল সংকটের কথা উল্লেখ করেছেন। তার দাবি, প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় সব সময় ফোন রিসিভ করা সম্ভব হয় না।
তবে এই ব্যাখ্যা অনেক প্রবাসীর কাছে সন্তোষজনক নয়। গত ২২ জুন স্পেনে বসবাসরত বাংলাদেশিদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেওয়া একটি স্মারকলিপিতে রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, আজিজ, জুয়েল ও মামুন নামের তিন ব্যক্তিকে দূতাবাসের বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেখিয়ে জনবল খাতে বরাদ্দ সরকারি অর্থ থেকে বেতন-ভাতা দেওয়া হচ্ছে।
যদি এই অভিযোগের কোনো ভিত্তি না থাকে, তবে রাষ্ট্রদূতের উচিত দ্রুত বিষয়টি স্পষ্ট করা। আর যদি অভিযোগের সত্যতা থাকে, তাহলে জনবল সংকটের ব্যাখ্যা স্বাভাবিকভাবেই নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব অভিযোগের বিষয়ে রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য জানার সুযোগও সীমিত। কারণ তার সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ‘দূতাবাসের টেলিফোন’ কার্যত অকার্যকর বলে অভিযোগ রয়েছে। একাধিকবার ফোন করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য সংগ্রহ করাও সম্ভব হয়নি।
প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতিতে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার রেমিট্যান্স পাঠান। রাষ্ট্র তাদের অবদানের কথা গর্বের সঙ্গে তুলে ধরে। কিন্তু সেই প্রবাসীরাই যখন নিজের দেশের দূতাবাসে একটি ফোনকলেরও উত্তর পান না, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—প্রবাসীবান্ধব সেবার যে অঙ্গীকার রাষ্ট্র করে, বাস্তবে তা কতটা কার্যকর?
এটি শুধু প্রবাসীদের ক্ষোভই বাড়ায় না, সরকারের জনসেবার প্রতিশ্রুতিকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। কারণ বিদেশে একটি দূতাবাসের সেবাগত ব্যর্থতা শেষ পর্যন্ত সরকারের ভাবমূর্তির ওপরও প্রভাব ফেলে।
ফোনকল রিসিভ করা কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি দূতাবাসের দায়িত্ব। অফিস চলাকালে দিনের পর দিন ফোনের উত্তর না দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যদি জনবল সংকটই প্রকৃত কারণ হয়, তাহলে সেটির সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে এবং প্রয়োজনীয় জনবল চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আর যদি জনবল থাকা সত্ত্বেও ফোনের উত্তর না দেওয়া হয়, তাহলে সেটি দায়িত্বে অবহেলার শামিল। দুই ক্ষেত্রেই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন প্রবাসীরা, আর প্রশ্নের মুখে পড়ছে সরকারের জনসেবা নিশ্চিত করার সক্ষমতা।
লেখক: আফাজ জনি, লেখক ও সাংবাদিক।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন